এক সে মিছিল

লিখেছেন:অজয় কুমার বিশ্বাস

"তোমার রাঁধুনি-ম্যাডামের বিষয়ে কিছু জানতে পারলে? দেখতে দেখতে তো অনেকগুলো দিন পেরিয়ে গেল। ।"

শিপ্রা নিরুত্তর। বিনন্দ প্রাতঃরাশে, অফিস ট্যুর আছে ওর আজ। দুপুরের খাওয়া বাইরেই। গতকাল থেকে শিপ্রার স্কুলের পঞ্চাশ পেরোনো উপলক্ষে ‘স্বর্ণজয়ন্তী’ উদযাপন এবং সেই হেতু ছুটি শুরু হয়েছে। বিগত, প্রায় এক মাস পরীক্ষা, খাতা দেখা, ট্যাবুলেসান এসব নিয়ে টানা চাপ ছিল। সে সব এখন না থাকাতে চাপ একটু কম। রূটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে বিনন্দ শিপ্রাকে বলল,–"আরে, আমার ওপর রাগ করে লাভ কী?

"রাগ করিনি। তবে, প্রশ্নটাতে বিরক্ত হলাম।"

"ব-কলমে আমার ওপরেই বিরক্ত, বল?"

"তুমি তো জানই প্রায় একমাস রিঙ্কু আসছে না। ও যে আজও আসেনি সেটাও তুমি জান এবং এও জান তুমি, যে, চাইছি না, আমি আর ওকে চা-ই-ছি না!"

"কিন্তু তোমার তো অসুবিধে হচ্ছে! যদিও তোমার পড়ে পাওয়া চৌদ্দআনা একটা ছুটি শুরু হলো, কিন্তু সেটা আর কদ্দিন! তা ছাড়া তুমি যে ওকে চাইছ না তা কি ও আদৌ জ্ঞাত?...এ-সবও বাদ দিচ্ছি, ওকে যদি রাখতে নাই চাও তো নতুন কাউকে কি দেখা যেতে পারে না?"

দুটো প্রশ্নই এড়িয়ে গিয়ে শিপ্রা বলল, "তেমন অসুবিধা হলে ভাবব বা তোমাকে বলব।… কিন্তু তোমার কি খুব অসুবিধে হচ্ছে?"

"অসুবিধে না, অস্বস্তি! একটা পিওওর ডিসকমফোর্ট ফীলিংস আর কী"!

"কেন‌, রান্না তেমন জুতসই হচ্ছে না বলে?" শিপ্রা গম্ভীর হয়েই বলল কথাটা।

"উঁহু, আমি কিন্তু এ-রকম কিছুই মীন করিনি। তুমি ভালো করেই জান তোমার রান্নার যথেষ্ট সমঝদার আমি। … তোমাকে ডিপ্রেসড লাগে, মাঝেমাঝেই আনমনা থাকো, – এ'সবই আমার ডিসকমফোর্ট ফীলিংস-এর কারণ।" 

বিনন্দ রুটিতে মাখন ঘষা শেষ করে মুখে তুলতে দেখতে পেল শিপ্রা গভীর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে।

"কী দেখছ? –ভাবছই বা কী এতো!"

শিপ্রা নিরুত্তর থেকে ঘাড় নেড়ে বোঝাতে চাইল, তেমন কিছু ভাবছে না। বিনন্দ-র রুটি চেবানোর শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই তখন। সেকেন্ড থেকে মিনিট হয়ে কিছু সময় পেরিয়ে গেল সেভাবে। হঠাৎ একটা গভীর শ্বাস নিয়ে শিপ্রা প্রায় স্বগোতোক্তিতে বলে উঠল –"কাজটা কী আমি ঠিক করলাম?"

বিনন্দ যদিও এক সঙ্গে খাওয়া এবং খবরের কাগজে চোখ বোলানো দুটোই সারছিল, তবুও শিপ্রার চাপা স্বর ওর কান এড়াল না। বলল,–" কোন কাজটা গো?"

একটু চুপ থেকে শিপ্রা বলল, –"তোমাকে বলিনি। … ঘটনার মানে রেপড হবার ঠিক তেইশ দিন পরে রিঙ্কু আমাকে দু'দিনে সব মিলিয়ে বার তিনেক ফোন করেছিল, কিন্তু আমি ধরিনি।"

"সে কী! কেন!"

"ইচ্ছে হয়নি। কেমন যেন একটা এ্যন্টি-ফীলিংস তৈরি হয়েছিল ওর মতো একটা রেপড গার্লের জন্য।"

"কিন্ত দ্যাট ওয়াজ এ্যন ইনসিডেন্ট এ্যন্ড অবভিয়াসলি আনওয়ান্টেড ইনসিডেন্ট শিপু। … তুমি আর-জি-কর হাসপাতালের ডাক্তার মানে ঐ অভয়া বা তিলোত্তমার ঘটনাটাকে কী বলবে, যা নিয়ে সারা শহর রাজ্য দেশ দেশের বাইরেও তোলপাড় হচ্ছে! ওই মেয়েটির জন্য তোমার কী ফীলিংস?...দুটো ঘটনাই সিস্টেমের শিকার। পার্থক্য শুধু একজন যথেষ্ট শিক্ষিত আর একজন স্বল্পশিক্ষিত। একজন রেপড এ্যন্ড মার্ডারড অন্যজন আই মীন, আমাদের রিঙ্কু অনলি রেপড এ্যন্ড থিয়োরেটিক্যালি শী ইজ অলসো ডেড নাও। একটু চেষ্টা কর, মেয়েটাকে ভুল বোঝা থেকে বিরত থাক, ওকে দম নিয়ে বাঁচতে দাও প্লিজ!”

"কিন্তু আমি তো পারছি না বিনু! বাড়িতে আমাদের একটা মেয়ে আছে। সে এখন তার এ্যডোলোসেন্স পীরিয়ডে তার প্যারেন্টাল গাইডেন্সে পারফেক্টলি বড় হচ্ছে! এই সময়টা ওর জন্যেই, শুধু ওর জন্যেই আমাদের খুব কেয়ারফুল স্টীয়ারিং দরকার।"

"সেটা কি ঠিক হচ্ছে না মনে হচ্ছে তোমার?"

"ইন ফ্যাক্ট, আমি সেটা বলতে পারব না, বাট আয়্যাম শিউর, এখন যদি রিঙ্কু কাজে জয়েন করে তাহলে একদিন সব‌ ওপেন হয়ে যাবে। ও অস্মির মুখোমুখি হবে, পাড়ার, আমার স্কুলের ওর স্কুলের সব মানুষগুলো উঠতে বসতে নানারকম প্রশ্ন করবে। মোস্ট‌ ডিসগাস্টিং সে-সব! এই একটা ভাবনা বা সংকোচ, যাই বল, আমাকে কিছুতেই ফ্রী হতে দিচ্ছে না।"

"কীসের সংকোচ, কীসের ভাবনা, আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!"

"কেন পারছ না!" শিপ্রা ধৈর্য হারায়। –"আর, পারছ না যখন তখন ছেড়ে দাও, লীভ ইট! আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে দাও।"

"তোমার মেয়ে, সরি, আমাদের মেয়ে, তোমাকে রিঙ্কুর এই লং-এ্যবসেন্স নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি?"

"হ্যাঁ করেছিল, বাট আই টোল্ড হার এ ফেক স্টোরি।"

"সেটা কি ঠিক করেছ ম্যাডাম?"

শিপ্রার উত্তরের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করল না বিনন্দ। কিঞ্চিৎ বিরক্তিতে খবরের কাগজটা ঠেলে দিল শিপ্রার দিকে – "কাগজের এই লেখাটা দেখ। আমি মোটামুটি পড়েছি। আর-জি-করের ডাক্তারের রেপ এ্যন্ড মার্ডারের ঘটনার কনটেক্সটেই এই রিপোর্টিং – অবভিয়াসলি দিস ইজ নীডেড, তোমার আমার দেশের ধর্ষণশিল্পের বিষয়ে একটা ফীচার। সময়ে কুলোলে পোড়ো। … আমি উঠছি।" বেডরুমের দিকে এগোল বিনন্দ। 

খবরের কাগজটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল শিপ্রা। বিনন্দ একটু পরেই বেরিয়ে পড়ল ওর অফিস-ট্যুরের জন্য। চাকরির সূত্রে এমন ট্যুর ওর মাঝেমাঝেই থাকে।

তেমনভাবে গভীর মনোযোগ দিয়ে বিষয়ের গভীরে গিয়ে কাগজ পড়ার অভ্যাস নেই শিপ্রার। অন্তত সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় এবং তাৎসঙ্গিক বিভিন্ন লেখা‌গুলো পড়ার অভ্যাসটা তৈরি হয়নি বোধহয় এই স্কুল-শিক্ষিকার। কিন্তু সেই অভ্যাসহীন চোখজোড়াই কৌতুহলী হয়ে উঠে সরাসরি সেই নির্ধারিত কালোকালো অক্ষরগুলোতে আটকে গেল। যার শিরোনাম,– '৩০ শতাংশ মহিলাই ভারতবর্ষে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার।' লেখাটা চোখ টানল, চমকে দিল ওকে। শিরোনাম ছেড়ে বিষয়ের মধ্যে ঢুকল শিপ্রা। একটা বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় নীচের দিকে তিনটে কলাম নিয়ে পুরো লেখাটা। শিপ্রা পড়তে শুরু করল, তারও আগে মেয়ের ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল একবার, নিশ্চিন্ত হল, অস্মিতার ঘরের দরজা বন্ধ, অর্থাৎ ও ঘুমিয়ে। একটু রাত জেগে পড়াশোনা করে বা করতে হয় মেয়েটিকে। শিপ্রার চোখ কাগজের পাতায় স্থির, ও পড়ছে,– 'গত দু'বছর ধরে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষ সমীক্ষায় যে চিত্রটি উঠে এসেছে তা বেশ ভীতিপ্রদ। সারা দেশে প্রতিদিন’ … কলিং বেলটা বেজে উঠল। পড়া থেকে মনোযোগ সরে গেল শিপ্রার। কাগজটা হাতে নিয়েই ও এগোল দরজার দিকে, দরজা খুলল।

"নোমস্কার কাকীমা।" দু'হাত জোড়া মেয়েটির। শিপ্রা দেখল মেয়েটিকে। মনে হলো রিঙ্কুরই সমবয়সী, তবে একটু লম্বা। চোখে সস্তার কালো রোদ-চশমা, পুরো মুখমন্ডলটা একটা কালো কাপড়ে ঢাকা। শিপ্রা কিছুটা তাচ্ছিল্যেই প্রতি-নমস্কার জানাল।

"কী ব্যাপার, কাকে চাই!" শিপ্রার প্রশ্ন।

"আমি টুকু। আপনার যে রান্না করত রিঙ্কু, ওই আমাকে আসতে ‌বলেছে। ও আমার বন্ধু।"

"কেন! কেন আসতে বলেছে"

"আপনার রান্নার লোক লাগবে, রিঙ্কু বলল।"

"সে ব্যাপারে আমি তো কিছু বলিনি ওকে!"

"ও আপনাকে তিন দিন ফোন করেছিল…”

"হ্যাঁ, আমি ধরিনি, আমার ধরতে ইচ্ছে হয়নি! কিন্তু, ও নিজে এল না কেন?"

"ও আর আসবে কী করে কাকীমা। ও তো নেই।" গলার স্বরটা ভেঙে গেল মেয়েটির।

"নেই মানে! কোথায় গেল?"

"আমি জানি না কাকীমা। ও চলে গেছে। সেদিনের ঘটনার পর থেকে এ'পর্যন্ত তো ও আর কোনওদিন বেরোয়নি ওর বাড়ি থেকে, কারোর সঙ্গে দেখাও করত না। আমি মাত্র দু'বার ওর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছি। চলে যাবার ঠিক কিছুক্ষণ আগে মোবাইলে ফোন করে কিছু কথা বলেছিল রিঙ্কু!”

শিপ্রা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, –"কী - কী বলেছিল? আমার নামে কিছু বলেছে নাকি!"

"না, না, ও কারুর নামেই কিছু বলেনি। ও কোথায় যাচ্ছে কেন যাচ্ছে অনেকবার জানতে চাইলেও আমাকে বলেনি। শুধু বলেছিল, – কোথাও একটা চলে যাবে, ওর খোঁজ না করতে।‍"

"বাবা! এত অভিমান! এ-ত মান- সম্মান বোধ!" 

"কেন কাকীমা, থাকতে নেই বুঝি আমাদের?"

"থাকলে তো সেদিন ঐ পাড়ার নাইট পিকনিকে ও যেত না, আর না গেলে ওই কান্ডটিও ঘটত না।… আমি ওকে পইপই করে বারণ করেছিলাম, ও শোনেনি। ওকে কিন্তু আমি খুব ভালোবাসতাম।"

"জানি কাকীমা, সব জানি। রিঙ্কু আমাকে সব বলেছে। আমি নিজেও তো ছিলাম ঐ পিকনিকে। আপনি জানেন নিশ্চয়ই, আমাদের বস্তির একটা মেয়ে এবার এইচ-এসে ইলেভেনথ হয়েছে। ব্যাপারটা আমাদের কাছে ছিল ভীষণ আনন্দের। সেই আনন্দে আমরা সবাই মিলে পাড়ার কাছেই এলাকার কাউন্সিলর-এর বাগানবাড়িতে পিকনিক করতে …”

"থাক! বাকিটা আমি জানি। সেই কাউন্সিলর-এর সুপুত্তুর আর তার বন্ধুরা মিলেই এই কান্ডটি ঘটিয়েছে। ওর বাগান আর টাকা নেবার দায়ে তোমাদের তো নিমন্ত্রণ করতেই হয়েছিল।"

"হ্যাঁ কাকীমা ঠিক, কিন্তু এরকম শয়তানি করবে কেউ ভাবতে পারেনি। আমাদের বস্তির দুটো ছেলেও জড়িত এই ঘটনায়, ওরা বেইমানি করেছে। এখন ওদের পাটি থেকে আমাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। আর সেই ছেলেটা তো এখনও ফেরার।"

"এসব আঁচ করেই আমি ওকে বারণ করেছিলাম, ও শোনেনি।"

"ওর কী দোষ কাকীমা! ও শুধু সবার সঙ্গে একটু আনন্দ করতেই চেয়েছিল এর বেশি তো কিছু না।"

কথা শেষ হবার সঙ্গে টুকুর গলাটা ধরে এল। পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠছিল, কেউ কোনও কথা বলছিল না। শিপ্রা হঠাৎ লক্ষ্য করল মেয়েটা একদৃষ্টে কিছু একটা দেখছে –"তুমি কী দেখছ বল তো এক মনে!"

"আপনার হাতের কাগজের ঐ লেখাটা।"

"কোন লেখাটা?"

"ঐ যে, ধর্ষণ নিয়ে লেখা,– তিরিশ শতাংশ মহিলাই ভারতে শারীরিক বা যৌন-নির্যাতনের শিকার, ... তারপরে … তারপরে … নাহ্, আর পড়তে পারছি না।"

"থাক, আর পড়তে পারতে হবে না।” …“তা, তুমি লেখাপড়া জান মনে হচ্ছে!"

"হ্যাঁ, সামান্য। কমার্সে এইচ-এস পাশ। তারপর আর পড়া হয়নি। রিঙ্কু তো …”

"নাইন পাস এক ধর্ষিতা"। শিপ্রা ভারী গলায় বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাটা বলল। 

"হ্যাঁ, তাইতো! আর এখন ঐ তিরিশ শতাংশেরই একজন।…যাক্ কাকীমা, আপনি তো কিছু বললেন না …আমি তাহলে আসি। মিছিলে যেতে হবে, হাসপাতালের সেই ডাক্তার দিদি-র জন্য মিছিল। খুন হয়ে যাওয়ার পরে একটা বছর কেমন চুপচাপ পার হয়ে গেল, বিচার-টিচার কিছুই হলো না।” দীর্ঘশ্বাসে কথা শেষ করে মেয়েটা।

শিপ্রা বিস্মিত হয়ে টুকুর সিঁড়ি ভাঙা দেখছিল। ওর কথাগুলো আদৌ শিপ্রার কানে যায়নি। হঠাৎ শিপ্রার সম্বিত ফেরে, –"আরে, দাঁড়াও দাঁড়াও, কথায় কথায় তোমার মুখটাই তো দেখা হলো না"।

"কাজে লাগালেই তো দেখতে পাবেন কাকীমা।”

"কিন্তু মুখটা তোমার কাপড়ে আটকানো কেন সেটা না জানলে বা মুখটা না দেখলে কাজে লাগাবই বা কী করে, কোন ভরসায়?"

"ও আপনার দেখতে বা শুনতে কোনওটাই ভালো লাগবে না কাকীমা।”

"সে আমি বুঝব। তুমি তোমার মুখটা দেখাও। আমার দরকার আছে।" 

"চাপ নেবেন না কাকীমা। আপনার জন্য রিঙ্কুই আমাকে বলেছে। চলে যাবার আগে আমাকে বলেছিল, আপনার স্নেহ ভালোবাসার ঋন ও শোধ দিতে চায়। আর… কাজটা পেলে আমারও একটু সুবিধে হয় আর কী। বাড়িতে খুব টানাটানি কাকীমা। …আমি কি আমার ফোন নাম্বারটা দেব আপনাকে?"

শিপ্রার হঠাৎ মনে হচ্ছে ও যেন টলছে, ওর মেরুদন্ড বেঁকে যাচ্ছে, ও পড়ে যেতে পারে। কিন্তু পড়ল না। বুঝতে পারল না কেন এমন হলো। পিছন থেকে অস্মিতা ওর মাকে দু'হাতে ধরে নিয়েছিল ঠিক সময়ে।

"এ কী! তুমি কখন এলে এখানে!" শিপ্রা যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে বলে।

"সময় দেখিনি।"

"এভাবে কতক্ষণ ধরে সব কথা শুনেছ পিছনে দাঁড়িয়ে!" শিপ্রার বিরক্তি কমে না।

"আমি টাইম কাউন্ট করিনি মম।"

"এটা ভালো অভ্যাস নয়, এভাবে লুকিয়ে কথা শোনা।"

"মম, কাম অন, আমার লুকিয়ে শোনার কিছু নেই! আমিও তো বড় হচ্ছি, না কি?–রেপ মোলেস্টেশান সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট সব, এই স-ব আনপ্লীজান্ট টার্ম আমি জেনে গেছি মম। আমার সব বন্ধুরাও জানে। এক বছর আগে আর-জি-করের দিদিটার এমন ক্রুসিয়াল রেপ এ্যন্ড সাইমালটেনিয়াস মার্ডার অনেকের মতো হয়তো আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। অবশ্য এ রেপ ইজ অলওয়েজ ইন এ ক্রুসিয়াল ফর্ম, নো আদার ওয়ে এনি মোর। এসব নিয়ে আমাদের সীরিয়াসলি আলোচনা হয় মম, যা হয়তো তোমার ধারণার বাইরে। মম, আমিও তো যে কোনো দিন রেপড হয়ে যেতে পারি! সোসাইটির এই ডার্কেন্ড লুকটা কি আমাদের দেখার, জানার কথা নয়? কেন তুমি আমাকে এভাবে ওভারপ্রোটেক্ট করতে চাইছ আর কেনই বা এই দিদিটাকে তুমি কম্পেইলড করছ ওকে ওর মুখ দেখাতে?... ঠিক আছে, ওয়েট। আমি দিদিটাকে বলছি।" অস্মিতা ওর মাকে ছেড়ে সিঁড়ির চাতালে দাঁড়িয়ে বলে,– "টুকুদিদি, কোনও অসুবিধা না থাকলে তোমার সানগ্লাস আর মুখের কাপড়টা একটু খুলবে?... বোঝোই তো, … মা"–

টুকু শেষ-সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে বলল, –"বেশ খুলছি। না খুললেই ভালো হোতো। তোমরা বলছ বলেই খুলছি। আমার কোনও অসুবিধে নেই।"‌ কথা বলত একটানে মুখের কাপড়টা খুলে ফেলল টুকু, সেই সঙ্গে রোদচশমাটাও। 

"ওহ্! হরিবল্! এ'অবস্থা কী করে হলো! কে করল! আমি তাকাতে পারছি না, ইউ কভার‌ ইওর ফেস এ্যন্ড আইজ প্লীজ, প্লী-ই-জ!" শিপ্রার দুচোখ বন্ধ। একটা হাত প্রসারিত সামনে সিঁড়ির দিকে। বিস্মিত কিন্ত তার থেকেও বেশি ভীত এক বালিকার মতো অস্মিতা টুকুর মুখের দিকে তাকিয়ে। এক-পল‌ দু'পল করে সময় পেরোচ্ছে নীরবে। আরও গভীর নীরবতায় অস্মিতা দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শোনায়,–'দা ডার্কেন্ড পিকচার অব আওয়ার সিভিল সোসাইটি!' শিপ্রা পাথরের মতো ভাবলেশহীন স্থির বসে, কোনও কথা ওর বোধহয় কান হয়ে মস্তিষ্কে যাচ্ছে না।  

"সরি কাকীমা, আপনাকে সমস্যায় ফেললাম …আসলে আমিও তো ঐ তিরিশ শতাংশ ধর্ষিতাদেরই একজন। আর হ্যাঁ, শুধু রেপ করেই আমাকে ছেড়ে দেয়নি ওরা, এ্যসিড-বাল্ব ছুঁড়ে আমার ডান চোখ আর সে দিকের গালটা পুড়িয়ে এমন ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। হয়তো আমাকে ওরা মেরে ফেলে আমার লাশটা অন্য জায়গায় ফেলে দিয়ে আসত আর পাঁচটা রেপের মতো ঐ ডাক্তার দিদিটার মতো। কিন্তু পারেনি। আমি বুদ্ধি করে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলাম সেদিন!”

টুকুর সব কথা কানে যাচ্ছে না শিপ্রার, ও সিঁড়িতে বসে পড়েছে। মেয়েও মায়ের পাশে বসে,–"মম, তুমি ঠিক আছ, আর ইউ ওকেএ? ... কথা বল মম, টেল সামথিং, প্লিজ!"

"আমি ঠিক আছি। ওকে ওপরে উঠে আসতে বল।" টেনে টেনে কথাগুলো শিপ্রা বলল।

"টুকুদিদি", অস্মিতা ডাকল। থেমে থেমে দু'বার –কিন্ত টুকু বেরিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। নাম ধরে ডাকতে ডাকতে দুদ্দার করে সিঁড়ি ভেঙে রাস্তায় নেমে এল অস্মিতা, ওর গলার‌‌ সব শক্তি দিয়ে টুকুকে ডাকল। সে ডাকটা হারিয়ে গেল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস, অল ওয়ান্ট জাস্টিস” – এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে। অস্মিতা দেখল বিভিন্ন বয়সের অজস্র নারী-পুরুষের একটা সুশৃঙ্খল দীর্ঘ মিছিল রাস্তা হাঁটছে। টুকুদিদি দৃঢ় এবং দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেই মিছিলটার দিকে। অস্মিতা ভেবে উঠতে পারছে না কী করবে। এক দুই তিন করে কয়েকটা সেকেন্ড পেরিয়ে গেল…

“দাঁড়াও টুকুদিদি দাঁড়াও আমিও যাব তোমার সঙ্গে মিছিলে।” অস্মিতা ছোটা শুরু করল, এভাবে ও কোনওদিন দৌড়োয়নি ওর এই নিদারুণ সুরক্ষিত জীবনে একদম যার কোনও দরকার হয়নি। ছুটতে ছুটতে নিজেকে শোনাবার মতো স্বগতোক্তি ‌করল,– ‘আমিও তো, আমিও তো রিঙ্কু দিদির মতন টুকুদিদির মতন ঐ ডাক্তারদিদিটার মতন কোনও দিন রেপড হয়ে যেতে পারি।’ ভাবতে ভাবতে অস্মিতা ছুটছে হাঁটছে। মাঝপথে হঠাৎ এক জোড়া হাত অস্মিতাকে জড়িয়ে ধরল। –“আরে, তুমি এই মিছিলে অস্মি, কাকীমা জানেন? কেমন আছেন উনি, কেমন আছ তুমি?…এতো হাঁপাচ্চো কেন…”

“রিঙ্কুদিদি, তুমি! … তুমি কেমন আছ বল তো, কোথায় চলে গেছিলে তুমি! ... কিচ্ছু ভেব না, মা সব জেনে যাবে একসময়!” আবেগ আর উত্তেজনায় অস্মিতা-র মুখের চেহারা গলার স্বর সব পাল্টে যাচ্ছে। অন্য এক অস্মিতাকে যেন দেখছে রিঙ্কু। খুব আবেগভরা মুখ নিয়ে অস্মিতা বলে উঠল –“রিঙ্কুদিদি তোমার জেনে ভালো লাগবে যে, সামনে তোমার বন্ধু টুকুদিদিও আছে! এ-মিছিল তো ওই ডাক্তারদিদির জন্য তোমার জন্য টুকুদিদির জন্য অন দ্য হোল আমাদের সবার জন্য! তবে আর কীসের ভাবনা!’’ এ’সব বলেই রিঙ্কুকে একটানে মিছিলে জুড়ে নিল অস্মিতা। সেই সঙ্গে যেন ওর শরীরের অনেক গভীর থেকে বেরিয়ে এল, –“জাস্টিস! জাস্টিস! উই ওয়ান্ট জাস্টিস!” মুঠো করা হাত সেই সঙ্গে উপরে উঠল এবং নামল অন্যদের সঙ্গে নিদারুণ এক ছন্দে। গনগনে রোদের সেই সকালে এ-পাড়া ও-পাড়ার নানা বয়সের অজস্র মহিলা পুরুষের পা-মেলানো মিছিলটা অদ্ভুত এক দৃপ্ততায় এবং প্রতিজ্ঞায় রিঙ্কু টুকু অস্মিতা এবং আরও অনেককে নিয়ে এগোচ্ছে। এগোচ্ছে অশুভ ক্ষমতার হাতে ধর্ষিত হয়ে খুন হয়ে যাওয়া এক তরুণী ডাক্তারের বিচারের দাবি নিয়ে। অস্মিতা-র মনে হচ্ছিল গোটা মিছিলটা যেন ক্রমাগত অনেকদিন ধরে অনেক কিছুতেই ‘জাস্টিস’ না পেয়ে পেয়ে আগুনমুখো হয়ে উঠেছে! নিজের চেনা এলাকাটাই সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে উঠছিল ওর কাছে।

… ধনুক থেকে ছিটকে বেরোনো তীরের মতো এক মহিলা সিঁড়ি ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছেন ততক্ষণে। একটা নিদারুণ প্রাণবন্ত মিছিল তার সামনে যা তিনি দেখেননি এ-তাবৎ। তিনি ঠিক করতে পারছেন না কী করবেন। সমান্তরালে হেঁটে তিনি কি তার একরত্তি অসম্ভব আদরের মেয়েটিকে অজস্র মানুষের সেই মিছিলে খুঁজবেন, নাকি … আবার তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবেন? কিছু কি ভাবছেন? মিছিলটা কিন্তু তার আপন গতিতে ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে। … হঠাৎ তিনি শুনলেন,– “মম চলে এস, এই যে এখানে, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি, আমি হাত নাড়ছি প্লীজ সী মী, চলে এস মম, নো মোর হেসিটেসান প্লিজ!” না কোনও ভুল নেই, অস্মিতার গলা। সেই সঙ্গে আরও একটি গলা,– “কাকীমা চলে আসুন তাড়াতাড়ি!” না একদম কোনও ভুল হচ্ছে না শিপ্রার। তিনি ঠিক দেখতে পেয়েছেন তার আত্মজাকে সঙ্গে সেই অভিমানী মেয়ে রিঙ্কুকেও! বিশ্বাস অবিশ্বাসের এক ভয়ংকর টানাপোড়েন শিপ্রাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে চুরমার করে দিতে লাগল! 

… মিছিলে সবার সঙ্গে সবার মতো করে অনেকটা হাঁটা হয়ে গেল শিপ্রার। একটা অবিশ্বাস তবু ওকে নিস্তার দিচ্ছিল না। একটা মোড়ে এসে মিছিলটা থামল। হঠাৎ অস্মিতা দু-হাতে শিপ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলল,– “মম, তোমার কোনও কষ্ট হচ্ছে না তো?” রিঙ্কুও বলল,– “কাকীমা ঠিক আছেন তো?” শিপ্রার নিরুত্তর মুখে একটা সুন্দর স্মিত হাসি। অস্মিতার মনে হলো, মায়ের এই হাসিটা ওর একদম অচেনা, আর রিঙ্কুর তো আরও বেশি। শুধু শিপ্রা জানে ওর এই হাসিটা, হারতে হারতে জিতে যাওয়ার হাসি, নিজের ভিতরের অন্ধকারকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে ফেলে অনেক আলোকবর্ষ দূরে ছুঁড়ে ফেলার হাসি। শিপ্রা মুখটা আদুরে করে রিঙ্কুর দু-দিকের গাল টিপে দিয়ে বলল, – “কাল থেকে কাজে আসবি আবার। … কী রে বোকা মেয়ে, আসবি তো?” শিপ্রা রিঙ্কু-র দু’গাল টিপে আদর করতে গিয়ে টের পেল রিঙ্কু-র গাল দুটাে জলে ভিজে রয়েছে। … সেই অবসরে পাশ থেকে পলকহীন চোখে অস্মিতা একভাবে নিজের গর্ভধারিণীকে দু’চোখ ভরে দেখে যাচ্ছে। 

0 Comments
Leave a reply