আলোকবর্ষের ওপারে - শেষ নির্বাসন

লিখেছেন:প্রবীর রুদ্র

(২১৮৭ থেকে ২৩৫০ খ্রিস্টাব্দের পটভূমিতে)

"আকাশ আমাদের ডাকছে। যদি আমরা নিজেদের ধ্বংস না করি, তাহলে একদিন আমরা তারাদের কাছে যাব।" কার্ল  সেগান।

 

প্রথম পর্ব: জ্বলন্ত পৃথিবী

প্রথম অধ্যায়: কলকাতার লাল আকাশ

শেষ বর্ষা এসেছিল ২১৮৩ সালে। কিন্তু সে বৃষ্টি নিয়ে আসেনি।

সে নিয়ে এসেছিল আগুন।

ডঃ মীরা রায় দাঁড়িয়ে ছিলেন উত্তর কলকাতার বোস ইনস্টিটিউটের ছাদে। কলকাতা বলতে যতটুকু কলকাতা তখনও অবশিষ্ট ছিল। মুখে ছিল একটি যৌগিক ফিল্টার-মাস্ক, আর তাঁর কালো চোখ দুটো দিগন্তের দিকে স্থির। হুগলি নদীর উপরে আকাশটা তখন পুরনো রক্ত আর মরে যাওয়া সবুজের রঙ ধারণ করেছিল — পুরনো রক্তের মতো অ্যাম্বার রং। দক্ষিণ দিকের জ্বলন্ত তেলশোধনাগার থেকে রাসায়নিক ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে আসছিল। তিন সপ্তাহ আগে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত জাতিসংঘের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে চূর্ণ করে দিয়েছিল। যেটা একসময় ঢাকা শহর ছিল তার উপর দিয়ে এখনও ড্রোন চক্কর দিচ্ছিল।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ পুরনো ছিল — ২০০ বছরেরও বেশি। কিন্তু ২১৫৫ সালের পর, যখন জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের হিমবাহ গলিয়ে দিতে শুরু করল এবং সিন্ধু নদীর জলের প্রবাহ অর্ধেকে নেমে এল, কাশ্মীর শুধু সীমানার প্রশ্ন রইল না।

এটা বেঁচে থাকার প্রশ্ন হয়ে উঠল।

পাকিস্তানের কৃষিভূমির সিংহভাগ সিন্ধু ও তার শাখানদীর উপর নির্ভরশীল ছিল। সেই জল ভারত নিয়ন্ত্রণ করলে পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষ ধীরে ধীরে খাদ্যসংকটে পড়বে। ভারত জানত এটা। পাকিস্তান জানত এটা। উভয়ের কাছেই পারমাণবিক অস্ত্র ছিল।

২১৬৫ সালের জানুয়ারিতে, পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় বায়ুসেনা একটি অভিযান চালায় যা পাকিস্তান সরকার "সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত" বলে ঘোষণা করে, এবং দুটি দেশ পূর্ণ সামরিক মুখোমুখি অবস্থায় চলে যায়ে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হয়নি। কারণ উভয় পক্ষই জানত ব্যবহার করলে পরের দিন কেউ থাকবে না। কিন্তু প্রচলিত অস্ত্রের যুদ্ধে যা ব্যবহার হয়েছিল — রাসায়নিক অস্ত্র, মিসাইল, ড্রোন, থার্মোবারিক বোমা — তাতে পাঞ্জাবের শস্যক্ষেত্র, সিন্ধু নদীর পলিমাটির সমভূমি, এবং কাশ্মীরের উপত্যকা তিন বছরের মধ্যে এমন পরিবেশ-বিষাক্ততায় আক্রান্ত হল যে সেখানে আর কিছু জন্মাল না। পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে শুরু করল।

ভারতের উত্তর-পশ্চিম রাজ্যগুলোতে বায়ু দূষণ এমন স্তরে পৌঁছাল যে শিশু ও বৃদ্ধরা বাইরে বের হতে পারত না। আর উপমহাদেশের শরণার্থীর ঢেউ — এক কোটি, দুই কোটি, তারপর পাঁচ কোটি — পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক কাঠামো ভেঙে ফেলল। সেই যুদ্ধ মানুষের থেকে আনেক কিছু কেড়ে নিল। স্তব্ধ করে দিলো কত জীবন। শুধু স্তব্ধ হল না লড়াই। কারণ সময়ের সাথে সাথে সেই যুদ্ধে যোগ দিলো চীন, ইসরায়েল, রাশিয়া, আমেরিকা, কেউ প্রত্যক্ষ ভাবে, কেউ আবার পরোক্ষ ভাবে নিজেদের দল বেছে নিল। শুধু কোনো দল বেছে নিতে পারল না সাধারণ মানুষ। আজ সেই যুদ্ধ ভারতের পশ্চিম সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। দু বছর আগে বাংলাদেশ এই যুদ্ধে সরাসরি ধুকে পড়ায়, আজ সেই যুদ্ধের আঁচ কলকাতায়।

মীরা বুকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন একটি জীর্ণ নোটবুক — কাগজের, ইলেকট্রনিক নয় — কারণ বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলেও কাগজ কাজ করে। তার উপরে তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন: আলোকবর্ষের ওপারে। এটি তখনও বই হয়ে ওঠেনি। তখন এটি শুধুমাত্র একটি প্রার্থনা।

পেছন থেকে সিঁড়ির দরজাটা খুলে গেল।

অর্জুন: "মীরা-দি। নিচে যেতে বললেন সবাই। কাউন্সিলের কল শুরু হচ্ছে।"

তিনি ঘুরলেন না। অর্জুন বোস — তাঁর গবেষণা সহকারী, ছাব্বিশ বছর বয়সী, ধ্বংসস্তূপের মাঝে বড় হওয়া মানুষের মতোই মেধাবী — এসে তাঁর পাশে দাঁড়াল, একই দিগন্তের দিকে তাকিয়ে।

অর্জুন: "পুরো রেসপিরেটর ছাড়া এখানে থাকা উচিত নয় আপনার। বায়ু দূষণ সূচক চারশো বারো।"

মীরা: "সূচকটা কী তা আমি জানি। আমিই তো সূচকটা বানিয়েছিলাম।"

সে একটু চুপ করে রইল। নিচে শহরটা — যতটুকু অবশিষ্ট — এক ক্লান্ত অবসাদের মধ্যে ঝুলে ছিল। উত্তরের বিদ্যুৎ গ্রিড বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কলকাতার জনসংখ্যা তার আগেকার কুড়ি মিলিয়ন থেকে কমে প্রায় নয় মিলিয়নে এসে ঠেকেছিল। বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিল — দক্ষিণের পাহাড়ে, সমুদ্রের ধারে, যেখানে নিরাপত্তার গুজব এখনও বেঁচে ছিল। যারা রয়ে গিয়েছিল তারা ছিল জেদি, দরিদ্র, আর বিজ্ঞানী।

অর্জুন: "কেপলার কনসোর্টিয়ামের ট্রান্সমিশন আজ সকালে এসেছে। সংকেত পরিষ্কার, কোনো বিকৃতি নেই।"

এবার তিনি ঘুরলেন। মাস্কের উপরে তাঁর চোখে কিছু একটা দেখা গেল। ঠিক আশা নয়। আশার কঙ্কাল।

মীরা: "তারপর?"

অর্জুন: "কেপলার-৪৪২বি। বায়োসিগনেচার রিডিং সামঞ্জস্যপূর্ণ। অক্সিজেন-নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডল, একাত্তর শতাংশ সম্ভাবনা তরল জলের উপস্থিতির। মডেলগুলো স্থিতিশীল ।"

তিনি ধীরে শ্বাস ছাড়লেন, ফিল্টার-মাস্ক সেটা ধরে নিল।

মীরা: "একাত্তর শতাংশ।"

অর্জুন: "এখানে থাকার চেয়ে ভালো সম্ভাবনা।"

তিনি আবার আকাশের দিকে তাকালেন। অ্যাম্বার রং গাঢ় হয়ে হলুদাভ হয়ে উঠেছিল। পূর্বদিকে অনেক দূর থেকে একটানা বজ্রপাতের মতো শব্দ আসছিল। কিন্তু সেটা বজ্রপাত ছিল না। বহু বছর ধরেই বজ্রপাত আর হয় না।

গ্লোবাল সায়েন্স কাউন্সিল মিটিং হচ্ছিল ইনস্টিটিউটের বেসমেন্টে — তিনটি মহাদেশের রিলে স্টেশন থেকে একসাথে জোড়া লাগানো একটা ফাটা হোলোগ্রাফিক টেবিলে চোদ্দটি মুখ। কয়েকটা হোলোগ্রাফিক ইমেজ কাঁপছিল। বুয়েনোস আইরেসের নোডের ফিড বারবার কেটে যাচ্ছিল। এই কলে থাকা অর্ধেক মানুষ সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঠিকমতো ঘুমাননি।

কায়রো থেকে কথা বলছিলেন ডঃ ইউসুফ আল-রশিদ। বয়স বাষট্টি, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী যিনি একসময় এমন একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন যা মানবজাতির “সময়” সম্পর্কে ধারণাই পালটে দিয়েছিল। এখন তিনি দেখতে লাগছিলেন এমন একজন মানুষের মতো যে বহুদিন ধরে একটি পাহাড় বহন করে চলেছে।

ইউসুফ: "আমরা সবাই জানি আজ কেন এখানে এসেছি। আইপিসিসি জরুরি মূল্যায়ন আজ সকালে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও সন্দেহ এই ঘরের বাইরে কেউ পড়েছেন কিনা, কারণ যে তিনটি সার্ভারে এটি থাকার কথা ছিল তার মধ্যে তিনটিই এখন কার্যকর নেই। উপসংহার অবাক করার মতো নয়: বায়ুমণ্ডলীয় অবক্ষয়ের বর্তমান গতিতে — রাসায়নিক অস্ত্র, কৃত্রিম পেট্রোলিয়াম দহন, এবং আমাজনের পতনের সম্মিলিত প্রভাবে — আমরা ২১৯৫ থেকে ২২১০ সালের মধ্যে একটি বিপর্যয়কর সীমা অতিক্রম করার দিকে তাকিয়ে আছি। সেই বিন্দুর পরে, আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলছি না। আমরা শুক্রগ্রহের মত অনিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউস ঘটনার কথা বলছি। স্থানীয়ভাবে শুরু হলেও তা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগবে না।"

কলে নীরবতা নেমে এল। অবিশ্বাসের নীরবতা নয়। নিশ্চিতকরণের নীরবতা।

ডঃ অনন্যা সেন: "মানে আমাদের হাতে বারো থেকে সাতাশ বছর।"

ইউসুফ: "নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বারো থেকে সাতাশ বছর বাসযোগ্য পৃষ্ঠ থাকবে। তারপর পৃথিবীতে বৃহৎ মানব বসতি... অসম্ভব হয়ে পড়বে।"

ডঃ লিয়াং চেন: "আমি অসম্ভব শব্দটা পছন্দ করি।"

ইউসুফ: "তুমি সবসময়ই আমার চেয়ে বেশি নির্ভুল ছিলে, লিয়াং।"

লিয়াং চেন বেইজিং থেকে কথা বলছিলেন — বরং বলা উচিত, যেটা একসময় বেইজিং ছিল তার নিচের ভূগর্ভস্থ গবেষণা কেন্দ্র থেকে, কারণ শহরের পৃষ্ঠভাগ মূলত খালি করে দেওয়া হয়েছিল। বয়স চুয়াল্লিশ, ছোট্ট, তীক্ষ্ণ, একজন প্রপালশন পদার্থবিজ্ঞানী যিনি গত তিন বছরে উনিশটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন — যেন তিনি জানতেন সময় ফুরিয়ে আসছে এবং অনেক কাজ বাকি।

লিয়াং: "আর্ক প্রজেক্টের প্রস্তাব। আমাদের কাছে সংখ্যা আছে। সংখ্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত।"

মীরা: "সংখ্যার আগে এটা আদৌ সম্ভব কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা করা উচিত।"

লিয়াং: "এটা সম্ভব। এটাই তো মূল কথা। থিসি্যাস ড্রাইভ — গত আগস্টে পরীক্ষা করা পরিমার্জিত কোয়ান্টাম -ইনারসিয়াল প্রোটোটাইপ — নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পয়েন্ট-জিরো-এইট-সিক্স-সি অর্জন করেছে। এটি আলোর গতির আট দশমিক ছয় শতাংশ, মীরা, এবং স্থিতিশীল। যদি আমরা এটাকে যথেষ্ট ভরের একটি জাহাজে—"

মীরা: "যথেষ্ট ভরের একটি জাহাজে কতজন মানুষ?"

লিয়াং থামলেন।

লিয়াং: "আমাদের বর্তমান অনুমান চল্লিশ হাজার। বহু প্রজন্মব্যাপী যাত্রায়।"

বহু প্রজন্মব্যাপী  শব্দটি পলি মাটির মতো সেই কলে উপস্থিত সবার মনের উপর জমে গেল।

অর্জুন: "কতক্ষণ ? কেপলার-৪৪২বি পর্যন্ত?"

লিয়াং: "পয়েন্ট-জিরো-এইট-সিক্স-সি-তে, ডিসেলারেশন আর্ক এবং মধ্যপথের সংশোধন হিসাব করে — প্রায় এক শত বারো বছর।"

কলে কেউ হাসল। সেটা সুখের শব্দ ছিল না।

ডঃ জেমস ওকাফোর: "তাহলে সেই জাহাজে যে উঠবে — যে সেই যাত্রা শুরু করবে — সে কখনো পৌঁছাবে না। তার সন্তানরাও নাও পৌঁছাতে পারে। তার নাতি-নাতনিরা গন্তব্য দেখবে।"

লিয়াং: "হ্যাঁ, ঠিক তাই।"

ওকাফোর: "আপনি মানুষকে বলছেন তাদের পুরো জীবন একটি যাত্রায় দিয়ে দিতে। একটি জাহাজে জন্ম নিতে। একটি জাহাজে মরতে। কৃত্রিম আকাশ দেখে একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে।"

ইউসুফ: "জেমস। আপনার জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকান।"

দীর্ঘ বিরতি। সবাই সে কথার আসল মানে বুঝল।

ওকাফোর: "ঠিক আছে। যুক্তিসংগত কথা।"

 

দ্বিতীয় অধ্যায়: জাহাজের স্থপতি

কমান্ডার প্রিয়া চন্দ্রশেখর কলকাতায় পৌঁছালেন ছয় মাস পরে, ২১৮৮ সালের জানুয়ারিতে, মুম্বই আর পূর্ব করিডরের মধ্যে শেষ কার্যকর বাণিজ্যিক ফ্লাইট রুটে। বয়স আটচল্লিশ, নাসার প্রাক্তন ডিপ-স্পেস মিশন কমান্ডার যিনি চাঁদের ঘাঁটি সম্প্রসারণ কর্মসূচি এবং বাতিল হয়ে যাওয়া মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথ জরিপ পরিচালনা করেছিলেন। বাতিল হয়েছিল কারণ তৃতীয় সম্পদ যুদ্ধ বিশ্বের মোট জিডিপির অর্ধেক গিলে ফেলছিল। তিনি বৃষ্টিতে বিমান থেকে নামলেন — সাধারণ বৃষ্টি, অ্যাসিড নয়, যেটা এখনও একটা উপহার মনে হয়। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তার টারমাকে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন, সেই সতর্ক, মূল্যায়নকারী দৃষ্টিতে যা তাঁর সারাটা ক্যারিয়ার তৈরি করেছিল।

তিনি এসেছিলেন কারণ মীরা চেয়েছিলেন। আর মীরার চাওয়াকে প্রিয়া অস্বীকার করতে পারতেন না।

স্ট্রাসবার্গের আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের বন্ধুত্ব হয়েছিল, সেই বিশ্বের বিচ্ছিন্ন হওয়া শুরুর দশ বছর আগে। মীরা গিয়েছিলেন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান ও বায়োসিগনেচার বিশ্লেষণে। প্রিয়া গিয়েছিলেন কমান্ডে। তাঁরা সবসময় ধরে নিয়েছিলেন, তরুণ মেধাবীদের সেই অসতর্ক ভঙ্গিতে, যে সবকিছুর জন্য সময় থাকবে।

সবকিছুর জন্য সময় হয়নি।

মীরা অপেক্ষা করছিলেন পুরনো আগমন টার্মিনালের প্রবেশদ্বারে — এখন সেটা রিসার্চ কোঅর্ডিনেশন হাবে রূপান্তরিত — অর্জুন এবং আরও দুজন গবেষকের সাথে। প্রিয়া দেখতে বয়সের চেয়ে বৃদ্ধ মনে হচ্ছিলেন — অসুস্থতার বৃদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগের বৃদ্ধ, যেন তিনি অনেকদিন ধরে একটা কিছুর উপর ক্লান্তিহীন দৃষ্টি রেখেছেন।

মীরা: "তুমি ভয়ঙ্কর দেখতে হয়েছ।"

প্রিয়া: "তুমি আরও খারাপ। কফি কোথায়?"

মীরা: "শেষ। চিয়া-ব্রু বলে একটা জিনিস আছে। যতটা খারাপ শোনাচ্ছে, ঠিক ততটাই খারাপ।"

প্রিয়া: "ভালোই হল। এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য আমি নই।"

তারা হাবের একটি কোণে বসলেন — অ্যাকুস্টিক ব্যাফেল দিয়ে আলাদা করা। ২১৮২ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি রেকর্ডিং স্টুডিও থেকে নেওয়া। মীরা তার নোটবুক খুললেন। প্রিয়া কভারটার দিকে তাকালেন, আলোকবর্ষের ওপারে  কথাগুলো দেখলেন, আর কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন।

প্রিয়া: "কেপলার-৪৪২বি সম্পর্কে সত্যি কথাটা বলো। রিপোর্ট নয়। তোমার নিজের সত্যি।"

মীরা এটা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে ভাবলেন।

মীরা: "এটা সত্যি। বায়োসিগনেচার কোনো কারিগরি ত্রুটি নয়। আমরা তিনটি স্বাধীন সিস্টেমে ছয়শো বার স্পেকট্রোস্কোপিক বিশ্লেষণ চালিয়েছি এবং অক্সিজেন-নাইট্রোজেন-জলীয়বাষ্পের রিডিং সব যায়গায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরও একটা জিনিস আছে — মধ্য-ইনফ্রারেডে একটি ক্ষীণ কিন্তু সুসংগত সংকেত যা আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। ভূতাত্ত্বিক হতে পারে। জৈবিক হতে পারে। এমন কিছু হতে পারে যার এখনও নাম নেই।"

প্রিয়া: "প্রাণ হতে পারে।"

মীরা: "প্রাণ হতে পারে।"

প্রিয়া: "বুদ্ধিমান?"

মীরা: "বলা যাচ্ছে না। সংকেতটা এমন কোনোভাবে গঠিত নয় যাকে আমরা ইচ্ছাকৃত বলে চিনতে পারি। কিন্তু মহাবিশ্ব অনেক বড় আর ইচ্ছাকে চেনার আমাদের সক্ষমতা অনেক সীমিত।"

প্রিয়া: "যদি সেখানে বুদ্ধিমান প্রাণ থাকে—"

মীরা: "তাহলে আমরা উপনিবেশকারী নই। আমরা শরণার্থী। এবং সেভাবেই আচরণ করতে হবে।"

প্রিয়া: "আর যদি সরল প্রাণ থাকে — জীবাণু, জটিল জীব, মাঝামাঝি কিছু—"

মীরা: "তাহলেও আমরা অতিথি। এমন একটি সম্পর্ক যার জন্য যত্ন দরকার।"

প্রিয়া: "আর যদি কিছুই না থাকে। একেবারেই না।"

মীরা: "তাহলে আমরা অসাধারণ ভাগ্যবান যে একটি অক্সিজেন বায়ুমণ্ডল আর তরল জলসহ একটি পৃথিবী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা বহন করি সেই দায়িত্ব — এই মহাবিশ্বে পরিচিত একমাত্র মনের, যে জানে সে কি। আর দ্বিতীয়বার এটা নষ্ট করলে চলবে না।"

প্রিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

প্রিয়া: "আমার পুরো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাক্সেস দরকার হবে। থিসিযাস ড্রাইভের স্কিমেটিক, লাইফ-সাপোর্ট মডেল, লিয়াংয়ের টিমের সবকিছু। আর জাহাজ ডিজাইন করতে ছয় মাস লাগবে।"

মীরা: "চার মাস পাবে। ছয় নাও হতে পারে।"

 

জাহাজটির নাম হবে বসুধা। নামটা মীরার পরামর্শ ছিল, সংস্কৃত শব্দ থেকে নেওয়া — যে বহন করে, যে ধারণ করে, মা। তারা সবাই একমত হলেন যে এটাই সঠিক নাম এমন কিছুর জন্য যাকে নিজেই একটা পৃথিবী হয়ে উঠতে হবে কিছু মানুষের জন্য।

প্রিয়া ডিজাইনে তিব্রভবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কারণ তিনি জানতেন এটা শুধু একটি প্রকৌশল সমস্যা নয়। এটা প্রকৌশলের ভাষায় প্রকাশিত একটি সভ্যতাগত সমস্যা। বসুধাকে কমপক্ষে এক শত বারো বছরের যাত্রায় চল্লিশ হাজার মানুষকে ধরে রাখতে হবে। এটাকে শুধু দেহ নয়, সেই দেহগুলোকে মানুষ করে তোলা সব কিছু বহন করতে হবে: জ্ঞান, সংস্কৃতি, স্মৃতি, শোক ও আশার সক্ষমতা, শিল্প-চিকিৎসা-আইন তৈরির যন্ত্রপাতি, দশ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ, আরও এক লাখ প্রজাতির জেনেটিক আর্কাইভ, মানব প্রজাতির সাথে দ্বিতীয় পৃথিবীতে যাওয়া প্রাণীদের ভ্রূণ ব্যাংক।

সত্যিকার অর্থে এটা মহাকাশযান নয়। এটা একটি খোলসে ঢাকা সভ্যতা।

তিনি লিয়াং চেনের সাথে কাজ করতে শুরু করলেন, যিনি মার্চে বেইজিং থেকে তিন টেরাবাইট প্রপালশন ডেটা আর একটি খুব খারাপ কাশি নিয়ে এসেছিলেন। কাশিটা পরে স্ট্রেস-ইনডিউসড ব্রংকাইটিস বলে প্রমাণিত হয়েছিল। আমেরিকার সাথে ঠাণ্ডা যুদ্ধ এবং তাইওয়ান, কোরিয়া, জাপান ও ভারতের সাথে সম্মুখ সম্মোহর বেইজিং কে দুর্বল করে দিয়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল গৃহযুদ্ধ। বেইজিং এর বায়ু দূষণ সূচক সাড়ে পাঁচশো ছাড়িয়েছিল। খোলা আকাশের নীচে শ্বাস নেওয়া একপ্রকার অসম্ভম ছিল।

একবিংশ শতাব্দীর মধ্য প্রাচ্যের যুদ্ধ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সুপার পাওয়ার আমেরিকার প্রকৃত আবস্থা। পাহাড় প্রমাণ ঋণ, দুর্বল হয়ে আসা পেট্রোডলার, এবং একের পর এক যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে ভেতর থেকে ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল সেই দেশ। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক বিভাজন। তাই সময়ের সাথে সাথে আমেরিকান সুপ্রিমেসি হ্রাস পেতে পেতে একুশ শতকের শেষের দিকে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ল। আমেরিকান সুপ্রিমেসি না থাকলে মধ্য প্রাচ্য দিশাহীন হয়ে পড়বে এবং তার সাথে শুরু হবে জ্বালানি সংকট। তাই চীন এই শূন্যতা পূরণ করতে প্রস্তুত ছিল। কয়েক দশক ধরে অবিরাম অর্থনৈতিক বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, এবং কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে চীন নিজেকে পৃথিবীর নতুন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ — যা শুরু হয়েছিল একটি অর্থনৈতিক সংযোগ প্রকল্প হিসেবে — ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল একটি ভূরাজনৈতিক যন্ত্রে। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা — সর্বত্র চীনের ঋণ, চীনের অবকাঠামো, চীনের প্রভাব। কিন্তু ২১২০-এর দশকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও সাহসী হয়ে উঠল। দক্ষিণ চীন সাগর কার্যত চীনের অভ্যন্তরীণ সমুদ্রে পরিণত হল। তাইওয়ানকে একীভূত করা হল — রক্তপাত ছাড়া নয়। তারপর শুরু হল সম্পদের জন্য ভৌগোলিক সম্প্রসারণ। আর্কটিকের খনিজ সম্পদ, সাইবেরিয়ার তেল, আফ্রিকার বিরল খনিজ — চীন পৃথিবীর প্রতিটি কোণে তার প্রয়োজনীয় কাঁচামালের উৎস নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইল। প্রথমে অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে। তারপর সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে। তারপর সরাসরি হুমকির মাধ্যমে। ছোট দেশগুলো প্রথমে প্রতিবাদ করল। তারপর আপোস করল। তারপর বুঝল যে আপোস কাজ করছে না। ২১৩০ সালে, যখন চীন মালাক্কা প্রণালীতে তার নৌবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি ঘোষণা করল এবং ভারত মহাসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে শুরু করল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিল। যে যুদ্ধ শুরু হল তা সরাসরি ঘোষণা করা হয়নি। বড় যুদ্ধগুলো সাধারণত ঘোষণা করা হয় না। এটা শুরু হয়েছিল সাইবার আক্রমণে, তারপর প্রক্সি যুদ্ধে, তারপর সরাসরি সংঘর্ষে — দক্ষিণ চীন সাগরে, ভারত মহাসাগরে, পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে। একটি শক্তি অন্য শক্তিকে নামিয়ে দেওয়ার সেই ক্লাসিক যন্ত্রণা — ইতিহাস বলে থুসিডাইডসের ফাঁদ — পৃথিবী আরেকবার তাতে পড়ল। আর তারপর চলল অবিরাম ধ্বংসলীলা।

 প্রিয়া এবং লিয়াং- এর টিমে ছিলেন বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ার, পদার্থ বিজ্ঞানী এবং গণিতজ্ঞ। এই আর্ক প্রোজেক্টে প্রত্যক্ষভাবে আংশগ্রহন করছিল বিশ্বের তিরিশটিরও বেশি দেশ। বিপুল অর্থ ও মানব সম্পদের মেলা বসেছিল যেন। বহু দশক ধরে মানব জাতির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সম্পদ আজ তার সঠিক রাস্তা খুজে পেয়েছে। কিন্তু আনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছু মানুষ দেরি তে হলেও বুঝেছে যে যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না। আপাতদৃষ্টে যেটাকে মানুষ জয় বলে মনে করে সেই ক্ষণিকের আত্মতৃপ্তি তাঁর পতনের কারণ হয়। বিগত কয়েক দশক ধরে চলতে থাকা যুদ্ধে কারা জিতলো আর কারাই বা হারলো তা জানা নেই — কিন্তু মানুষ অবশ্যই হেরেছে। তাই আজ সে অবলুপ্তির পথে। এই মহাবিশ্বে তার একটি বাসস্থান ছিল, যা সে আপন খেয়ালে জালিয়ে শেষ করে দিয়েছে। ভুল হয়েছে — ক্ষমার অযোগ্য ভুল। জানা নেই যে সে ভুল কখনও সংশোধন করা যাবে কি না ­­— কিন্তু চেষ্টা আমাদের করতেই হবে।

আন্টার্কটিকার একটি গোপন স্থানে অবিরাম এই প্রোজেক্টের কাজ চলল । প্রিয়া এবং লিয়াং- এর নেতৃত্বে প্রথমে তিন হাজার মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলল মানবজাতিকে আবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু তারা নিজেরা জানে না যে তাদের কি হবে! প্রাথমিক নকশা এবং প্রোটোটাইপ তৈরি হলে আর্ক তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হবে অন্তরীক্ষে। একদিন একটি সমস্যা দেখা দেওয়ায় প্রিয়া এবং লিয়াং আলোচনায় বসলেন।

লিয়াং: "ত্রিশ শতাংশের বেশি স্ট্রাকচারাল রিডানডেন্সি আমরা দিতে পারব না। ভর বাজেট ইতিমধ্যে সীমায়।"

প্রিয়া: "রিডানডেন্সি ছাড়া প্রাইমারি হাল ইন্টেগ্রিটি সিস্টেম হারালে জাহাজই হারাব।"

লিয়াং: "ভর বাজেট ছাড়িয়ে গেলে থিসিয়াস ড্রাইভ ট্র্যাজেক্টরির জন্য ন্যূনতম গতি অর্জন করতে পারবে না। আমরা ভেসে থাকব। ধীরে মরব, কিন্তু মরব।"

প্রিয়া: "তাহলে স্ট্রাকচারাল ইন্টেগ্রিটি সিস্টেমটা কম ভারী করে ডিজাইন করো।"

লিয়াং: "এটা কম ভারী হলে—"

প্রিয়া: "তাহলে নতুন উপকরণ খোঁজো।"

নীরবতা।

লিয়াং: "বলা অনেক সহজ।"

প্রিয়া: "জানি। তবুও করো।"

তিন সপ্তাহ পরে, অর্জুন রাত দুটোয় লিয়াংয়ের কর্মস্থানে এল। ঘুমের সময়সূচি তখন তাত্ত্বিক ধারণায় পরিণত হয়েছিল — আট ঘণ্টায় লেখা একটি গবেষণাপত্র নিয়ে যেখানে গ্রাফিন-এয়ারোজেল কম্পোজিট ল্যামিনেট ব্যবহারের প্রস্তাব ছিল। উপকরণটা বর্তমানে ব্যবহৃত যেকোনো জিনিসের চেয়ে হালকা হবে, স্ব-পর্যবেক্ষণ সক্ষম, এবং মাইক্রো-স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের প্রতিক্রিয়ায় সীমিত স্বয়ংক্রিয় মেরামত করতে পারবে।

লিয়াং পড়লেন। আবার পড়লেন। রেখে দিলেন। অর্জুনের দিকে তাকালেন।

লিয়াং: "তোমার বয়স সাতাশ।"

অর্জুন: "আসলে আঠাশ। গত সপ্তাহে জন্মদিন ছিল।"

লিয়াং: "জন্মদিনের শুভেচ্ছা। তোমার আবিষ্কার হয়তো এই মিশন বাঁচিয়ে দিলো।"

  

তৃতীয় অধ্যায়: চল্লিশ হাজার

কে যাবে ? ২১৮৮ সালের গ্রীষ্মের এক দীর্ঘ কাউন্সিল বৈঠকে এই প্রশ্নটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। ইউসুফ বলেছিলেন যে এটি আদৌ একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন নয়।

ইউসুফ: "এটা রসদের পোশাক পরা একটা নৈতিক প্রশ্ন। আমরা জিজ্ঞেস করছি: কে বাঁচার যোগ্য ? আর এটা এমন এক প্রশ্ন যার উত্তর দেওয়ার যোগ্য আমরা কেউ নই।"

প্রিয়া: "তবুও কাউকে না কাউকে উত্তর দিতে হবে।"

ইউসুফ: "হ্যাঁ। তাই আমি খুশি যে আমি সেই ব্যাক্তি নই।"

নির্বাচন প্রোটোকল — শেষ পর্যন্ত একাত্তরজন নীতিবিদ, বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, সম্প্রদায় নেতা এবং একচল্লিশটি দেশের ডাক্তারের একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। বলাই বাহুল্য যে নিখুঁত বা সহজ ছিল না সেই প্রক্রিয়া। মানদণ্ড শুধু মেধার উপর ভিত্তি করে ছিল না, যদিও বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা দক্ষতা অপরিহার্য ছিল। এটা মানবিক সম্পূর্ণতার নীতির উপর তৈরি হয়েছিল: বসুধা বহন করবে কৃষক আর কবি, প্রকৌশলী আর শিক্ষক, দাদু-দিদা আর নবজাতক, পৃথিবীর প্রতিটি প্রধান সাংস্কৃতিক ও ভাষিক ঐতিহ্যের মানুষ, কারণ যা রক্ষা করা হচ্ছিল তা শুধু একটি জৈবিক প্রজাতি নয়। এ এমন এক প্রজাতি যে বহুকাল আগে তার জৈবিক সত্ত্বাকে ছাপিয়ে গেছে।

প্রথম বাছাই তালিকা প্রকাশের পর দাঙ্গা হয়েছিল।

মানুষ তালিকা পুড়িয়েছিল। রাস্তায় কেঁদেছিল। যুক্তি দিয়েছিল, প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে এবং অনেকটা যুক্তিসংগতভাবে, যে কোটি কোটি মানুষ থাকতে চল্লিশ হাজারকে বাঁচানো অনৈতিক। পাল্টা যুক্তি — চল্লিশ হাজার বাঁচানো শূন্যের চেয়ে ভালো, জাহাজ আর বহন করতে পারবে না — যৌক্তিকভাবে শক্তিশালী কিন্তু মানবিকভাবে অপ্রতুল ছিল। যুক্তি খুব কম সময়ই শোককে সান্ত্বনা দেয়।

মীরা তালিকা প্রকাশের পরের সপ্তাহে তেইশ হাজার ব্যক্তিগত বার্তা পেয়েছিলেন। যতটা পারলেন উত্তর দিলেন।

তার মধ্যে একটি এসেছিল লাগোসের সতেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের কাছ থেকে: "আমার নাম আমারা। আমি তালিকায় নেই। মা বলেছেন ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই আপনি আমার একটি জিনিস সাথে নিয়ে যান। আমি ভেবেছি নতুন গ্রহটা কেমন দেখতে হবে, তার একটা ছবি আঁকলাম। দয়া করে এটা নিয়ে যান। দয়া করে মনে রাখবেন যে আমি ছিলাম।"

মীরা ছবিটা ছাপালেন — একটি কিশোরীর কল্পনায় দুটো ছোট্ট চাঁদ আর পৃথিবীর কোনো রঙের সাথে না মেলে এমন রঙের গাছের বন নিয়ে নীল-সবুজ একটি পৃথিবী — লামিনেট করলেন, আর নোটবুকে আলোকবর্ষের ওপারে কথাটার পাশে রাখলেন। তারপর সারাজীবন তিনি এটা বহন করেছিলেন।

 

চল্লিশ হাজার বাছাইয়ের মধ্যে এমন মানুষ ছিলেন যারা যাত্রার বছরগুলোয় এই নতুন গল্পের মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠবেন:

ডঃ মীরা রায়, এখন একান্ন বছর বয়সী, মিশনের প্রধান জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী এবং কোনো অনুচ্চারিত অর্থে এর আত্মা। তাঁর নোটবুক এখন তিন খণ্ডে বিভক্ত।

কমান্ডার প্রিয়া চন্দ্রশেখর, তিপান্ন বছর বয়সী, মিশন কমান্ডার। এখনও চিয়া-ব্রু পান করছেন কারণ আসল কফি এখন একটি স্মৃতি।

ডঃ লিয়াং চেন, ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সী, প্রধান প্রপালশন ইঞ্জিনিয়ার। ব্রংকাইটিস থেকে সেরে উঠেছেন। আঠারো ঘণ্টা কাজ করছেন।

অর্জুন বোস, চৌত্রিশ বছর বয়সী, প্রধান উপকরণ বিজ্ঞানী। মিশনের সর্বকনিষ্ঠ বিভাগীয় প্রধান। তাঁকে তালিকায় তিনবার জায়গা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি দুবার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারপর তাঁর মা তাঁকে এমন কিছু বুঝিয়েছিলেন যা তিনি কখনো কাউকে বলেননি, কিন্তু তিনি যেতে রাজি হয়ে যান।

ডঃ ইউসুফ আল-রশিদ, সাতষট্টি বছর বয়সী, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং মিশনের অনানুষ্ঠানিক দার্শনিক। এখন একটি ছড়ি ব্যবহার করেন, এবং চিন্তার সময় চোখ বন্ধ করার অভ্যাস আছে, যা যারা তাঁকে চেনেন না তারা মাঝেমাঝে ঘুম মনে করেন।

ক্যাপ্টেন জোনাস রেইনহোল্ট, পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী, নরওয়েজিয়ান মহাকাশ প্রকৌশলী এবং প্রাক্তন যুদ্ধবিমান পাইলট যিনি তিন বছর আগে উত্তর ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কম্প্যাক্ট থেকে দলত্যাগ করেছিলেন যখন তাঁকে একটি জল শোধনাগারে বোমা ফেলার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রিয়ার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করবেন।

ডঃ আমারা ওসেই-বনসু — কারণ এটাই ছিল সেই লাগোসের মেয়ে, এখন তেইশ বছর বয়সী, যে উনিশ বছর বয়সে একটি বিজ্ঞান বৃত্তি মিশনে এসেছিল এবং আর ফিরে যায়নি — একজন জীবাণু-জীববিজ্ঞানী যিনি যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী হয়ে উঠবেন।

আর সবশেষে, যাঁকে অন্যরা শুধু কবি বলে ডাকত: রহিম উদ্দিন নামের একজন একাশি বছর বয়সী বাংলাদেশী লেখক। উনি ছয়টি সাহিত্য পুরস্কার জিতেছিলেন এবং তালিকায় যার উপস্থিতি কেউ বিতর্ক করেনি — কারণ সবাই, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই, একমত ছিল যে কবি ছাড়া সভ্যতা হয় না।

 

দ্বিতীয় পর্ব: উৎক্ষেপণ

চতুর্থ অধ্যায়: পৃথিবীর শেষ দিনগুলো

বসুধা  কক্ষপথে তৈরি হয়েছিল, L2 ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে চার বছর ধরে একত্রিত হয়েছিল বারো হাজার ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিবিদের হাতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে, পরিষ্কার রাতে (পরিষ্কার রাত তখন বিরল ছিল) এটা দেখা যেত: তারার পটে ধীরে চলা একটি আলোকিত বস্তু, প্রতি মাসে বড় হচ্ছে, ২১৯১ সালের শেষ দিকে ধোঁয়ার মধ্যেও দৃশ্যমান — একটি দ্বিতীয় এবং অপরিচিত চাঁদের আঁকার নেয়।

নিচের পৃথিবী আর সেই পৃথিবী ছিল না।

বিষুবীয় অঞ্চল মূলত বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। আমাজন চলে গিয়েছিল — পোড়েনি কিন্তু রাসায়নিকভাবে বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল, মাটি এতটাই দূষিত যে সবচেয়ে কঠিন পথিকৃৎ প্রজাতিও বাঁচতে পারছিল না। দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষা ব্যবস্থা ২১৮৯ সালে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল, বারো ঘণ্টায় এক মিটার বৃষ্টি আর তারপর চল্লিশ দিন কিছু নেই। উত্তরের অক্ষাংশগুলো তখনও বাসযোগ্য ছিল — কানাডিয়ান শিল্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু অংশ, মধ্য এশিয়ার উঁচু পকেট — কিন্তু অভিবাসনের চাপ সেই জায়গাগুলোকেও বাসের অযোগ্য করে তুলেছিল।

যাত্রার শেষ মাসগুলোয়, রহিম উদ্দিন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন,:

আজ হাঁটলাম যেটা একসময় বাগান ছিল সেখানে। গোলাপ নেই। মাটির রং পুরনো কাগজের মতো, পায়ের চাপে দেবে যায়ে না। ভাবলাম ছোটবেলায় মা মাটিতে হাত দিয়ে কীভাবে যত্নসহকারে বীজ গুঁজে দিতেন, যেন ছোট্ট একটা ঘুমের মধ্যে দুর্লভ কিছু রাখছেন। জানি না এখন এই মাটির দেখভাল কে করে। হয়তো কেউ নয়। হয়তো মাটি নিজেই ঠিক করেছে তার আর আমাদের দরকার নেই। দোষ দিতে পারি না। আমরা কি তার সাথে ভালো কিছু করেছি। কিন্তু বৃদ্ধ মানুষের মতো আমার কষ্ট হচ্ছে, প্রতিটি পাতার জন্য যা একসময় আলো ধরত।

কাল আমি চলে যাব। ফিরব না। আমার শোকও ফিরবে না। কিন্তু হয়তো কোথাও, এক শত বারো বছর পর, কেউ মায়ের সেই কোমলতায় নতুন মাটিতে একটি বীজ গুঁজে দেবে। এতটুকু যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি কী হতে পারে।

 

যাত্রা অনুষ্ঠান তিনশো স্থানে একসাথে পালিত হয়েছিল, টিকে থাকা নেটওয়ার্কগুলোয় সম্প্রচারিত হয়েছিল এবং বসুধার  সাংস্কৃতিক আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়েছিল। এটা উদযাপন ছিল না। এটা ছিল আরও জটিল কিছু — কিছুটা বিদায়, কিছুটা ক্ষমাপ্রার্থনা, কিছুটা সংকল্প। তেইশটি ধর্মের ধর্মীয় নেতারা নিজ নিজ ভাষায় প্রার্থনা করলেন। উনিশটি স্কুলের শিশুরা একাত্তরটি ভাষায় গানের রেকর্ডিং পাঠাল। দশকের পর দশক যুদ্ধ করা সরকারগুলো যৌথ বিবৃতি দিল যা কেউ পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি কিন্তু সবাই কৃতজ্ঞ ছিল।

প্রিয়া পোডিয়ামে দাঁড়ালেন — হোলোগ্রাফিক পোডিয়াম; তিনি ততক্ষণে কক্ষপথে — ক্যামেরার দিকে তাকালেন এবং কী বলবেন ভাবলেন। চোদ্দটি বক্তৃতা লিখে বাতিল করেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন:

প্রিয়া: "আমরা এটা বেছে নিইনি। কোনো সৎ মানুষ বলবেন না তিনি এখানে থাকতে পেরে খুশি, চলে যেতে খুশি, যে কারণে চলে যেতে হচ্ছে সে কারণে খুশি। আমরা যাচ্ছি কারণ আমাদের যেতে হবে। কিন্তু 'যেতে হবে' সম্পর্কে একটা কথা বলতে চাই। 'যেতে হবে' মানে সবসময় পরাজয় নয়। কখনো কখনো 'যেতে হবে' হল সেই দিশা যেটা সবসময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, অন্য কোনো পথে যা আমরা খুঁজে পেতাম না। আমরা এমন একটি প্রজাতি যে বরফযুগ, মহামারী এবং যুদ্ধের মাঝেও বেঁচে থেকেছি। আমরা সবসময়, কোনো না কোনোভাবে, পরের পৃথিবীর পথ খুঁজেছি। আজ রাতে আমরা মানবজাতির সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করছি। এই যাত্রার সময়সীমা এই ঘরে উপস্থিত সবাইকে — এই সম্প্রচার যারা দেখছেন সবাইকে — কয়েক দশক ছাড়িয়ে যাবে। যে শিশুরা কেপলার-৪৪২বির মাটি স্পর্শ করবে তারা এখনো জন্মায়নি। আমরা এই যাত্রা নিজেদের জন্য করছি না। তাদের জন্য করছি। আর পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর জন্য যে এমন একটি পৃথিবীর ছবি এঁকেছে যা সে কখনো দেখবে না। আমরা তোমাদের সবাইকে বহন করছি। প্রতিটি মানুষকে। তোমাদের পেছনে ফেলে যাচ্ছি না। তোমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।"

সম্প্রচার এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে সাঁইত্রিশ সেকেন্ডের জন্য কেটে গেল কারণ একটি রিলে স্যাটেলাইট সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষে আঘাত পেয়েছিল।

 

পঞ্চম অধ্যায়: উৎক্ষেপণ — বছর শূন্য

বসুধা  L2 পয়েন্ট থেকে রওনা হল ১৪ই মার্চ, ২১৯২ সালে। এই দিনটি আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিনে হওয়ায়, মিশনের সাংস্কৃতিক কমিটি মনে করেছিল যে এই স্বীকৃতিটা প্রাপ্য।

থিসিয়াস ড্রাইভ চালু হল রাত ০৩:১৭ ইউটিসিতে, এবং জাহাজ চলতে শুরু করল।

এটা রকেটের মতো করে উৎক্ষেপিত হয়নি, যেভাবে অ্যাপোলো আর প্রথম যুগের সেই রকেটগুলি পুরনো আগুনজ্বলা উপায়ে যাত্রা শুরু করত। কোয়ান্টাম-ইনারসিয়াল ড্রাইভ তার চেয়ে আনেক শান্ত ছিল। একটা গুনগুন শব্দ। গভীরের মধ্যে কিছু আরও গভীর হওয়া। বসুধার ভেতরে অনুভূতিটা ছিল সূক্ষ্ম — সামান্য ভার লাগার মতো, আস্তে পেছনে ঠেলার মতো, যা প্রথম ছয় ঘণ্টায় বাড়তে থাকল ড্রাইভ পূর্ণ শক্তিতে পৌঁছানো অব্ধি। প্রায় শান্তিপূর্ণ একটি পদ্ধতি ছিল। মানুষের বিজ্ঞ্যান ও প্রযুক্তি তে অভাবনীয় অগ্রসর এর ফলাফল।

প্রিয়া কমান্ড সেন্টারে বসে যন্ত্রপাতি দেখলেন কিন্তু কোন কথা বললেন না।

অর্জুন, কাঠামোগত পর্যবেক্ষণ স্টেশনে তার পাশে বসেছিল। কিছুক্ষন পর সে আস্তে করে বলল:

অর্জুন: "হাল ইন্টেগ্রিটি স্বাভাবিক। গ্রাফিন-এয়ারোজেল ল্যামিনেট মডেল পূর্বাভাসের এক শতাংশের মধ্যে কাজ করছে।"

প্রিয়া: "ভালো। লিয়াংকে বলো।"

অর্জুন: "সে ইতিমধ্যে জানে। চার ঘণ্টা ধরে স্ট্রেস সেন্সর দেখছে।"

প্রিয়া: "তবুও বলো।"

বাইরে পেছনের ক্যামেরা অ্যারেতে পৃথিবী এখনও দৃশ্যমান — ছয় ঘণ্টা আগের চেয়ে ছোট। বাইরে  শব্দটা এখন আলাদা ভার পাচ্ছিল, দার্শনিক ভার, দূরত্বের ভার । আরও ছয় ঘণ্টায় আরও ছোট হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবী একটি আলোকবিন্দুতে পরিণত হবে, যা অন্য আলোকবিন্দু থেকে আলাদা করা যাবে না। এখন যেটা একটি উজ্জ্বল নীল বিন্দু দেখাচ্ছে তখন আর সেই নীল রঙ বোঝা যাবে না। মানুষের আদি বাসস্থানের শেষ পর্যন্ত কি পরিণতি হবে তা বসুধার কেউ জানে না। জানার উপায় ও নেই। যে গ্রহে মানুষ তার শিকড় বিস্তার করেছিল হাজার হাজার বছর ধরে, আজ সেই গ্রহ কে শেষ বিদায় জানিয়ে চলে যেতে হল তাকে। কিছু মানুষ মানব জাতির প্রতিনিধি হয়ে আজ তাঁরাদের মাঝে কোথাও একটি অনিশ্চিত, কিন্তু নতুন কাহিনী রচনা করতে চলল। বাকিরা পৃথিবীতে বসে এক ভয়ংকর মৃত্যুর অপেক্ষায় রইল।

মীরা এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ ডেকে একাই বসে রইলেন। তাঁর গ্রহের দিকে তাকালেন। তার টার্মিনেটর লাইনের দিকে — আলো ও অন্ধকার গোলার্ধের মধ্যকার নরম সীমারেখা।

২১৭৮ সালে পৃথিবীতে একযোগে নয়টি সক্রিয় সশস্ত্র সংঘাত চলছিল। প্রতিটি যুদ্ধ একা একা হয়তো পৃথিবীকে শেষ করত না। কিন্তু এত যুদ্ধ একসাথে — এবং এই যুদ্ধগুলোর সাথে যে পরিবেশগত বিপর্যয় জড়িয়ে ছিল — তাই মিলে এমন একটি অবস্থা তৈরি করল যা বিজ্ঞানীরা "সমন্বিত পতন" বলতেন। যুদ্ধে পোড়া তেলক্ষেত্র, ধ্বংস করা রাসায়নিক কারখানা, বিষাক্ত করা নদী, মরুভূমি হয়ে যাওয়া কৃষিজমি — এই সব মিলে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন, সালফার ও নাইট্রোজেন ঢুকল তা পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে দিল যার উপর মানব সভ্যতা দশ হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। বর্ষা অনিয়মিত হল। তারপর বিলুপ্ত হল। সমুদ্র উপকূলীয় শহর গ্রাস করল। আমাজন মরল — ধীরে, যন্ত্রণায়, রাসায়নিক বিষে। আর্কটিক গলে মিথেন ছাড়তে শুরু করল যা আরও বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঘটাল। ২১৮০ সালে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পযুগের আগের চেয়ে চার দশমিক সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিষুবীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশ মানুষের বাসযোগ্যতার সীমার বাইরে চলে গেছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উপ-সাহারান আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল দিনের বেলা খোলা আকাশের নিচে থাকার মতো অবস্থায় রইল না। এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ ততদিনে বাস্তুচ্যুত। জাতিসংঘ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আর সেই পৃথিবীতে, সেই ধোঁয়া ও আগুন ও বিষাক্ত বাতাসের মধ্যে, কিছু মানুষ তখনও কাজ করে যাচ্ছিল। তারা জানত পৃথিবী শেষ হচ্ছে। তারা জানত একটাই পথ বাকি আছে। সেই মুক্তির পথ হল বিজ্ঞ্যানের পথ, জ্ঞানের পথ, আলোর পথ। যে পথে রয়েছে অনেক কাটা, অনেক বাধা, অনেক অন্ধকার। কিন্তু জ্ঞানের পথ প্রথমে যতই তমসাবৃত হোক না কেন, সেই পথ অনুসরণ করলে আলোর দেখা মিলবেই।

মীরা নোটবুকে লিখলেন:

এর জন্য আমার কাছে শব্দ নেই। তাই একটি শব্দই ব্যবহার করব। বিদায়।

 

বসুধা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে নির্মিত সবচেয়ে বড় কৃত্রিম কাঠামো — দৈর্ঘ্যে চব্বিশ কিলোমিটার, প্রস্থে সাড়ে আট কিলোমিটার, এবং উচ্চতায় ছয় কিলোমিটার। আকৃতিতে এটা ছিল অনেকটা একটি বিশাল সামুদ্রিক শামুকের খোলসের মতো — একটি প্রধান কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড বা স্পাইন যার চারপাশে সাতটি বৃত্তাকার আবাসিক বলয় বা রিং ঘুরত ধীরে ধীরে, যাতে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হয়। এই সাতটি রিংয়ের প্রতিটির ব্যাস ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার, এবং প্রতিটি রিংয়ে বাস করত গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ — নিজস্ব রাস্তা, বাজার, বিদ্যালয়, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং জনসমাবেশের স্থান নিয়ে সম্পূর্ণ ছোট্ট একটি শহরের মতো। রিংগুলোর ভেতরের দেয়ালে লাগানো ছিল উচ্চ-রেজোলিউশন বায়োলুমিনেসেন্ট প্যানেল যা পৃথিবীর দিনরাতের চক্র অনুকরণ করত — ভোরের নরম আলো থেকে দুপুরের পূর্ণ সূর্যালোক, সন্ধ্যার কমলা আভা থেকে রাতের তারাভরা আকাশ — কারণ বিজ্ঞানীরা জানতেন মানুষের মন ও শরীরের জন্য এই দৈনন্দিন আলোর ছন্দ অপরিহার্য। প্রতিটি রিংয়ের কেন্দ্রে ছিল একটি উন্মুক্ত এলাকা যাকে বলা হত অ্যাট্রিয়াম — যেখানে মাটি আনা হয়েছিল পৃথিবী থেকে, আসল মাটি, এবং সেখানে জন্মাত ফল, সবজি, ভেষজ উদ্ভিদ এবং ফুল। কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ডের ভেতরে ছিল জাহাজের মস্তিষ্ক — কমান্ড সেন্টার, থিসিয়াস প্রপালশন ইঞ্জিন কক্ষ, শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র এবং জীবন-সহায়তা ব্যবস্থাপনার প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ। শক্তির জন্য বসুধা নির্ভর করত চারটি কম্প্যাক্ট ফিউশন রিঅ্যাক্টরের উপর যা হিলিয়াম-৩ এবং ডিউটেরিয়াম দ্বারা চালিত হত — যাত্রার আগেই পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ করা হয়েছিল চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে সংগ্রহ করে। জাহাজের বাইরের স্তরটি ছিল অর্জুন বোসের উদ্ভাবিত গ্রাফিন-এয়ারোজেল কম্পোজিট ল্যামিনেট — হালকা, স্বয়ংক্রিয়-মেরামতকারী এবং মহাকাশের মাইক্রোমেটিওরাইট ও বিকিরণ থেকে সুরক্ষাদায়ী। তার বাইরে ছিল একটি চৌম্বকীয় সুরক্ষা বলয় — ম্যাগনেটোস্ফিয়ার শিল্ড — যা সৌর বায়ু ও মহাজাগতিক রশ্মির বিপদ থেকে ভেতরের জীবনকে রক্ষা করত।

জাহাজের অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলো এভাবে সাজানো ছিল: প্রথম ও দ্বিতীয় রিং ছিল সম্পূর্ণ আবাসিক — পরিবার, একক মানুষ, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য আলাদা আলাদা আবাসনক্ষেত্র। তৃতীয় রিং ছিল কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য — এখানে ছিল হাইড্রোপনিক ফার্ম যেখানে জলের মধ্যে শিকড় ডুবিয়ে গাছ জন্মানো হত, অ্যারোপনিক চেম্বার যেখানে কুয়াশায় ভাসমান শিকড়ে পুষ্টি দেওয়া হত, এবং মাটির বাগান যেখানে চাষ হত ধান, গম, ডাল ও অসংখ্য সবজি। চতুর্থ রিং ছিল বিজ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র — পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা গবেষণা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গন্তব্য গ্রহের বিশ্লেষণের জন্য সজ্জিত ল্যাবরেটরি। পঞ্চম রিং ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য — পাঠাগার, থিয়েটার, সংগীত কক্ষ, চিত্রকলার স্টুডিও, কারুশিল্পের কর্মশালা, ধর্মীয় উপাসনার স্থান এবং শিশুদের বিদ্যালয়। ষষ্ঠ রিং ছিল চিকিৎসা ও মনস্বাস্থ্যের জন্য — হাসপাতাল, প্রসূতিকক্ষ, শল্যচিকিৎসা কেন্দ্র, মনোরোগ পরামর্শকক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ইউনিট। সপ্তম এবং শেষ রিং ছিল জৈব সংরক্ষণের জন্য — যেখানে রাখা হয়েছিল পৃথিবীর দশ হাজার উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রায়, এক লাখেরও বেশি প্রাণী প্রজাতির ডিএনএ আর্কাইভ, পাঁচ হাজার প্রজাতির পতঙ্গের জীবন্ত উপনিবেশ যারা কৃষির পরাগায়নের জন্য অপরিহার্য ছিল, এবং গবাদি পশু, ছাগল, মুরগি ও মাছের ছোট কিন্তু সক্রিয় জনগোষ্ঠী যারা যাত্রা জুড়ে প্রোটিনের উৎস এবং নতুন পৃথিবীতে পশুপালনের ভিত্তি হবে।

জাহাজের স্মৃতি বিভাগ — যাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সবাই আত্মার ঘর বলত — ছিল কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ডের একেবারে হৃদয়ে। এখানে সংরক্ষিত ছিল মানব সভ্যতার সম্পূর্ণ ডিজিটাল আর্কাইভ — প্রতিটি ভাষার ব্যাকরণ ও অভিধান, ছয় হাজার বছরের সাহিত্য, পঁচিশ হাজার বছরের শিল্পকলার ডিজিটাল প্রতিলিপি, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার সম্পূর্ণ জ্ঞানভাণ্ডার, তিন লাখেরও বেশি ঘণ্টার সংগীত রেকর্ডিং, দশ লাখ পারিবারিক ইতিহাস, এবং সেই ছবিটি — লাগোসের ছোট্ট আমারার হাতে আঁকা দুই চাঁদের নীল-সবুজ পৃথিবী — ডিজিটাল আর কাগজে, উভয়ভাবেই সংরক্ষিত, কারণ মীরা নায়ার জোর দিয়ে বলেছিলেন যে কিছু জিনিস শুধু ডেটা হিসেবে রাখলে চলে না, সেগুলোকে স্পর্শ করার মতো করে রাখতে হয়। পুরো আর্কাইভ তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা সার্ভার সিস্টেমে সংরক্ষিত ছিল — একটি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয়টি, দ্বিতীয়টি ব্যর্থ হলে তৃতীয়টি — কারণ প্রিয়া চন্দ্রশেখর একটি কথা বলেছিলেন ডিজাইনের শুরুতে যা পুরো দলের মনে গেঁথে গিয়েছিল: "আমরা মানুষ হারালে মানবজাতি বাঁচতে পারে। কিন্তু মানবজাতির স্মৃতি হারালে যা বাঁচবে তা মানুষের শরীর মাত্র, মানুষ নয়।"

বসুধার জানালা ছিল না — বাইরের মহাকাশ দেখার জন্য ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ বন্দর ছিল, যেগুলো বিশেষ বিকিরণ-রোধী কাচে ঢাকা ছিল। কারণ মহাকাশের বিকিরণ এত তীব্র যে সাধারণ কাচ দিয়ে তা ঠেকানো যায় না। কিন্তু প্রতিটি আবাসিক ইউনিটের দেয়ালে ছিল উচ্চ-সংজ্ঞা স্ক্রিন যা বাইরের ক্যামেরার দৃশ্য সরাসরি দেখাত — তারার মাঠ, পেছনে ক্রমশ ছোট হতে থাকা সূর্য, সামনে অন্ধকারে উজ্জ্বল হতে থাকা গন্তব্যের দিক। জাহাজের পর্যবেক্ষণ ডেক ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা — বিশেষ করে রাতে, যখন কৃত্রিম আলো কমিয়ে দেওয়া হত এবং মানুষ সেই অন্ধকারে বসে আলোকবিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকত যেগুলো হাজার হাজার বছর আগে থেকে মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। এটা ছিল বসুধার  সবচেয়ে মানবিক জায়গা — যেখানে মানুষ একা আসত, ভাবত, কাঁদত, আর অনুভব করত যে এই অসীম অন্ধকারে তারা ছোট্ট কিন্তু সাহসী, ক্ষণস্থায়ী কিন্তু উদ্দেশ্যময়।

প্রথম সপ্তাহে উদ্বেগজনিত লক্ষণের জন্য সতেরোটি চিকিৎসা পরামর্শের প্রয়োজন পড়লো। চারজনের মানসিক অবসাদ কাটানর ওষুধ দরকার হল। দুজনকে আতঙ্কের অবস্থা থেকে মনোরোগ চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করা হল। একটি সাত বছর বয়সী শিশু, দুই দিন ধরে অবিরাম কাঁদল, এবং শেষ পর্যন্ত কোনো কাউন্সেলরের দ্বারা উপশম না হওায়, রহিমের গল্প শুনে সে শান্ত হল। রহিম তার পাশে বসে এমন একটি পৃথিবীর গল্প বললেন যা সে কখনো দেখেনি এবং কখনো ফিরে যাবে না — এত সুন্দর ও অদ্ভুত গল্প যে শিশুটি শেষ পর্যন্ত তার বৃদ্ধ কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।

কেউ চলে যায়নি। কেউ কোথাও যায়নি। যাওয়ার কোনো জায়গাও ছিল না। দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে লাগলো যা কোনো মিশন পরিকল্পনাকারী কখনও আশা করেননি, যদিও হয়তো করা উচিত ছিল: বসুধার পরিবেশ বাড়ির মতো হয়ে উঠতে লাগলো।পরিপূর্ণ বাড়ি নয়। আরামদায়ক বাড়ি নয়। অনিশ্চিত বাড়ি, ভঙ্গুর কিন্তু সচেতন। যেকোনো নতুন জায়গায় যখন কোন পরিবার প্রথম বাড়ি করে সেরকম — আমরা এখানে আছি, একসাথে আছি, এটাই এখন আমাদের বাসস্থান, এটাই আমাদের ভবিতব্য। এতটুকু যথেষ্ট হতে হবে। কারণ এতটুকুই আছে।

 

তৃতীয় পর্ব: দীর্ঘ অন্ধকার

ষষ্ঠ অধ্যায়: একত্রিশতম বছর

অর্জুন বোস যাত্রার একত্রিশতম বছরে ঘুমের মধ্যে মারা গেলেন। চিকিৎসকদের মতে হৃদরোগ জড়িত কারণে এই মৃত্যু। বয়স হয়েছিল পঁয়ষট্টি। তিনি ছিলেন বসুধার  প্রধান কাঠামো কর্মকর্তা, জাহাজে জন্ম নেওয়া দুই মেয়ের বাবা, আর একটি ছেলের দাদু। সেই ছেলের নাম রাখা হয়েছিল পৃথিবী।

তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হল কেন্দ্রীয় অ্যাট্রিয়ামে, যেটাকে সম্প্রদায় ত্রিশ বছরে একটি পার্ক ও ক্যাথিড্রালের মাঝামাঝি কিছুতে রূপান্তরিত করেছিল। বাঁকানো দেয়ালে শিল্পীদের আঁকা বনজঙ্গল আর নদীর ছবিতে সাজানো হয়েছিলো সেই জায়গা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যারা এই ছবি একেছিল তারা নদী বা জঙ্গলের কোনোটাই কখনও দেখেনি। সাবধানী চাষের আলোর নিচে জীবন্ত গাছপালা, ভালো মাটির গন্ধ যা গভীর মহাকাশে তিন দশক ধরে সভ্যতার স্মৃতির সচেতন কাজ হিসেবে বজায় রাখা হয়েছিল সেই জায়গায়।

মীরা, এখন বিরাশি বছর বয়সী, শেষকৃত্যের বক্তৃতা দিলেন। তাঁর হাত সামান্য কাঁপছিল, কিন্তু কণ্ঠস্বর নয়।

মীরা: "অর্জুন আমার কাছে এসেছিল গবেষণার সঙ্গী হয়ে। সে জিনিসের উপকরণ নিয়ে চিন্তা করতে খুব ভালবাসত, এবং সেটাই কালান্তরে তার গবেষণার মূল বিষয় (ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স) হয়ে ওঠে। ওঁ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে দেখত আর ভাবতো যে তা কী দিয়ে তৈরি এবং কীভাবে সেটা আরও ভালো করা যায়। আমরা যে জাহাজে দাঁড়িয়ে আছি তা আজ আছে কারণ সে তার আঠাশ বছরের জন্মদিনের রাতে আট ঘণ্টায় একটি গবেষণাপত্র লিখেছিল। তোমার চারপাশের দেয়াল তার পরিকাল্পনায় তৈরি। তোমার পায়ের নিচের মেঝে তার চিন্তাভাবনার ফল। প্রতিটি বছর যে আমরা বিপর্যয়কর কাঠামো ব্যর্থতার কবলে না পড়ে নিরাপদে ভ্রমণ করছি তা অংশত অর্জুন বোসের উপহার। বসুধায় আমরা প্রতিদিন তাকে মিস করব। একটা পৃথিবী আমরা হারিয়েছি, আরেকটার সন্ধানে আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়েছি। দুই পৃথিবী মনে রাখবে অর্জুনকে”।

তার তিন বছরের নাতি পৃথিবী, বুঝতে পারছিল না দাদু কোথায় গেলেন।

পঁয়ত্রিশতম বছরের মধ্যে একটি গোটা প্রজন্ম বসুধায়  জন্ম নিলো যারা বাইরে থেকে সূর্য কখনো দেখেনি, যারা আর্কাইভ ও গল্পের মাধ্যমেই পৃথিবীকে জানতে শিখেছিল, যারা জাহাজকে যাত্রার বাহন হিসেবে নয় বরং তাদেরপৃথিবী  হিসেবে ভাবত — একমাত্র সেই পৃথিবী যা মানুষকে কখনো ধারণ করেছিলো। তারা পৃথিবীতে জন্মানো মূল যাত্রীদের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল স্বভাবে, চরিত্রে, ভাবনায়। এমন এক জড়তা বা সংকীর্ণতা তাদের গ্রাস করেছিল যা ভাষায় প্রকাশ করা যায়ে না। তারা এমন কিছু ভাবনার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত যা পৃথিবীতে জন্মানো মানুষের মেনে নিতে আসুবিধা হত। তারা জানতো যে নিকটতম তারা কিছু দশকের ভ্রমণ দূরে, তারা জানতো যে মহাবিশ্ব অপরিসীম বিশাল। তাদের মধ্যে সুখদুঃখের অনুভূতি খুব কম ছিল। তারা যাত্রার উদ্দেশ্যটা উত্তরাধিকারে পেয়েছিল, কিন্তু তার আগে মানব সভ্যতার যে ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল তা তারা উপলব্ধি করতে পারতো না। সেই অজ্ঞতা তাদের এক অর্থে মানসিক ভাবে হালকা করে দিয়েছিল। তাই বৃদ্ধ প্রজন্ম এখনও নিঃশব্দে যে শোক বহন করছিল তা তারা পুরোপুরি কখনো বুঝে উঠতে পারে নি।

আমারা ওসেই-বনসু — এখন চুয়ান্ন বছর বয়সী, এখনও জাহাজের প্রধান জীবাণু-জীববিজ্ঞানী, কিছুটা প্রধান বিজ্ঞান-দার্শনিকও। উনি জাহাজ-জন্ম প্রজন্মের জন্য একটি সেমিনার পরিচালনা করতেন যার নাম দিয়েছিলেন "যা কখনো দেখিনি।" ইতিহাস পাঠ নয়, জীবনের অভিজ্ঞতার শূন্যস্থান পেরিয়ে অনুভূতি প্রেরণের প্রচেষ্টা। তার সেই সেমিনারের নিয়মিত দর্শক ছিল ডেভিড  নামের সতেরো বছর বয়সী একটি ছেলে যার মা ছিল একজন জাপানি এবং বাবা একজন ইংরেজ। ডেভিডের জন্ম হয়েছিল জাহাজের মেডিক্যাল বেতে, একটি সৌর বায়ু ঘটনার সময়। ঠিক সেই সময় জাহাজের হাল সেন্সরে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুন্দর এক অরোরাল প্রদর্শনী তৈরি হয়েছিল। কানাঘোষা শোনা যায়ে যে জাহাজে অনেকেই তাকে আশ্চর্য ক্ষমতা সম্পন্ন মনে করে। ডেভিড একদিন আমারাকে এমন একটি প্রশ্ন করল যার জন্য আমারা তৈরি ছিলেন না।

ডেভিড: "পৃথিবীতে মানুষকে যা ছেড়ে আসতে হলো তা কি সত্যিই অমূল্য ছিল?"

আমারা একদম স্থির হয়ে গেলেন। শোনেননি বলে নয়। বরং এত ভালো শুনেছিলেন যে প্রশ্নটা তাঁর ভেতরে পুরনো, সাবধানে বন্ধ করে রাখা একটা সিন্দুক খুলে দিল। তিনি সেমিনার ঘরের জানালার কাছে গেলেন — সেই লম্বা দেখার জানালা যেটা দিয়ে তারার করিডোর দেখা যায় — এবং ক্লাসের দিকে পিঠ দিয়ে প্রায় এক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ কথা বলল না। বছরের পর বছর তাঁর কাছে পড়ে তারা শিখেছিল যে তাঁর নীরবতা শূন্যতা নয়। এটা ঝড়ের আগের আকাশ।

যখন তিনি ঘুরলেন, তাঁর মুখে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। তখন তাঁকে তারার মাঝে একটি জাহাজে চুয়ান্ন বছর বয়সী বিজ্ঞানীর মতো দেখাচ্ছিল না। দেখাচ্ছিল লাগোসের সেই মেয়েটির মতো যে একসময় এমন একটি পৃথিবীর ছবি এঁকেছিল যা সে কখনো দেখেনি, এবং একজন অপরিচিত মানুষকে পাঠিয়েছিল শুধু এই অনুরোধ নিয়ে: আমাকে মনে রেখো।

আমারা: "তুমি যখন বললে 'যা ছেড়ে আসতে হলো ' — ডেভিড, তুমি কি বুঝেছো তুমি আসলে কী জিজ্ঞেস করছ? তুমি জিজ্ঞেস করছ যে একটি পুরো পৃথিবী — একটি গ্রহ, যা চারশো কোটি বছর ধরে নিজেকে তৈরি করেছিল শুধু মানুষের জন্য নয়, সব প্রাণের জন্য — সেই পৃথিবীর মূল্য কত? তাঁকে হারানোর বেদনা কি যুক্তিসংগত ?এই প্রশ্নের উত্তর আমি তোমাকে যুক্তি দিয়ে দিতে পারব না। কারণ এটা যুক্তির প্রশ্ন নয়। এটা অনুভবের প্রশ্ন। আর অনুভব কখনো 'মূল্য'র ভাষায় কথা বলে না।"

তিনি থামলেন। তাঁর হাতের দিকে তাকালেন — মনে মনে যেন কিছু কথা গুছিয়ে নিলেন।

আমারা: "আমার বয়স যখন দশ বছর, আমি লাগোসে থাকতাম। তখনও লাগোস ছিল — ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু ছিল। আমাদের বাড়ির পেছনে একটা ছোট্ট বাগান ছিল যেখানে আমার মা কলাগাছ লাগিয়েছিলেন। বর্ষার সময় সেই গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ত — টুপটাপ, টুপটাপ — এবং সেই শব্দটা, সেই নির্দিষ্ট শব্দটা, বড় পাতায় বৃষ্টির সেই ভারী ফোঁটার শব্দ — পৃথিবীর আর কোথাও ঠিক সেরকম শোনা যেত কিনা জানি না। কিন্তু আমাদের বাড়ির পেছনে সেটা শোনা যেত। প্রতি বর্ষায়।"

তিনি থামলেন। গলা দিয়ে কিছু একটা নামালেন।

আমারা: "আমি সেই শব্দ আর কখনো শুনব না। এই জাহাজে বৃষ্টি হয় না। আমাদের কৃত্রিম জলচক্র আছে, সেচব্যবস্থা আছে, হাইড্রোপনিক ফার্ম আছে। কিন্তু কলাপাতায় বৃষ্টির শব্দ নেই। সেই শব্দটা হারিয়ে গেছে। আমার সাথে। কারণ সেই শব্দ মনে রাখার জন্য এখন শুধু আমি আছি, আর আমিও একদিন থাকব না।"

ক্লাসঘর সম্পূর্ণ নীরব। বাইরে দেখার জানালার ওপাশে তারাগুলোও যেন মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আমারার এই মর্মভেদী উপলব্ধি যেন তাদেরও কঠিন হৃদয় স্পর্শ করে গেলো।

আমারা: "তাহলে কি মূল্য ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ মূল্য মাপতে হলে দুটো জিনিস তুলনা করতে হয়। আর আমি কীভাবে তুলনা করব? একদিকে রাখব কলাপাতায় বৃষ্টির শব্দ, মায়ের হাসি, লাগোসের রাস্তায় ভাজা ভুট্টার গন্ধ, আটলান্টিকের ঢেউ যখন সন্ধ্যায় সোনালি হয়ে যেত — আর অন্যদিকে রাখব কী? এই জাহাজ? এই যাত্রা? আমাদের বেঁচে থাকা?"

তিনি মাথা নাড়লেন।

আমারা: "না। তুলনা হয় না। এভাবে ভাবলে উত্তর পাবে না। কিন্তু আমি তোমাকে অন্যভাবে বলি।"

তিনি এসে বসলেন — শিক্ষকের টেবিলে নয়, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, একটা চেয়ার টেনে তাদের বৃত্তে।

আমারা: "পৃথিবীতে একটা গাছ ছিল — আমাজনের গভীরে, মানুষ যেখানে কমই যেত — যার নাম ছিল ফিকাস ইনসিপিডা। সেই গাছের বীজ খেত একটা পাখি, কিছু খেত, কিছু এদিক ওদিক ছড়াত, আর সেই ছড়িয়ে দেওয়া বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মাত। পাখি ছাড়া সেই গাছ বাঁচত না। গাছ ছাড়া সেই পাখি বাঁচত না। এই সম্পর্ক কয়েক কোটি বছর ধরে চলে আসছিল — পাখি আর গাছের মধ্যে এমন একটি চুক্তি যা কেউ লেখেনি, কেউ আলোচনা করেনি, শুধু বিবর্তনের ভাষায় ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। সেই সম্পর্ক এখন নেই। সেই পাখি নেই। সেই গাছ নেই। আমাজন নেই।"

তাঁর কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে পড়ার মতো শোনালো। উনি বলে চললেন।

আমারা: "আমি জানি কারণ আমি এটা পড়েছিলাম। আর্কাইভে আছে। কিন্তু সেই পাখিটার ডাক — সেই নির্দিষ্ট পাখিটার ডাক যে সেই নির্দিষ্ট গাছের ফল খেত — সেটা আর্কাইভে নেই। কেউ রেকর্ড করেনি। কেউ জানত না এটা গুরুত্বপূর্ণ। আর এখন সেই শব্দটা মহাবিশ্ব থেকে চিরতরে মুছে গেছে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে তৈরি একটি অনন্য শব্দ — আর তা শোনা যায় নি।"

তিনি ডেভিডের দিকে তাকালেন।

আমারা: "এই ক্ষতি পূরণ হবে না। কোনোদিন না। কেপলার-৪৪২বিতে গেলেও না। নতুন পৃথিবী পেলেও না। সেই পাখিটা ফিরবে না। সেই সম্পর্ক ফিরবে না। কিছু জিনিস হারালে সেটা হারানোই থাকে — মহাবিশ্বের নিয়মে কোনো পুনরুদ্ধার নেই।"

তিনি একটু থামলেন। কথাগুলো সবার মনে বসতে দিলেন।

আমারা: "কিন্তু তাহলে আমরা কেন এখানে আছি? কেন সেই মানুষগুলো — যারা তালিকায় ছিল না, যারা পেছনে রয়ে গেল — কেন তারা আমাদের যেতে দিল? কেন সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে লাগোসে বসে জানত সে যাবে না, তবুও একটা ছবি এঁকে পাঠিয়েছিল এবং বলেছিল আমাকে মনে রেখো?"

তিনি আবার উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মধ্যে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল — একটা সংকল্প, একটা স্পষ্টতা।

আমারা: "কারণ মানুষ জানে। মানুষ সবসময় জেনেছে — হয়তো সচেতনভাবে নয়, কিন্তু হাড়ের ভেতর থেকে জেনেছে — যে জীবন এগিয়ে যেতে চায়। বীজ মাটিতে পড়তে চায়। পাখি উড়তে চায়। নদী সমুদ্রে মিশতে চায়। আর মানুষ — মানুষ তারার দিকে যেতে চায়। এটা যুক্তির কথা নয়। এটা আমাদের প্রকৃতির কথা। আমরা এমন একটি প্রজাতি যে নিজের সীমানা মেনে নেয় না। যে দিগন্তের ওপারে কী আছে সেটা না জেনে ঘুমাতে পারে না।"

আমারা: "তাহলে তোমার প্রশ্নের উত্তর এই: না, পৃথিবীর মূল্য ছিল না — যদি মূল্য মানে হয় যে একটা জিনিস দিয়ে আরেকটা কেনা যায়। পৃথিবী বিক্রি হওয়ার জিনিস ছিল না। সে হারিয়ে গেছে। সেটা অপূরণীয়। সেই ক্ষতির ভার আমরা বহন করব চিরকাল।"

তিনি তরুণ মুখগুলোর দিকে তাকালেন — এই জাহাজে জন্মানো, কখনো বৃষ্টি বা মাটি বা খোলা আকাশ না দেখা মুখ।

আমারা: "কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্যি: আমরা যদি না চলে আসতাম — যদি কেউ না চলে আসতো — তাহলে পৃথিবীর সাথে সাথে মানুষও শেষ হয়ে যেত। আর তখন মহাবিশ্বে এমন কোনো সত্তা থাকত না যে জানত যে সেই পাখিটা ছিল। যে জানত কলাপাতায় বৃষ্টির শব্দ কেমন। যে জানত সকালের রোদে হুগলি নদী কী রঙ হয়। যে জানত মাউন্ট ভেসুভিয়াস বা গ্রান্ড ক্যানিয়নের শোভা কি অপরূপ। স্মৃতিও মরে যেত।"

আমারা: "আমরা আজ এখানে আছি কারণ আমরা পৃথিবীর স্মৃতি। আমরা শুধু মানুষ নই — আমরা সেই সব হারানো শব্দের, হারানো গন্ধের, হারানো স্পর্শের শেষ সাক্ষী। এবং এই সাক্ষ্য বহন করা, এটাকে বাঁচিয়ে রাখা, এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া — এটা কি যথেষ্ট নয়? এটা কি ছোট কিছু? পৃথিবীর প্রতি, মহাবিশ্বের প্রতি এটা আমাদের দায়িত্ব নয় কি!"

ডেভিডের চোখে জল এসে গিয়েছিল। সে লুকানোর চেষ্টা করল না।

আমারা: "আর যখন তুমি কেপলার-৪৪২বিতে পৌঁছাবে — যদি আমি না পৌঁছাই, তোমাদের প্রজন্ম পৌঁছাবে — তখন তুমি নতুন মাটিতে পা রাখবে। হয়তো সেখানে একটা গাছ থাকবে যার পাতায় বৃষ্টি পড়লে অন্যরকম শব্দ হবে। হয়তো একটা পাখি থাকবে যার ডাক তুমি আগে কখনো শোনোনি। হয়তো একটা ফুল ফুটবে যার গন্ধের কোনো নাম নেই এখনো। আর সেই মুহূর্তে তুমি বুঝবে: মহাবিশ্ব থামেনি। মহাবিশ্ব অবিরাম সৃষ্টি করে চলেছে। পৃথিবী না থাকলেও। আমরা না থাকলেও। এই বিশালতার মধ্যে সৌন্দর্য থেকে যাবে।"

আমারা: "তখন তোমার বুকে একসাথে দুটো অনুভূতি হবে — শোক এবং কৃতজ্ঞতা। পৃথিবীর জন্য শোক। আর এই নতুন পৃথিবীর জন্য কৃতজ্ঞতা। এই দুটো একসাথে থাকতে পারে — এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। আমরা একসাথে ভালোবাসতে পারি এবং শোক করতে পারি। একই হৃদয়ে। এই ক্ষমতা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। শুধু আমাদের আছে। এটাই আমাদের অভিশাপ। এটাই আমাদের গৌরব।"

তিনি আবার একটু থামলেন। তারপর আস্তে, অনেক আস্তে বললেন:

আমারা: "তুমি জানো, মানুষের শরীর কী দিয়ে তৈরি? কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন — এই মৌলগুলো। কিন্তু এই মৌলগুলো কোথা থেকে এল জানো? তারা থেকে। সত্যিকারের তারা থেকে। কোটি কোটি বছর আগে যে তারাগুলো জ্বলেছিল এবং মারা গিয়েছিল, তাদের বিস্ফোরণে এই মৌলগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তারপর মেঘ হয়েছিল, তারপর গ্রহ হয়েছিল, তারপর মাটি হয়েছিল, তারপর জীবন হয়েছিল, তারপর তুমি হয়েছ। তুমি আক্ষরিক অর্থেই তারার ধূলো। তুমি মহাবিশ্বের একটা অংশ যে নিজেকে নিজে দেখতে পারছে, নিজের সম্পর্কে ভাবতে পারছে, নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজছে।"

আমারা: "এটা কি ছোট কথা? পুরো মহাবিশ্বে — যত গ্যালাক্সি, যত তারা, যত গ্রহ — এত কিছুর মধ্যে আমরাই সম্ভবত সেই বিরল অলৌকিক ঘটনা যে নিজেকে জানে, হয়তো বঝেও। পৃথিবী ছিল সেই অলৌকিক ঘটনার আঁতুড়ঘর। সেটা চলে গেছে। কিন্তু অলৌকিক ঘটনাটা — মনুষ্য জন্মের সাথে সৃষ্টি হওয়া সেই জানার ক্ষমতা, সেই ভাবার ক্ষমতা, সেই অনুভব করার ক্ষমতা — সেটা এখনো আছে। তোমার মধ্যে। আমার মধ্যে। এই জাহাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে।"

আমারা: "আমরা যদি শেষ হয়ে যেতাম — যদি কেউ না বাঁচত — তাহলে মহাবিশ্ব নিজেকে জানার সেই সুযোগটা হারিয়ে ফেলত। অন্তত মহাবিশ্বের এই কোণে যেখানে আমরা আছি। হয়তো অন্য কোথাও অন্য কোনো প্রজাতি আছে যারা তাদের তারার দিকে তাকায় এবং বিস্মিত হয়। কিন্তু আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি যে আমরা আছি। আর আমাদের থাকাটা — এই নশ্বর, ভঙ্গুর, ত্রুটিপূর্ণ থাকাটা — মহাবিশ্বকে একটু হলেও কম একাকী করে।"

ক্লাসঘরে একটা নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা গেলো না।

আমারা: "তোমার প্রশ্নের সবচেয়ে সৎ উত্তর হল এটা: আমি জানি না পৃথিবী হারানোর মূল্য কত। কিন্তু আমি জানি যে পৃথিবী আমাদের ভালোবাসত — মাটি দিয়ে, বায়ু দিয়ে, জল দিয়ে, আলো দিয়ে — কোটি কোটি বছর ধরে। আর ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল যে তুমি বেঁচে আছ। তুমি এখানে আছ। তুমি এই প্রশ্ন করতে পারছ। পৃথিবী তোমাকে তৈরি করেছিল — তোমার প্রতিটি কোষে তার উপাদান আছে। তুমি পৃথিবীকে বহন করছ। তোমার শরীরে। তোমার স্মৃতিতে। তোমার এই প্রশ্নে।"

আমারা: "সুতরাং পৃথিবী আসলে যায়নি। সে তোমার মধ্যে আছে। আমার মধ্যে আছে। এই জাহাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে আছে। আর একদিন, যখন তুমি নতুন মাটিতে বীজ পুঁতবে — পৃথিবীর মাটি থেকে আনা বীজ — সেই মুহূর্তে পৃথিবী আবার বাঁচবে। ভিন্ন আকাশের নিচে। ভিন্ন মাটিতে। ভিন্ন সূর্যের আলোয়। কিন্তু বাঁচবে।"

তিনি উঠে দাঁড়ালেন, এক মুহূর্তের জন্য জানালার বাইরে তারাদের দিকে তাকালেন — সেই ঠান্ডা, উদাসীন, অপূর্ব আলোকবিন্দুগুলো।

আমারা: "আর সবশেষে একটা কথা। তুমি আজ এই প্রশ্ন করলে। এই প্রশ্নটা কঠিন ছিল। অনেকে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যায়, কারণ উত্তর না পেলে কষ্ট পেতে হয়। কিন্তু তুমি এড়াওনি। জেনে রেখো — যে প্রশ্ন করার সাহস রাখে, সে কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। পৃথিবী আমাদের অনেক কিছু দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় যা দিয়েছিল তা হল এই কৌতূহল — এই না-জেনে-স্বস্তি-না-পাওয়ার স্বভাব। এই স্বভাবটা হারিয়ো না। এটাই তোমাকে মানুষ করে রাখবে। এটাই তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।"

ডেভিড লিখে রাখল।

সে এটা উদ্ধৃত করবে, বহু বছর পর, কেপলার-৪৪২বিতে  আগমনের দিন — যখন সে নতুন মাটিতে প্রথমবার পা রাখবে এবং বুঝবে যে আমারা ঠিকই বলেছিলেন। একসাথে শোক আর কৃতজ্ঞতা — ঠিক একই মুহূর্তে — সত্যিই অনুভব করা যায়।

  

সপ্তম অধ্যায়: অন্ধকারে ঝড়

যাত্রার তিপ্পান্নতম বছরে, একটি ঘটনায় বসুধা  প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিল। ঘটনাটা প্রপালশন টেলিমেট্রিতে একটি অসঙ্গতি দিয়ে শুরু হয়েছিল — থিসিয়াস ড্রাইভের দ্বিতীয় স্তর অ্যারেতে একটি হারমোনিক অনুরণন দেখা যায়ে, যা অনবোর্ড সিস্টেমগুলো অ-সংকটজনক বলে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু সেটি একটি ভুল ছিল। ভুলটা সফটওয়্যারের দোষ ছিল না; অনুরণনের ধরনটা এর আগে কখনো পর্যবেক্ষণ করা হয়নি কারণ কেউ কখনো টানা আন্তঃনাক্ষত্রিক গতিতে তিপ্পান্ন বছর ধরে কোয়ান্টাম- ইনারসিয়াল ড্রাইভ চালায়নি। মডেলগুলো যদিও এই শ্রেণীর অনুরণন আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু মডেলগুলো পূর্বাভাস দিয়েছিল এটা আশিতম বছরে আসবে, তিপ্পান্নতম নয়।

প্রধান প্রকৌশলী ডঃ ইউনা পার্ক — লিয়াংয়ের প্রাক্তন ছাত্র, এখন একচল্লিশ এবং জাহাজে সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ প্রপালশন ইঞ্জিনিয়ার — এটা ধরলেন। তিনি ব্যাপারটা ধরতে পারলেন কারণ তিনি যা সবসময় করতেন তাই করলেন: জাহাজের কথা শুনলেন। রূপকভাবে নয়। তিনি প্রতিদিন সকালে বিশ মিনিট প্রপালশন বেতে চোখ বন্ধ করে বসতেন এবং ড্রাইভের শব্দ শুনতেন, যেভাবে একজন ডাক্তার হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনেন। তার সেই দক্ষ কানে অসঙ্গতির শব্দ বেজে উঠলো।

ইউনা: "আমাদের একটা সমস্যা আছে।"

অনুরণন, সমাধান না করলে, বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় স্তর অ্যারে অস্থির হয়ে যাবে। একটি অস্থির দ্বিতীয় স্তর অ্যারে সম্পূর্ণ ড্রাইভ ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের বর্তমান গতি ও অবস্থানে সম্পূর্ণ ড্রাইভ ব্যর্থতা — পৃথিবী থেকে তিপান্ন আলোকবর্ষ, কেপলার-৪৪২বি থেকে ঊনষাট আলোকবর্ষ দূরে — আমাদের ভাসিয়ে দেবে।

আমরা আলোর গতির ছিয়াশি শতাংশে গন্তব্য ছাড়িয়ে উড়ে যাব এবং চিরকাল অন্ধকারে চলতে থাকব। বসুধায় থাকা সমস্ত চল্লিশ হাজার দুইশো উনিশজন মানুষসহ।

তখন কমান্ডার জোনাস রেইনহোল্ট  ছিলেন জাহাজের কাণ্ডারি। প্রিয়া একচল্লিশতম বছরে ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। জোনাস তখন থেকে কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি একটি জরুরি ইঞ্জিনিয়ারিং মিটিং ডাকলেন। বয়স একাত্তর। চুল পুরোপুরি সাদা এবং চোখ সবসময়ের মতো: সতর্ক, ধৈর্যশীল, বিপদে অভ্যস্ত।

জোনাস: "বিকল্পগুলো।"

ইউনা: "দ্বিতীয় স্তর নিয়ন্ত্রিত ভাবে বন্ধ ও পুনরায় চালু করার চেষ্টা করতে পারি। বন্ধের সময় অনুরণন বাড়তে থাকবে। অ্যারে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে পুনরায় চালু করার ছয় ঘণ্টার সময় আছে।"

জোনাস: "সাফল্যের সম্ভাবনা।"

ইউনা: "তেতাল্লিশ শতাংশ। হয়তো। মডেলিং অনিশ্চিত কারণ আমরা এমন ভূখণ্ডে আছি যা কোনো মডেল কখনো কভার করেনি।"

জোনাস: "বিকল্প।"

ইউনা: "দ্বিতীয় স্তর সম্পূর্ণ বাইপাস করে শুধু প্রথম ও তৃতীয় স্তরে চলা। কম গতি — পয়েন্ট-জিরো-সিক্স-থ্রি-সি-তে নামব — কিন্তু ড্রাইভ স্থিতিশীল থাকবে। যাত্রার সময় প্রায় একষট্টি বছর বাড়বে।"

ঘরে নীরবতা।

জোনাস: "একচল্লিশ অতিরিক্ত বছর।"

ইউনা: "হ্যাঁ।"

জোনাস: "আমরা বর্তমানে তিপ্পান্নতম বছরে আছি। জাহাজে চল্লিশ হাজার মানুষ আছে,যার এক-তৃতীয়াংশ জাহাজ-জন্ম। আমাদের বর্তমান আনুমানিক আগমন ছিল এক শত বারোতম বছরে। একচল্লিশ বছর যোগ করলে এক শত তিপ্পান্নতম বছরে পৌঁছানো যাবে।"

ইউনা: "হ্যাঁ।"

জোনাস: "জাহাজে এখন সবচেয়ে ছোট প্রজন্ম — তারা পৌছাতে পারবে না। এখনো অজন্ম — পরবর্তী প্রজন্ম — তাদের কেউ কেউ হয়ত পৌঁছাবে। তার পরের প্রজন্ম পৌঁছাবে। কিন্তু আজকে বেঁচে থাকা প্রত্যেকে পৌঁছাবে না।"

ইউনা: "হ্যাঁ।"

জোনাস তার হাতের দিকে তাকালেন। বড় হাত, পাইলটের হাত, দশকের পর দশক যন্ত্রপাতিতে ভরসা রাখা এবং সমান পরিমাণে অবিশ্বাস রাখার হাত।

জোনাস: "আর তেতাল্লিশ শতাংশ বিকল্প।"

ইউনা: "সফল হলে পরিকল্পনামতো চলব। ব্যর্থ হলে — যদি পুনরায় চালুর সময় অ্যারে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় — আমাদের কোনো প্রপালশন থাকবে না। কোনো গতি কমানো নেই। কোনো পথ সংশোধন নেই। আমরা মহাশূন্যে এক হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব হয়ে যাবো।"

দীর্ঘ নীরবতা।

আমারা: "আমি সবার সামনে কিছু বলতে চাই। এবং রেকর্ডে থাকুক।"

জোনাস: "বলুন।"

আমারা: "আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছিল দ্রুত পৌঁছানোর জন্য নয়। পৌঁছানোর জন্য। যারা এই জাহাজের স্বপ্ন সম্ভব করেছেন তারা যা সহ্য করেছেন — তাদের ক্ষতি, তাদের শোক, যে মানুষদের আমরা পেছনে ফেলে এসেছি — এই সব তখনই অর্থপূর্ণ হবে যদি আমরা পৌছাতে পারি। এক শত বারোতম বছর হোক বা, এক শত তিপ্পান্নতম বছর, পউছাতে হবে। প্রশ্নটা গতির নয়। প্রশ্নটা বেঁচে থাকার।"

জোনাস একটু তার দিকে তাকালেন।

জোনাস: "ইউনা। বাইপাস শুরু করো। প্রথম ও তৃতীয় স্তরে চলব।"

ইউনা: "বোঝা গেছে। বাইপাস সিকোয়েন্স শুরু করছি।"

সেই সন্ধ্যায় সম্প্রদায়কে সব কিছু ঘোষণা করে দেওয়া হল। কৃত্রিম এক সন্ধ্যা, সব সন্ধ্যার মতোই, সার্কাডিয়ান ছন্দ বজায় রাখা হতো। জোনাস নিজেই ঘোষণা করলেন, সহজ ভাষায়, কিছু গোপন না করে। সম্প্রদায় এটা গ্রহণ করল যেভাবে কঠিন সময় পার করা মানুষ কঠিন খবর সহজভাবে নেয়: শোকে, রাগে, প্রশ্নে, নীরবতায়, তারপর — চলতে থাকলো জীবন।

জাহাজের বাগান বাড়ানো হল। তিনটি নতুন স্কুল খোলা হল। পেত্রা নামের একজন ঊনআশি বছর বয়সী মহিলা, ছয় মাস ধরে একটি কনসার্ট সিরিজ আয়োজন করলেন জাহাজে প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিটি সাংগীতিক ঐতিহ্য নিয়ে, এবং সমস্ত রেকর্ডিং আর্কাইভে দান করলেন। তিনি মূল চল্লিশ হাজারের একজন ছিলেন।

জীবন চলতে থাকল। সবসময়ই যেমন চলেছে।

 

অষ্টম অধ্যায়: মাঝের প্রজন্মগুলো

তিপ্পান্নতম বছর এবং এক শত কুড়িতম বছরের মধ্যের বছরগুলো নিজস্ব গঠন, নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব নায়ক-খলনায়ক তৈরি করলো। সাধারণ মানুষের অসাধারণ কাজের মধ্যে দিয়ে কেটে গেলো যুগের পর যুগ। শুধু একটাই উদ্দেশ্য— কেপলার-৪৪২বি।

একাত্তরতম বছরে ডেভিডের ছেলে রিচার্ড  প্রথম বসুধা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করলেন, সম্প্রদায় দ্বারা নির্বাচিত একটি শাসনসংস্থা, যা মূল মিশন-কমান্ড কাঠামোকে আরও গণতান্ত্রিক কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করল। এরা ছিল পৃথিবীতে জন্মানো যাত্রীদের নাতি যারা এখনো চরম বার্ধক্যে চোখ বন্ধ করলে বৃষ্টির গন্ধ পেতেন। জোনাস প্রথম কাউন্সিল মিটিংয়ে যোগ দিলেন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এবং শুধু বললেন: "এটা ঠিক। এটাই সম্প্রদায়গুলো করে যখন বড় হয়।" তারপর তার ঘরে ফিরলেন এবং প্রিয়াকে একটি চিঠি লিখলেন, যিনি ত্রিশ বছর আগে মারা গেছেন। সেই চিঠিতে তিনি তাকে সম্পূর্ণ বিষয়টা বর্ণনা করলেন। তিনি প্রতি মাসে তাকে চিঠি লিখতেন। এটা রোগ ছিল না। এটা ছিল তার অগ্রজের প্রতি ভক্তি।

একাশিতম বছরে জাহাজের জনসংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়ে গেল — মূল চল্লিশ হাজার, তিন প্রজন্মের জন্মে, এমন কিছুতে বেড়ে উঠেছিল যা মিশন পরিকল্পনাকারীরা কখনও ভাবেন নি। বসুধা  শুধুমাত্র আর যাত্রীদের জাহাজ ছিল না। এটা বাসিন্দাদের সম্প্রদায় হয়ে উঠেছিল।

পঁচাশিতম বছরে আমারা মারা গেলেন। বয়স হয়েছিল এক শত আট। তিনি শেষ দশক প্রায় পর্যবেক্ষণ ডেকে কাটিয়েছিলেন তারার দিকে তাকিয়ে, যা তাদের গন্তব্যের দিকে ধীরে ধীরে কিন্তু অনুধাবনযোগ্যভাবে উজ্জ্বল হচ্ছিল। তাঁর শেষ প্রকাশিত গবেষণাপত্র, সাতানব্বই বছর বয়সে লেখা, শিরোনাম ছিল "আগমনের নীতি: আমরা যে পৃথিবীগুলো খুঁজি তাদের কাছে আমাদের ঋণ।" মৃত্যুর পরের বছরগুলোয় এটা নতুন সম্প্রদায়ের মৌলিক দার্শনিক দলিল হয়ে উঠল।

তার প্রতিষ্ঠিত ও চার প্রজন্মে ধরে পরামর্শ দেওয়া জীবাণু-জীববিজ্ঞান বিভাগকে তাঁর শেষ রেকর্ড করা কথাগুলো হল:

"মনোযোগ দিয়ে দেখো। কাজ করার আগে জিজ্ঞেস করো। মনে রেখো যেখানেই যাই, আমরা নবাগত। তোমার বিস্ময় বহন করো, নিশ্চয়তা নয়। মহাবিশ্ব উদার হবে যদি আমরা বিনম্রতায় তার সামনে দাঁড়াই। না করলে — না করলে কী হয় তা আমরা ইতিমধ্যে জানি।"

এক শত উনিশতম বছরে, পেছনের সেন্সর অপ্রত্যাশিত কিছু শনাক্ত করল: পৃথিবীর দিক থেকে আসা বিদ্যুৎচুম্বকীয় বিকিরণের একটি সংক্ষিপ্ত, গঠিত স্পন্দন। মডুলেটেড। কৃত্রিম।

তারা সেটা ডিকোড করতে তিন মাস কাটাল। সংকেত পুরনো ছিল — এক শত উনিশ বছর পুরনো, যতক্ষণে সেটা তাদের কাছে পৌঁছাল। মানে সেই স্পন্দন যাত্রা শুরুর পরেই পৃথিবী থেকে পাঠানো হয়েছিল। যখন শেষ পর্যন্ত একটা রিডিং পাওয়া গেলো, দেখা গেল সেটা একটা সংকলন: বাছাই না হওয়া দশ হাজার মানুষের কাছ থেকে দশ হাজার বার্তা, সবাই বিদায় জানাচ্ছে। ছোট আমারার ছবিটা — নাইজেরিয়ার মেয়েটির ছবি — সংকলনের অংশ ছিল, ডিজিটাইজড করে মহাকাশ পেরিয়ে জাহাজের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল।

পৃথিবী বোস, এখন সাতচল্লিশ বছর বয়সী, অর্জুনের নাতি, সিগনাল রুমে বসে সংকলন স্পিকারে বাজতে শুনলেন। যখন শেষ হল, তিনি বললেন:

পৃথিবী: "আমরা একা নই। কখনো একা ছিলাম না। আমরা তাদের বহন করি।"

তারপর তিনি পরের চার মাস সংকলনের একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করলেন, ক্রস-রেফারেন্সযুক্ত, অনুসন্ধানযোগ্য, একটি স্মারক ইন্টারফেস সহ যা জাহাজের যে কাউকে বার্তায় নাম থাকা যেকোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্যে একটি ভার্চুয়াল মোমবাতি জ্বালানোর অপশন দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে আর্কাইভে এক লাখ ভার্চুয়াল মোমবাতি জ্বলে উঠলো যা আর কখনো নেভেনি।

 

চতুর্থ পর্ব: আগমন

নবম অধ্যায়: নতুন সূর্যের আলো

কেপলার-৪৪২বি সমন্বিত নক্ষত্রব্যবস্থা প্রথম খালি চোখে দৃশ্যমান হল এক শত আঠাশতম বছরে। পর্যবেক্ষণ বন্দরের মধ্য দিয়ে তা দেখা হল, করিডোরের আলো নিভিয়ে। কোনো ঘোষণা হয়নি। তথ্যটা জাহাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো ছড়ায় — একজন থেকে অন্যজনে। মধ্যরাতের মধ্যে কয়েকশো মানুষ পর্যবেক্ষণ ডেকে বা তাদের বাসস্থানের বন্দরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, এমন একটি আলোকবিন্দুর দিকে তাকিয়ে যা তার প্রতিবেশীদের চেয়ে একটু উজ্জ্বল, রঙে একটু উষ্ণ — K-ধরনের তারা, সূর্যের চেয়ে সামান্য ছোট এবং শীতল, আকাশের অন্ধকারের প্রান্তে কমলা-হলুদ জ্বলছে।

একাত্তর বছর বয়সী ডেভিড, পর্যবেক্ষণ ডেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন পৃথিবী বোসের এবং তার মেয়ের সাথে। পৃথিবী বোসের বয়স হয়েছিল ষাট। পৃথিবী তার মেয়ের নাম রেখেছিলেন মীরা — মীরা রায়ের নামে রাখা নাম, যিনি চল্লিশতম বছরে মারা যান। তরুণী মীরার বয়স ছিল উনিশ, এবং তারা তিনজন একসাথে দীর্ঘক্ষণ নিঃশব্দে সেই তারার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অবশেষে, তরুণী মীরা বলল:

তরুণী মীরা: "বাড়ির মতো লাগছে।"

ডেভিড তার দিকে তাকালেন।

ডেভিড: "তুমি আরেকটা দেখোনি।"

তরুণী মীরা একটু চুপ করে রইল। সে জানালার কাছে গেল — সেই জানালা যেটা দিয়ে কেপলার-৪৪২ তারাটা দেখা যাচ্ছিল, এখনো দূরে কিন্তু আগের চেয়ে অনেক বড়, অনেক উষ্ণ। সে তারার দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর বলল:

তরুণী মীরা: "দাদু, তুমি একটা কথা বলেছিলে একবার — যে পৃথিবী দেখতে কেমন ছিল সেটা তুমি বর্ণনা করতে পারবে, কিন্তু পৃথিবী অনুভব করতে কেমন লাগত সেটা বর্ণনা করতে পারবে না। আমি সেটা নিয়ে অনেকদিন ভেবেছি। আর আমি বুঝেছি — আমার কাছে এই জাহাজ ঠিক সেরকম। আমি বলতে পারব এর প্রতিটি করিডোর কোথায় যায়, প্রতিটি কক্ষে কী আছে, প্রতিটি আলোর রং কেমন। কিন্তু এই জাহাজ অনুভব করতে কেমন লাগে — সেই ঘুমের আগে যখন হাইড্রোপনিক বাগান থেকে মাটির গন্ধ আসে, সেই মুহূর্ত যখন পর্যবেক্ষণ ডেকে একা বসে তারার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে হয় আমি অনেক ছোট কিন্তু একদম একা নই — এটা আমি তোমাকে বোঝাতে পারব না। এটা আমার। এটা আমার ভেতরে। এটাই আমার পৃথিবী।"

সে একটু থামল।

তরুণী মীরা: "তুমি যে পৃথিবী হারিয়েছ, সেটার জন্য তোমার শোক আমি বুঝতে পারি না — সত্যিকার অর্থে পারি না, কারণ আমি সেটা দেখিনি, ছুঁইনি, শুঁকিনি। তুমি যখন বলো সকালের রোদে ভলগা নদীর রং, আমি কল্পনা করতে পারি কিন্তু অনুভব করতে পারি না। আর এই না-পারাটা আমার জীবনের একটা ফাঁকা জায়গা — যে জায়গাটার কথা আমি জানি কিন্তু পূরণ করতে পারি না।"

তরুণী মীরা: "কিন্তু দাদু — এই ফাঁকা জায়গাটাই আমাকে শিখিয়েছে যে বাড়ি আসলে কোনো স্থান নয়। বাড়ি হল একটা অনুভূতি যা তুমি তৈরি করো — যে মাটিতে তোমার শিকড় নামে, যে আকাশের নিচে তুমি ভাবতে বসো, যে মানুষগুলোর সাথে তুমি হাসো আর কাঁদো। তুমি পৃথিবীকে বাড়ি বানিয়েছিলে কারণ সেখানে তোমার শিকড় ছিল। আমার শিকড় এই জাহাজে। আমি এখানে জন্মেছি, এখানে হেঁটেছি, এখানে প্রথমবার কাঁদতে শিখেছি, প্রথমবার প্রেমে পড়েছি, প্রথমবার মৃত্যু দেখেছি। এই মেঝে আমার পায়ের ভার চেনে। এই বাতাস আমার নিঃশ্বাস চেনে। এটা কি বাড়ি নয়?"

পৃথিবী কিছু বললেন না। তাঁর চোখে জল এসে গিয়েছিল।

তরুণী মীরা: "আর এখন সেই তারাটা দেখছি — ওই কমলা-হলুদ আলো — আর মনে হচ্ছে সেখানে আরেকটা বাড়ি অপেক্ষা করছে। হয়তো সেই বাড়ি আমার কাছে অপরিচিত হবে প্রথমে। হয়তো সেখানকার মাটির গন্ধ আমাকে অবাক করবে। হয়তো সেখানকার বাতাস আমার ফুসফুসে একটু অন্যরকম লাগবে। হয়তো রাতের আকাশ দেখে আমি কাঁদব — কারণ সেই আকাশে আমাদের চাঁদ থাকবে না। কিন্তু তারপরও আমি যাব। কারণ মানুষ সবসময় নতুন বাড়ি তৈরি করেছে। গুহায়, তৃণভূমিতে, শহরে, মহাকাশে — আমরা থামিনি। এটাই আমাদের স্বভাব। আমরা অপরিচিতকে চেনা বানাই।"

বলাই বাহুল্য পৃথিবী সম্বন্ধে এই সব তথ্য তরুণী মীরা আর্কাইভ পোড়ে জেনেছিল।

তরুণী মীরা: "প্রিয়া দিদা বলতেন — আমি আর্কাইভে পড়েছি — যে 'মাস্ট ইজ নট অলওয়েজ ডিফিট।' বাধ্য হওয়া মানে সবসময় হার নয়। আমরা এই যাত্রায় বাধ্য হয়েছিলাম, ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই। আমি সেই নতুন মাটিতে পা রাখতে চাই। আমি সেই অজানা গন্ধ শুঁকতে চাই। আমি সেই অচেনা পাখির ডাক শুনতে চাই যার কোনো নাম এখনো নেই আমাদের ভাষায়। এই চাওয়াটা — এই কৌতূহল, এই আগ্রহ — এটা পৃথিবী আমাকে দিয়েছে। আমার রক্তে আছে পৃথিবীর সব মানুষের সাহস যারা কখনো না-দেখা জায়গায় পা বাড়িয়েছিল। ফার্দিনান্ড ম্যাগেল্লান, ক্রিস্টোফার কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, জেমস কুক, নীল আর্মস্ট্রং, তেনজিং নরগে আরও কত নাম। "

তরুণী মীরা: "আর জানো সবচেয়ে অদ্ভুত কথা কী? আমি কখনো পৃথিবী দেখিনি। কিন্তু পৃথিবী আমার মধ্যে আছে। আমারার কথা মনে করো  — তিনি বলেছিলেন আমরা তারার ধূলো। আমাদের শরীরের প্রতিটি পরমাণু কোটি কোটি বছর আগে কোনো মৃত তারার হৃদয়ে তৈরি হয়েছিল। তারপর সেই পরমাণু পৃথিবীর মাটিতে এসেছিল, মাটি থেকে গাছে, গাছ থেকে প্রাণীতে, প্রাণী থেকে মানুষে, মানুষ থেকে আমার মধ্যে। আমি পৃথিবীর মাটি বহন করছি আমার হাড়ে। আমি পৃথিবীর জল বহন করছি আমার রক্তে। আমি পৃথিবীর বায়ু বহন করছি আমার নিঃশ্বাসে। আমি পৃথিবীকে দেখিনি — কিন্তু পৃথিবী আমাকে তৈরি করেছে।"

সে তারার দিকে আবার তাকাল। তার চোখে কোনো অশ্রু ছিল না। ছিল এমন কিছু যা অশ্রুর চেয়ে গভীর — এক ধরনের শান্ত, স্থির নিশ্চয়তা।

তরুণী মীরা: "সুতরাং তুমি জিজ্ঞেস করলে আমি বাড়ি চিনি কিনা — দাদু, আমি বলব হ্যাঁ। বাড়ি শুধু সেটা নয় যেখান থেকে তুমি এসেছ। বাড়ি সেটাও যেটার দিকে তুমি এগিয়ে যাচ্ছ — এবং এগোতে এগোতে অনুভব করছ যে এটাই ঠিক। এই মুহূর্তে, এই তারার আলো দেখে, আমার ভেতরে কোনো ভয় নেই। শুধু আছে এক ধরনের গভীর, শান্ত পরিচয়ের অনুভূতি — যেন এই তারাটা আমাকে চেনে। যেন আমি সবসময় এখানেই আসছিলাম। যেন পৃথিবী আমাকে এই মুহূর্তের জন্যই তৈরি করেছিল।"

তরুণী মীরা: "এটাই প্রস্তুত হওয়া। এটাই বাড়ি ফিরে পাওয়া। ভয় না থাকা নয় — বরং ভয়ের চেয়ে বড় কিছু বুকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।"

পৃথিবী অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আস্তে হাত বাড়িয়ে মেয়ের হাত ধরলেন। কোনো কথা বললেন না। কথার প্রয়োজন ছিল না। ডেভিড তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন —  বাবা আর মেয়ে, দুটো প্রজন্ম, দুটো পৃথিবীর মাঝখানে — এবং বুঝলেন যে কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করতে নেই। শুধু অনুভব করতে হয়।

বাইরে, কেপলার-৪৪২ তারাটা জ্বলছিল। শান্ত, উষ্ণ, অপেক্ষায়।

বসুধার  ডিসেলারেশন পর্যায় সত্যিকার অর্থে শুরু হল এক শত তেত্রিশতম বছরে। তিন বছর লাগলো এই ডিসেলারেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভাবে কার্যকর করতে। একানব্বই বছর বয়সী ইউনা পার্ক এই গুরুদায়িত্ব নিজের বৃদ্ধ কাধে তুলে নিলেন। এই বয়সেও তিনি অসম্ভবভাবে, কাজ করছেন, যদিও এখন পরামর্শদাতা হিসেবে।

এক শত একান্নতম বছরে, তারা কেপলার-৪৪২ ব্যবস্থায় প্রবেশ করল।

এক শত তিপ্পান্নতম বছরে — L2 ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট ছেড়ে এক শত তিপ্পান্নতম বছর পরে, পরিকল্পিত আগমনের বছরেই বসুধা কেপলার-৪৪২বি-র সাথে কক্ষপথ মেলাল। তাদের বাঁচিয়ে রাখা বাইপাসের একচল্লিশ বছর পরে, এবং পৃথিবীর পর মানব জীবনের তিন প্রজন্ম পরে এসে গেল সেই মুহূর্ত যার জন্য হয়তো মানুষের অদৃষ্টও তৈরি ছিল না।

গ্রহটা নিচে ঘুরছিল। সবুজ । নীল নয়। মেঘ ছিল তাতে। বাস্তব, স্বপ্ন নয়।

সেন্সরগুলো তথ্যে জেগে উঠল। অক্সিজেন-নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডল কাছ থেকে নিশ্চিত হল। তরল জলের পৃষ্ঠ আচ্ছাদন ছিল আটষট্টি শতাংশ। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের তাপমাত্রা বেঁচে থাকার উপযুক্ত ছিল এবং কিছু অঞ্চলে আরামদায়ক। মীরা রায়ের ২১৮৮ সালে প্রথম লক্ষ্য করা মধ্য-ইনফ্রারেড সংকেত — যা দেড়শো বছর ধরে আলোচিত হয়েছিল — অবশেষে কিছুটা বোধগম্য হল।

জৈবিক কিছু ছিল।

এটা জীবাণুগত — অগভীর উপকূলীয় অঞ্চলে কেমোসিন্থেটিক এবং ফটোসিন্থেটিক জীবের বিশাল, জটিল মাদুর, একটি সমৃদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত ও প্রাচীন জীবমণ্ডল, কিন্তু বুদ্ধিমান নয়। সচেতন নয়। এমন কিছু নয় যা কক্ষপথে ঝুলন্ত বসুধার  দিকে তাকাবে এবং ভাববে এটা কী।

আমারার গবেষণাপত্র — আগমনের নীতি নিয়ে তার গবেষণাপত্র — নিশ্চিতকরণের পরের সর্বসাধারণ মিটিংয়ে জোরে পড়া হল। পৃথিবী পড়লেন। তিনি এটা অনেকবার পড়েছিলেন।

পৃথিবী: "তিনি লিখেছিলেন: 'আমরা মালিক হিসেবে যাচ্ছি না বরং শরণার্থী হিসেবে শিক্ষার্থী হিসেবে যাচ্ছি। বিজয়ীরূপে নয় বরং বিজিত হিসেবে — সময়ে, ক্ষতিতে, এবং নিজেদের ধারাবাহিকতার জন্য একটি প্রজাতির মরিয়া ভালোবাসায় বিজিত। আমরা যদি পৌঁছাই, তা হবে শূন্য হাত এবং পূর্ণ হৃদয় নিয়ে। আর আমরা অনুমতি চাই, যদিও চাওয়ার কেউ নাও থাকতে পারে। আমরা এই গ্রহের কাছেই অনুমতি চাই : আমরা কি এখানে থাকতে পারি? আমরা কি আবার চেষ্টা করতে পারি ? আমরা কি, এবার, যা পাচ্ছি তার উপযুক্ত হতে পারি?”

একটি নীরবতা।

আমারার আগমনের নীতি জাহাজের সকল মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছিল যে আপন খেয়ালে তাদের পূর্বপুরুষ পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে। সেই দুষ্কর্মের জন্য সেই মানুষদের উত্তসূরী হিসাবে তাদের অনুতপ্ত হওয়া উচিত এবং মহাবিশ্বের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। নতুন করে শুরু করার যে সুযোগ তারা পাচ্ছে, সেটা মহাবিশ্বের উদারতার ফল। সংযত হয়ে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই তাদের একমাত্র লক্ষ হওয়া উচিত।

 

দশম অধ্যায়: প্রথম মাটি

প্রথম অবতরণ দল কেপলার-৪৪২বি-র পৃষ্ঠে নামল এক শত চুয়ান্নতম বছরের ৩রা এপ্রিল সকালে — তারা পুরনো ক্যালেন্ডার রেখেছিল, যদিও যে তারার উপর ভিত্তি করে সেই ক্যালেন্ডার তৈরি তা আর মাথার উপরে নেই।

প্রথম দলে বারোজন ছিল। তরুণী মীরা বোস তাদের একজন ছিল। বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ বছর, তাই তরুণী আর বলা যায় না। সে জাহাজে জন্মেছে, এবং পৃথিবী বা তার চাঁদ ছাড়া অন্য কোনো পৃথিবীতে পা রাখা প্রথম মানুষ হতে চলেছে।

ল্যান্ডারটা একটা উপকূলীয় তৃণভূমিতে নামল। যেটাকে তারা তৃণভূমি বলছিল, তার গাছপালা আর্কাইভে কোনো গাছের সাথে মেলেনি। ছোট, ঘন এবং সবুজ ও সোনার মাঝামাঝি একটি রঙের, সামান্য মৃদু এবং উষ্ণ সূর্যের নিচে আলোকসংশ্লেষণ করছে। মাধ্যাকর্ষণ ছিল পৃথিবীর প্রমাণ মাত্রার একানব্বই শতাংশ। ফিল্টারের মাধ্যমে শ্বাস নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেলো, খনিজের গন্ধ আর এমন একটা মিষ্টি গন্ধ রয়েছে যার কোন নাম জানা নেই।

মীরা ল্যান্ডার থেকে শেষে বের হল। ভয় পেয়ে নয়। কারণ সে বুঝেছিল এই মুহূর্তটার মাহাত্ম কী। সে হ্যাচে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকাল। পশ্চিমে আকাশ বেগুনি রঙের দেখালো, যেখানে সূর্য এখনো দিগন্তের নিচে, এবং পূর্বে হালকা অ্যাম্বারের ছোঁওয়া। মেঘ ছিল না। মাটি সোনা-সবুজ গাছে ঢাকা। বাতাস সামান্য ছিল — বাতাস, আসল বাতাস, আসল পৃথিবীতে।

সে মীরা রায়ের কথা ভাবল, যার নামে তার নাম রাখা হয়েছে। সে অর্জুনের কথা ভাবল, তার প্রপিতামহ, যার আট ঘণ্টার কাজ বসুধার ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। সে প্রিয়া, জোনাস, আমারার কথা ভাবল। সে রহিমের কথা ভাবল, যিনি তারাদের মা বলেছিলেন। সে লাগোসের একটি মেয়ের কথা ভাবল যে দুটি চাঁদ এবং অস্তিত্বহীন রঙের গাছের বন দিয়ে একটি পৃথিবীর ছবি এঁকেছিল।

তরুণী মীরা ল্যান্ডারের হ্যাচে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল।

বাতাস অনুভব করল। আসল বাতাস। কোনো যন্ত্রের তৈরি নয়, কোনো নালির মধ্য দিয়ে আসা নয় — একটি পৃথিবীর নিজের বুক থেকে উঠে আসা নিঃশ্বাস। সে ফিল্টারের মধ্য দিয়েও সেটা অনুভব করতে পারছিল — একটা চাপ, একটা জীবন্ত স্পর্শ, যেন পৃথিবীটা নিজেই তাকে বলছে: তুমি এসেছ।

সে চোখ খুলল।

পা বাড়াল।

তার বুট কেপলার-৪৪২বি-র মাটিতে চাপ দিল, এবং মাটি তাকে গ্রহন করলো, যেভাবে ভালো মাটি করে — একটি হালকা সংকোচন, একটি দেওয়া, একটি গ্রহণ।

সে দাঁড়াল। ফিল্টারের মধ্য দিয়ে শ্বাস নিল। দিগন্তের দিকে তাকাল।

তার পেছনে, জাহাজের যোগাযোগ অ্যারের মধ্য দিয়ে, ষাট হাজার মানুষ তাকে দেখছে। বলাই বাহুল্য সময়ের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিলো। সে জানত তাদের জন্য কিছু বলতে হবে। সে কিছু প্রস্তুত করেনি। সে মীরা রায় নয়, যিনি সবসময় শব্দের ভার জানতেন। সে তরুণী মীরা, যে জাহাজে বড় হয়েছে, যে কখনো বৃষ্টির গন্ধ পায়নি, যে তার সারা জীবন এই মুহূর্তের অপেক্ষায় কাটিয়েছে।

সে বলল:

মীরা: "আমরা এখানে পৌঁছেছি। পৃথিবী আমাদের মনে রাখবে।"

সে একটু থামল। তারপর আবার বলল, আস্তে, যেন নিজের কাছে বলছে:

মীরা: "আমরা যে পৃথিবী হারিয়েছি সে মরেনি। সে আমাদের মধ্যে বেচে আছে। আর আমরা তাকে এই নতুন মাটিতে বুনে দেব — আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের বীজে, আমাদের সন্তানদের চোখে। একটি পৃথিবী শেষ হয়, কিন্তু নতুন পৃথিবী হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয় না।"

আরেকটু থামল। দিগন্তের দিকে তাকাল — যেখানে কেপলার-৪৪২ তারাটা উঠছে।

মীরা: "মহাবিশ্ব আমাদের জন্য অপেক্ষা করেনি। কিন্তু আমাদের জায়গা রেখেছিল। হয়তো এটাই যথেষ্ট। হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে নীরব রূপ — জায়গা রেখে দেওয়া, না বলেও।"

তারপর সে চুপ করে গেল।

 

বসুধার  পর্যবেক্ষণ ডেকে, পৃথিবী বোস, ছিয়াশি বছর বয়সী, সেই একই চেয়ারে বসলেন যেখানে ডেভিড প্রথম তারাটি দেখেছিলেন, এবং তার মেয়েকে নতুন পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়াতে দেখলেন। তিনি হাত দিয়ে জানালার কাচ স্পর্শ করলেন — যেন সেই স্পর্শের মধ্য দিয়ে মেয়ের কাঁধে হাত রাখতে পারবেন।

ষাট হাজার মানুষ নীরব ছিল। কারণ কিছু মুহূর্ত কথায় ধরা যায় না। শুধু বুকে ধরা যায়।

 

পরবর্তী মাসগুলোতে বসুধার  সম্প্রদায় দলে দলে নামল, নাতিশীতোষ্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রথম বসতি স্থাপন করল সেই শৃঙ্খলা ও যত্নে যা এক শত চুয়ান্ন বছরের জাহাজ-জীবন তাদের মধ্যে গড়ে দিয়েছিল। তারা এখন এমন মানুষ যারা অপচয় করে না। যারা প্রয়োজনের বেশি নেয় না। যারা হাড়ে হাড়ে বোঝে সম্পদ সীমিত এবং সম্প্রদায়ের পরিচর্যার জন্য তা অপরিহার্য। তাই সম্পদের সংরক্ষণ তাদের মূল মন্ত্র।

তারা নিখুঁত ছিল না। তর্ক করত। ভুল করত। মাঝেমাঝে একই ভুল দুবার করত, কারণ মানুষ তাই করে। কিন্তু তারা আলোকবর্ষ পেরিয়ে বহন করে এনেছিল একটি স্মৃতি — শুধু আর্কাইভ নয়, শুধু সাংস্কৃতিক রেকর্ড নয়, বরং একটি জীবন্ত, অনুভূত স্মৃতি যে একটি পৃথিবী হারাতে কী লাগে। সেই স্মৃতিই ছিল তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

কেপলার-৪৪২বি-র জীবমণ্ডলের নাম দেওয়া হলো ধরিত্রী, যার মানে পৃথিবী। আমারা যে শ্রদ্ধা ও যত্ন দাবি করেছিলেন তা দিয়েই অধ্যয়ন করা হল সেই জীবমণ্ডল। বসতি অঞ্চলে জীবাণু বসতি বিঘ্নিত হল না। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র কোনো নির্মাণ শুরুর আগে ম্যাপ করা হল। একটি গ্রহ তত্ত্বাবধান কোড নতুন সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সংবিধানে লেখা হল প্রথম বছরে।

এটাই ছিল ধরিত্রীর প্রথম আইন:

আমরা এখানে অতিথি, যেমন এই মহাবিশ্বে সর্বত্রই আমরা অতিথি। আমরা পৌঁছেছিলাম অবহেলায় ও যুদ্ধে ধ্বংস করা একটি পৃথিবীর শোক বহন করে। আমরা সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করব না। এই পৃথিবী আমাদের নয়। এটা আমাদের ধার দেওয়া, যেমন সব পৃথিবী সব প্রাণের কাছে ধার দেওয়া, এবং আমরা কৃতজ্ঞতায়, যত্নে, এবং এই জ্ঞানে গ্রহণ করি যে ভবিষ্যৎ বাসিন্দারা — মানব বা অন্যথা — আমাদের বিচার করবে আমরা কত দ্রুত নির্মাণ করেছি তার দ্বারা নয়, বরং আমরা কতটা মনোযোগ দিয়ে প্রকৃতিকে শুনেছি তার দ্বারা।

তরুণী মীরা এটা লিখেছিল। সে ধরিত্রীর প্রথম গ্রহ তত্ত্বাবধান কাউন্সিলের প্রধান হয়েছিল এবং সেই ভূমিকা সে সাতাশ বছর ধরে রেখেছিল। সেই ভূমিকায় সে যে সেরা কাজটি করেছিল সেটা হলো দক্ষিণ গোলার্ধে উপকূলীয় জীবমণ্ডলের একটি সংরক্ষিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা যেখানে কোনো মানব কাঠামো অনুমোদিত নয়, এবং যেখানে কেমোসিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়া নিজের প্রাচীন সময়ে বিকশিত হতে পারে। সেই সংরক্ষিত অঞ্চলের নাম রাখা হয়েছিল আমারা ওসেই-বনসু রিজার্ভ। মীরা প্রতি বছর সেখানে যেত। সে মুগ্ধ চোখে সেই প্রাকৃতিক আশ্চর্যকে দেখতো।

 

উপসংহার

ধরিত্রী — উপনিবেশ পঞ্জিকার দুই শত ত্রিশতম বছর

রায়পুরের বসতির স্কুলটায় পূর্বমুখী একটি জানালা ছিল, আর সেই জানালার মধ্য দিয়ে দেখা যেত উপকূল, আর উপকূলের ওপারে সমুদ্র, আর সমুদ্রের উপরে, পরিষ্কার রাতে, আকাশ। রায়পুরের নাম রাখা হয়েছিল মীরা রায়ের নামে। ধরিত্রীর আকাশ পৃথিবীর আকাশের মতো ছিল না। তারাটা একটু শীতল ছিল, আর বায়ুমণ্ডল আলো ভিন্নভাবে ছড়াত, তাই সূর্যাস্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হত এবং রাত আসত প্রথমে বেগুনি রঙে, তারপর অন্ধকার গভীর হতো। ছোট ছোট দুটো চাঁদ ছিল — কোনোটাই পৃথিবীর চাঁদের মতো বড় নয়, কিন্তু কিছু রাতে একসাথে উপস্থিত হয়ে, অন্ধকারে একে অপরের পথ অতিক্রম করতো।

আমারা নামের একটি মেয়ে — নামটা প্রজন্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিল, যেমন কিছু নাম থেকে যায় — স্কুলের জানালায় বসে দুটো চাঁদ দেখছিল আর ভাবছিল সেই প্রশ্নটার কথা যা তার শিক্ষক সেই সকালে করেছিলেন:

মানুষ হওয়া মানে কী?

তার বয়স দশ বছর। সে ধরিত্রীতে জন্মেছিল। আর্কাইভ ছাড়া পৃথিবী কখনো দেখেনি। সেই আর্কাইভ ছিল বিশাল এবং অনুসন্ধানযোগ্য। প্রতিদিন আয়তনে তা বাড়ছিল, কারণ মানুষ সেখানে তাদের অভিজ্ঞতা যোগ করতে থাকত — শুধু ঐতিহাসিক রেকর্ড নয় বরং ব্যক্তিগত ডায়েরি, ছবি ও গান, দুটো পৃথিবী ও তাদের মধ্যের দীর্ঘ অন্ধকার জুড়ে বেঁচে থাকা জীবনের সঞ্চিত উপাখ্যান।

সে প্রশ্নটার কথা অনেকক্ষণ ভাবল। বাইরে দুটো চাঁদ দৃশ্যমান। সমুদ্র একটা শব্দ করল যা সে জানতো — পৃথিবীর সমুদ্রের মতো নয়। পুরনো রেকর্ডিং পরিষ্কার করে দিয়েছিল সেই বিভ্রান্তি। কিন্তু একই পরিবারের শব্দ, জল তার সমতল খোঁজার শব্দ, এক বিশাল ও ধৈর্যশীল সত্তার তার প্রাচীন কাজ করার শব্দ।

আমারা সব সময় একটা নোটবুক রাখত— আসল নোটবুক, কাগজের, কারণ তার প্রপিতামহীর প্রপিতামহী কাগজের নোটবুক রাখতেন এবং এটা পারিবারিক ঐতিহ্য হয়ে গিয়েছিল। সে নোটবুক খুলল এবং লিখল:

মানুষ হওয়া মানে চলতে শেখা, ছাড়তে শেখা, পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করতে শেখা। মানুষ হওয়া মানে প্রয়োজনে সব ত্যাগ করে চলে যাওয়া এবং ফেলে আসা সব কিছু আগামীর জন্য বহন করা। গন্তব্যে পৌঁছানো এবং যা হারিয়ে গেছে তাকে মনে রাখা। পুরনো বাড়ি হারিয়ে আরেকটা বাড়ি করা। পৃথিবী এবং মানুষকে এতটা ভালোবাসা যে থেমে না যাওয়া। মানুষ হওয়া মানে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা। মানুষ হওয়া মানে চলতে থাকা।

সে আরেকটু ভাবল।

আর সঠিক প্রশ্ন করা, এমনকি যখন কোনো উত্তর নেই। বিশেষত তখন।

বাইরে, ধরিত্রীর মখমল আকাশে দুটো চাঁদ একে অপরের পথ অতিক্রম করল, আর সমুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। গ্রহের অন্য পাশে কোথাও — আমারা ওসেই-বনসু রিজার্ভে — কেমোসিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়া তাদের ধীর, প্রাচীন ছন্দে স্পন্দিত হল। সেই আলোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া তারা করে চলেছিল, মানব জাহাজ আসার একশো কোটি বছর আগে থেকে, এবং পরেও একশো কোটি বছর করতে থাকবে, ধৈর্যশীল, উদাসীন এবং সুন্দর।

মহাবিশ্ব জানত না যে মানুষ দেখছে।

কিন্তু জানলেও কোন আপত্তি ছিল না।

 

মীরা রায়ের নোটবুকের শেষ প্রবিষ্টি থেকে পৃথিবীর কক্ষপথে লেখা, ১৩ই মার্চ, ২১৯২ — যাত্রার আগের রাতে

তারাদের আমাদের দরকার নেই। কিন্তু আমাদের তাদের দরকার। সবসময় ছিল। ভাষা পাওয়ার আগেই আমরা তাদের দিকে তাকাতাম। তারা কী তা বোঝার আগেই তাদের নিয়ে গল্প বানাতাম। আর এখন আমরা তাদের কাছে যাচ্ছি — সাহসী বলে নয়, যদিও হয়তো সেটাও আছে, বরং কারণ আমরা মানুষ, আর মানুষ আলোর দিকে যায়।

এমনকি যখন আলো একশো আলোকবর্ষ দূরে।

এমনকি যখন আমরা বেঁচে থেকে গন্তব্য দেখব না।

এমনকি যখন আমরা শুধু জাহাজটাকে সঠিক দিকে নির্দেশ করতে পারি আর বিশ্বাস রাখতে পারি যে পরের প্রজন্ম চলতে থাকবে।

চলতে থাকো।

এটাই পুরো নির্দেশ। এটাই সব।

চলতে থাকো।

— ডঃ মীরা রায়, আলোকবর্ষের ওপারে ।

 

0 Comments
Leave a reply