একটি প্রেমের গল্পের খোঁজে

লিখেছেন:আলোক মণ্ডল

( চূর্ণ গল্পের চূর্ণিত রেখারূপ)

 

একটি প্রেমের গল্প খুঁজতে বেরিয়ে ছিলাম ধানক্ষেতের আলপথ পেরিয়ে বহুদূরে,মেঘপিওন যতদুর নিয়ে যায় ঠিক ততটাই দূরে।একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দুর মতো দেখতে পেলাম,কুয়াশাকুয়াশা আবছায়ায়, দূরে,

ঐদূরে--

একটি সোঁতা নদী তার উপরে ভেজাকাঠের সাঁকো।সেটা পেরিয়ে কাঁকর বিছানো পথ।পথটা শেষ হতেই  একটা খড়েরচালা মাটির ঘর, তার দেওয়ালে আঁকা লতাপাতায় ঘেরা একটি রঙিন চিত্রপট- মৎস্যকন্যার, অর্ধেক টা মাছ,বাকিটা নারীমুখ। ঘরটার  ভেতর থেকে দরজা বন্ধ, তার ভেতরে দু'টি মানুষ। গাছের মতো ডালপালা ছড়িয়ে। গাছের সংসারে নারী পুরুষ হয় না, এক্ষেত্রে একজন নারী, অন্যজন পুরুষ। অনাদিকালের আদিম উৎস থেকে ভেসে আসা, যুগল প্রেম।

মেঘ সরিয়ে, জল সরিয়ে, কাদামাটি ঘেটে কাছাকাছি গিয়ে  জানালায় চোখ পাততেই দেখি, পুরুষটি হাঁটু গেড়ে একটি জোনাকি তুলে দিচ্ছে নারীটির বক্ষবিভাজিকায়। জোনাকপোকা জ্বলছে আর নিভছে।তার আলোআঁধারিতে অস্পষ্ট ছায়াছায়া শরীর। জোনাকির ছোঁয়া পেয়ে-ধীরে, অতি ধীরে, খুব সন্তর্পনে মেয়েটির চোখ থেকে বেরিয়ে এলো নির্লোম শাদা একেবারে মৃণালের মতো সরু দু'টি হাত।সেই হাতে নোখ নেই, নেলপালিশ নেই, নেই নোখের ভেতর লেগে থাকা চামড়া,নেই হাতের ভেতর হাত এসে মারার অভিজ্ঞতা। তাতেই নাকি মুক্তির আলো দেখতে পান কেউ-কেউ, কোন ত্রিকালদর্শী বিরলতম মেধাবী মায়া, দেখেছিল।সেই হাত কখনও ফুল হয়, কখনো মেঘ, কখনো আগুনঝরা ড্রাগনের মুখ। মেধাবী মেঘের থেকে কালি নিয়ে হাত লিখে চলেছে তো লিখেই চলেছে, কী কথা,

কার কথা, কেউ জানে না।

বৃষ্টি শোনাল, টাপুর দেখাল, সান-বাঁধানো ঘাট পেরিয়ে- চিকচিক রোদের আলোর কান্না দেখাল সেই দৃশ্যটি -- এক হাতের গুঁড়ো আর এক হাতের মুঠোয় তখনও। অন্য হাতের গুঁড়ো অন্য হাতে। কখনো মুঠি খুলছে, কখনো বন্ধ করছে।পালক- হাওয়ায় ঝরে পড়ছে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে। ঘরময় সোঁদা মাটির গন্ধ।কিন্তু দু' জনেরই মুখ ঢাকা,কলাপাতার মতো সবুজ আস্তরণে। ঝিঁঝি পোকা খোঁজ নিল, পেল না।কুয়োতলায় পড়ে থাকা বালতির একাকীত্ব খোঁজ করল, পেল না। দড়ি থেকে উঠে আসা গভীরতলের জল দেখতে পেল না,দেখতে পেল না মুখ। মুখ- যা মূলত আত্মপ্রকাশ । না, মুখ নেই, কথা নেই, নীরবতায় ভেসে যাচ্ছে কথাস্বরলিপি।

এরপর যা হোল বৃষ্টি জানে, জানে শালুক পাতায় পড়ে থাকা ঝিম আওয়াজ।  ঘরের ভেতরে তখন সমুদ্র ঢুকে পড়েছে,ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে। একটি-একটি বাতাকাঠ খসে পড়ছে মদুনি থেকে,উড়ে যাচ্ছে খড় - ছিঁড়ে যাচ্ছে বিচালি দিয়ে বাঁধা ননী রাখার শিকে,বাক্স- তোরঙ্গ, পুঁথিপত্তর। চলে গেল জানালার অর্গল,মেঝেতে পড়ে থাকা জলছবি, ডিম মুখে অগণিত পিঁপড়ের দল। গুরুগুরু মেঘভেঙে ঝরে পড়ছে জল, কখনও ঝিরি, কখনও বিজুরি রেখা সহ বাদর ধারা,ই ভরা ভাদরে।এক তুমুল আন্দোলন, মাটির কুঁড়েঘরটি কাঁপছে, কাঁপছে, মুহূর্মুহু।

কোন কিছুই দীর্ঘস্থায়ী হয় না জগতে।দীর্ঘ হয় না প্রলয়। দীর্ঘ হয়না সৃষ্টি। একসময় খুলে রাখা নূপুর বেজে উঠল, নূপুরের ভেতর যে শূন্যতা, যে অন্ধকার তাকে দূরে সরিয়ে আলো জ্বলে উঠল গোপন গুহায়। তাকে দেখার লম্বা কিউ,মেট্রো স্টেশন থেকে সদ্য ভেঙে ফেলা বিশ্ববাংলার লোগো পর্যন্ত। কান্না, না ঔদাসীন্য? না,প্রতিহিংসা- মাটির কুঁড়ে ঘর জানে না। এসব নিয়ে ভাবেও না। গুহার ভেতরে তখনও অয়স্কান্ত মণি,জ্বলজ্বল করছে। স্পর্শ পেল ঝড়,স্পর্শ পেল জল, স্পর্শ পেল ভীমপলশ্রী রাগ। ঝিনুকের ভেতরে মুক্তার মতো তাকে পেতেই তো এ যাবৎ  যাবতীয় কর্মসূচি।লিপির পর লিপি লেখা চকখড়ি দিয়ে। শিশিরে মেঘের গা থেকে লিপি মুছে গেলেও থেকে যায়, প্রজন্মান্তরে। হয়তো তো তাই কোন ব্যাকরণ নেই,স্বতঃস্ফূর্ত গুহায় প্রবেশ-পথের।

নদীতে মাঝিদের ভাঁটিয়ালি,মাঠে চাষীদের সারিগান। পাহাড়তলির ওপারে চিমনির ধোঁয়া। ধুলো উড়িয়ে নেমে আসছে ট্রাকটার, ট্রাকটারের চাকায় আঁকা, একটা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কান্না। গুম হয়ে বসে আছে হেরে যাওয়ার ভাষা নিয়ে জমিতন্ত্র। ধ্বসে পড়ছে পাড়, পটভূমি একাকার- দূর থেকে ভেসে আসছে, আর্তস্বর,ড্যাস বিনে ক্যেইসে গোঙাইব দিনরাতিয়া...

প্লুতস্বরের শেষে রণিত ধ্বনিতে চড়ে ভেসে গেল শ্যাওলা,শ্যাওলার ভেতরে ছায়া, আতাপাতার নীচে বসে থাকা ঘুঘুর ক্লান্ত ডানা। ঘসা-চামড়ার বিষণ্ণ বিকেলের মতো একটি ধানকাটা জমির বিমূর্ত বেদনা পিছু নিল,পিছু নিল হৃদপিণ্ডের ভেতরে বাজতে থাকা লুবডুব।

আহা, কালো মেঘে আর তীব্র বাতাসে ছিঁড়ে গেছে মশারি,  সংলাপ ভেসে আসছে, ওলি ওমন করে নয়, আরও ধীর ধীরে ফোট ফুলের মতন ! না, না, উদ্দাম ঝড়- উথালি- পাথালি।ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে বালিশ তোশক, শরীরী পাটাতন ভেসে গেল ঘাট ছেড়ে, নীল আকাশে,মেঘ সরিয়ে সরিয়ে যোজন দূরে। আকাশে  বিস্তৃত নীলিমায় একফালি বাঁকা চাঁদের অপূর্ণ কলা থেকে ঝুলছে তার ছায়া।হলুদ নয়, শাদা রজতের মতো জ্যোৎস্না- দ্বাদশী চরে ভাসছে পাটাতন তার ছায়া নিয়ে।ভাসছে দোদুল।দে দোল দোল, তোল পাল তোল , চল ভাসি সব কিছু ছাইড়া।

তারপর একদিন আশ্বিণের শারদপ্রাতে টুপ করে খসে পড়ল ছায়া,কাশবনের শুভ্র ঘনত্ব থেকে বেরিয়ে এলো বৃত্ত ভেঙে একটা সাইকেল, সবুজ রঙের টোপর,জলটোপ মুকুন্দ মাথায়। গড়িয়ে গড়িয়ে পিচরাস্তার ধারে একটা পাকুড় গাছের তলে এসে দাঁড়াল,অবশেষে। সাইকেলে হেড লাইট আছে, বেল আছে, ক্যারিয়ার আছে,ক্যারিয়ারে বাঁধা ধানবীজ আছে, পুতে দিলেই গাছ হবে,ধান হবে। ধানে দুধ আসবে,পাকবে। পাকা ধান কাটা হবে, ঘরে তোলা হবে একদিন। তবু মুখ কই? মুখ দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে শুধু, ব্যাঙের খসখসে চামড়ার মতো সিট-কাভারে রাখা একটিমাত্র বাঁশি।বাঁশিতে সুর আছে,কবিতার পঙক্তি যাকে ধরতে পারে না।

বন পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে, জমির আলপথে নাচ রেখে, আঁকাবাঁকা পায়েচলা পথে লতার মতো শরীর দুলিয়ে লাল-গামছায় জামবাটি বেঁধে পান্তাভাত আর হলুদ শাড়ী এলো।তার লালপাড়। ওর বোনের নাম নদী, ধানরোয়া কৃষক রমণীরা জানাল, তার মাসে একবার জ্বর হয়, জ্বর সারলে তাকে স্নানে  যেতে হয়, ন-গায়ের তালসারি ঘেরা সায়েরে। জল সইতে ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটেই, কৃষ্ণবর্ণের-কালো হরিণচোখ, দেখা যায় না, অনুভবে পেতে হয় তাকে।

নীল আকাশের তলে একটিমাত্র বিন্দু আঁকাছিল, তাকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্ত রচিত হোল। গোল,পূর্ণিমার চাঁদের মতো, কোথাও কোন বক্রতা নেই,শীর্ণতা নেই। বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার মন...। কিন্তু কে  আঁকল এই বৃত্ত? কোন চিন্তা ছিল তার মনে? মাটির ভেতরে ঘর করে থাকা কেঁচোর অন্ধকার জানে না, বাবুইয়ের বাসায় থাকা নিরাপদ বাঁকানো আস্তানা জানে না,শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তন্ত্রীর কোন বাঁকই জানে না, কে আঁকল এমন সুচারু! আস্ত একটা বৃত্ত! এই নিষ্কলুষ বৃত্তের ভেতরে একটি মাত্র সাইকেল আর একটি জামবাটি।

সাইকেলের স্পোক আটেকে রেখেছে রিম শক্ত করে, জামবাটি তার জাম রঙ ধরে রেখেছে পেতল শরীরে। মজবুত,খউব মজবুত বৃত্ত। ইটের পরে ইট!

ফসফরাস জ্বলা শাকচুন্নির মাথায় আগুন! হুঁস্! হুশ! মুহূর্তে বৃত্তটি সব বৃত্তান্ত ফেলে সবটা ব্যাস ও ব্যাসার্ধ নিয়ে উড়ে গেল, হাউইয়ের মতো। এসে পড়ল গিয়ে গঙ্গাঘাটের কাছে একটা কুড়িতলা ফ্ল্যাটের উপরে, রুফটপে। বহুতলের জানালা ফাঁক করে দেখল আরও কত বৃত্ত,কতকত পরিধি নিয়ে দুর্বৃত্ত।ওয়াটার-ওয়াটার এভরি হোয়ার, বাট নট এ্যা সিঙ্গল ড্রপ অব ড্রিংকিং ওয়াটার।গেট আউট!  গেট... আউট। ডিপ্রেশন নিয়ে তমুল ঝড়বৃষ্টি সম্ভাবনা। নক্ষত্র পড়ে গেল আকাশ থেকে,ফ্লাইওভার জুড়ে পতিত তারাদের মিছিল।

বৃত্ত তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে গরফার রেললাইনের ধারে, এক ঝাঁপ। সেখানে অশ্রুজল টুপটুপ! চটের পর্দা ছিঁড়ে বেরুচ্ছে গলগল করে আব্রু-বে। ভাঙছে, ভাঙছে বুলডোজার। ছড়ানো ছিটানো সংসার।থালা -বাটি-থালা,বাটি-থালা-বাটি। হৈ-চৈ।গরগর রাগ।জ্বলজ্বল আগুন, চোখ থেকে মুখে, মুখ থেকে নাকে, নাক থেকে জিভে- লকলক খরিশ শাপ।

বুলডোজারের দাঁত রুট- ক্যানাল করা।টিকবে না, টিকবে না- টেকেও না। সন্দর্ভে লেখা, পড়ে নিতে হয়। 

জামবাটি গড়িয়ে গেল বৃত্তের কাছে, গামছা পান্তাভাত আকাশ থেকে পড়তে লাগল। বীজতলা সহ ধানজমি উড়ে এলো।লাঙল মই নিড়ানির কলরবে মুখরিত আকাশ।সাইকেল ভালো করে চেন লাগিয়ে প্যাডেল করল বলিষ্ঠ পায়ে, তার দু'পায়ের শিরা দাঁড়িয়ে পড়ল সিধা আমাজন নদীর মতো, মাশুল জেগে উঠল নদীর চড়ার মতো। চলে গেল একেবারে বৃত্তের কাছে। এক ধাক্কায় ভেঙে দিল বৃত্তের পরিধি, পরিধি ভেঙে ঝাঁপিয়ে পড়ল উন্মত্ত জনতার মাঝে।

রেলপার কলোনিতে, স্টেশন চত্বরে, নদীর পাড়ে, চাঁদের গায়ে লেগে থাকা কলঙ্কে, শিকড়ের নীচে ঘুমন্ত অন্ধকারে - জ্বলে উঠল আলো। বেজে উঠল বিসমিল্লাহ খানের সানাই, আহা!  এতো আলো, এতো আকাশ আগে দেখেনি, এই লোকালয়।

 

 

0 Comments
Leave a reply