
লাক্সারি বাসটা কলকাতা থেকে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত শরীরে হেলতে-দুলতে দুদিকের সোনাঝুরি আর ইউক্যালিপ্টাসের সারির মাঝে শুয়ে থাকা লাল মাটির পথ ধরে যখন রিসর্টের বড় গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল তখন শীতের পৌষালী রোদে সমস্ত রিসর্টই রোদ পোহাচ্ছে। প্রতিবারের মতো এবারও পাড়ার ক্লাবের বন্ধুদের সাথে বাৎসরিক পিকনিক। গন্তব্য বীরভূমের বোলপুরে শান্তিনিকেতন। বাস থামতে না থামতেই হাঁড়িতে মুখবন্ধ এক ঝাঁক তাজা কই হঠাৎ ঢাকা খোলার মতো হৈ হৈ করে নেমে পড়ল।
— আরে! আসুন আসুন। ভাস্বরদা কিছুক্ষণ আগেই ফোনে ধরেছিল। একটু বোধহয় আপনাদের দেরি হয়ে গেল!
লম্বা সফরের ধকল এক মুহূর্তে উবে গেল। কই মাছের দঙ্গল ঘিরে ধরল। অনি চিৎকার করতে লাগল — "আরে ভাস্বরদা, এবারের পিকনিক তো শুরুতেই জমে গেল গো!"
সার্বজনীন ভাস্বরদা মানে ভাস্বর দত্ত হল গিয়ে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। ভাস্বরদার পরিগ্রহ করার ইচ্ছে, সময় বা সাহস- কোনোটাই হয়ে ওঠেনি। সব ব্যাপারে অতি উৎসাহী। ক্লাবই ধ্যান-জ্ঞান। তার উৎসাহ আর তত্ত্বাবধানে প্রতিবারই পিকনিক।
সত্যিই! সবারই কেমন যেন ভাল লাগতে শুরু করল। ঢুকতে গিয়েই সামনে লাউঞ্জে সুন্দর বাহারি মৌসুমি ফুল স্বাগত জানাচ্ছে। তবে ইতিমধ্যেই বাটিকের ছাপা র্যাপারের সাথে পলাশ রঙা টপের সেরা ফুলটি আমাদের স্বাগত জানিয়েছে। সুন্দর মুখ। গায়ের রং বেশ ফর্সা, কিচেনের পিছনে গাছভরা পাকা পাকা সোনালি হলুদ রঙের কামরাঙার মতো। কাঁধের উপরে শ্যাম্পু করা কুঁচবরণ বয়েসকাট চুল দুষ্টুমিভরা চপলা বালিকার মতো অবাধ্য। পায়ে শান্তিনিকেতনি চটির জন্ম সার্থক হয়েছে। হাতে সরু সোনার রুলি। আহা! কে যে কার অলংকার! শ্রেয়সী সাহা। ঝুমা! ঝুমা নামেই সর্বাধিক পরিচিতা। এই রিসর্টের পাঁচজন অংশীদার আছে। কিন্তু এর দেখভাল মায় যাবতীয় দায়িত্ব সামলায় ঝুমা।
--— আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনারা স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিন।
কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলে গেল।
পাপন উসখুস করতে লাগল,
---- এই ভাস্বরদা, আমরা সকলেই তো রাস্তাতে দু-তিনবার চা খেয়েছি। এখনও আবার চা?
অতি যত্নে রাখা সকলের সাত রাজার ধন এক মাণিক ব্যাগের দিকে হাত বাড়াতেই ভাস্বরদার বিশ্বামিত্র মুনির কড়া চোখ তাকে নিরস্ত করল। বিলে কী যেন বলার জন্য বিড়বিড় করে উঠতে গিয়ে ভাস্বরদার চোখাচোখি হতেই ভিজে মুড়ির মতো মিইয়ে গেল।
চা চলে এল। খানিক বাদে এক সহকারীকে কাপগুলো তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে হঠাৎ দাঁড়ে বসা তোতা পাখির মতো ঘাড় ঘোরাল,
-— বলছি আমার কোনও অসুবিধা নেই। আধাঘণ্টার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট বানানো হয়ে যাবে, আপনাদের চেঞ্জ করে তৈরি হতে হতে। কিন্তু সাড়ে দশটা বেজেছে…
ঝুমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সমস্বরে শোনা গেল,
---- আরে না না! আপনি একদম ব্যস্ত হবেন না। আমরা একেবারে লাঞ্চ করব।
একটু কাঁধ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল,
---- এ কী স্যার, আপনি কিছু বললেন না যে! দু-একজনকেও বানিয়ে দেওয়া যাবে।
হালকা কাজল বোলানো বড় বড় চোখ চেয়ে রইল।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে হয়তো কিছুটা আনমনা হয়ে গেছিলাম। চমক ভাঙতে,
-— তা কেন? আমিও তো ওই দলেই।
হেসে তাকাতেই, মাথা নিচু করে বুঝতে পারার ভঙ্গিতে কিচেনের দিকে চলে গেল।
চারপাশটা ঘুরে দেখলাম, নজরে এল প্রায় তিরিশ বিঘা জমির ওপর এই অতিথিশালা। মাঝখানে খুব যত্নে রাখা মাঝারি মাপের পুকুরের চারধারে কোথাও নানা রকম সবজির ক্ষেত। আবার বেশ কিছু জমিতে রকমারি বাহারি মৌসুমি ফুলের সমারোহ। সবজি বা ফুল ছাড়াও বিভিন্ন রকম ফলের গাছ। ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারাতে গাছ ভর্তি। কুলগাছগুলোর নীচে বিছিয়ে থাকা পাকা টোপা কুল গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে টিফিন পিরিয়ডের কথা মনে পড়িয়ে দিল। বুলবুলির দল ডালে বসে পেকে হলদে হয়ে যাওয়া চালতা ঠোকড়াচ্ছে। নিচু ঝাঁকড়া এক কাঁঠাল গাছে মা-কাঠ বিড়ালী আর তার তিন ছানা ওঠানামা করে খেলায় মত্ত। এ ছাড়া নারকেল- সেগুন-শিশু- মেহগনি-বকুল- ইউক্যালিপ্টাস। পুকুরের উত্তর-পূর্ব কোণে একতলা- দোতলা মিলিয়ে যে বিল্ডিং সেটিই মূল গেস্ট হাউস, থাকার ব্যবস্থা। ঢুকেই ড্রয়িং স্পেস। চক্রব্যুহের মতো চারিদিকে ডবল বেডের লিভিং রুমগুলোর মধ্যিখানে ড্রয়িং স্পেস। একে একে সবাই ব্যাগ নিয়ে দুজন পিছু একটি ঘরে সেঁধিয়ে গেলাম। পল্টু আর প্রলয় আগেই স্নান সেরেছে। তাদের চার-পাঁচ জনের উপযোগী গোলাকার ছোট ছোট ডাইনিং টেন্টগুলোর সামনে পায়চারি করতে দেখে ঝুমা বাড়িতে সম্মানীয় অতিথিকে সমাদর করার ভঙ্গিতে বলল,
-— সবাই কখন খাবেন জানিয়ে দিলে আমি দশ মিনিট আগে বেগুন ভাজতে বলব। এখানে এসবই আমাদেরই সবজি ক্ষেতের। তবে গরম না থাকলে কিন্তু বেগুনভাজা ভালো লাগে না।
একটু বাদে সকলেই চেয়ার টেনে গোলাকার টেবিলগুলোর ধারে ধারে বসে পড়লাম। বাসমতী চালের কাঁটা কাঁটা টগর-সাদা ভাত। নানা সবজির জলসায় সোনামুগ ডাল, বহু প্রতীক্ষিত ও বিজ্ঞাপিত গরম গরম বেগুনভাজা এবং অবশ্যই নিয়মিত সন্ধ্যাবেলায় সাঁঝবাতি- শঙ্খধ্বনির মতো বীরভূমের আলুপোস্ত। আরও আছে। মাছের মাথা দিয়ে বাঁধা কপি। রুই মাছের কালিয়া। শেষে একটানা কোনও রাগ সঙ্গীতের পর সুখশ্রাব্য ঝালার ন্যায় ফলের চাটনি। রূপ-গুণ মিলিয়ে একাধারে লক্ষ্মী আর অন্নপূর্ণার মহা যোটক।
আহার্যের স্বাদ যতটা না রন্ধন প্রণালির উপর নির্ভর করে তার চেয়ে বোধহয় অনেক বেশি প্রভাবিত হয় তা কীভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, তার উপর। আজ আবার তার প্রমাণ পেলাম।
ভাতের ট্রেটা নিয়ে দ্বিতীয়বার রিপিট করতে করতে,
------রাঁধুনি আজ কাজে আসেনি। নিরূপায় হয়ে আমাকেই সে দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে। তবে সহকারী দুজন সাহায্য করেছে।
বলার সময় বারেবারেই আমার দিকে চাইছিল।
ভাতের প্লেট থেকে মুখ না তুলে বললাম,
---— যদি কালও না আসে তাহলে খুব ভাল. . .
কথা শেষ করার আগেই উত্তর উড়ে আসে,
—আপনি কিছু চাইলেন কি?
-— একটু ভাত নিতাম।
প্লেটে ভাত পড়ে গেল।
হাত ধুয়ে অধিকাংশরাই শ্রান্ত রোদে পিঠ দিয়ে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে আড্ডায় মেতে গেলাম। এক সময়ে বৈকালিক চায়ের পর্বও চলে এল। কিছুটা দূরে থাকায় প্লেটে কাপ নিয়ে এগিয়ে দিয়ে,
— অন্যেরা বলেছে। স্যার, আপনার রাতে ভাত না রুটি?
---- "স্যার" নয়। এখানে আমরা সবাই এক। আলাদা করে কোনও অস্তিত্ব নেই।
-— তবুও বলতে হয়। মানে এই রিসর্ট চালাতে গেলে. . . . . .
— তার কোনও প্রয়োজন নেই। অন্তত আমাদের কাছে। আমরা প্রতিবার কোনও না কোনও রিসর্টে যাই। কিন্তু
সবার থেকে আপনি আলাদা।
— আপনিও তো. . . . . . . !
— মানে?
চোখ বড় করে সরাসরি তাকাতেই চপলা হরিণীর ত্রস্ত পায়ে সরে গেল।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে পা-টা ধরে গেছে। কিচেনের সামনে বসার জায়গায় গিয়ে বসলাম। সকলে সোনাঝুরির হাটে ঘুরতে যাওয়ার তোড়জোড় করতে লাগল। কিছুটা পরে কিচেন থেকে গুনগুন সুর শোনা গেল,
"আর কতকাল গিরিধারীলাল আড়ালে আড়ালে রবে. . . ."। অবাক হলাম। এমন বৈষ্ণব পদাবলি গানের সুর যেন বয়সের সাথে কিছুটা বেমানান মনে হল। তবে গানের গলা মন্দ নয়।
ভাস্বরদা হেঁকে বলল,
--— কী হে! এখানে পিকনিকে এসে ঝুপ মেরে বসে থাকার জন্য এসেছ না কি? নাও, তৈরি হয়ে নাও।
--— না ভাস্বরদা, তোমরা ঘুরে এস। আমি একটু গড়িয়ে নিয়ে গল্পের বইয়ের পাতা ওল্টাই।
---— ঠিক হ্যায়! যো খুস।
আমি ঘরে চলে গেলাম। বাকিরা হৈ হৈ করতে করতে বেরুচ্ছে। হঠাৎ বয়সে কিছুটা ছোট অনি তড়িৎ গতিতে ঢুকল।
-— কী ' কাকা ' ( এটা বন্ধুদের মধ্যে সম্ভাষণের একটা চল)! তুমি তো যাচ্ছ না! জল রইল।
একটা ব্ল্যাক ডগের বোতল টেবিলের ওপর ঢক করে রেখে উধাও হয়ে গেল।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা গল্প-সংকলন ‘প্রেমের গল্প’-এ ডুব দিলাম।
অনেক আগেই সন্ধ্যা নেমেছে। এখন রাত তার ডানা মেলার আয়োজনে ব্যস্ত। হঠাৎ দূর থেকে গানের কলি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ক্রমশ কাছে আসতে লাগল,
" সবাই চলে গেছে, শুধু একটি মাধবী তুমি এখনও তো ঠিকই ফুটে আছ। বলো কেন চেয়ে চেয়ে কতো আর আমারই চোখের জল দেখে যাবে. . . . . "
সুরেলা কণ্ঠ আচমকাই থেমে গেল।
---— ভিতরে আসতে পারি?
দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি ঝুমা।
সশব্যস্ত হয়ে বলি,
---- ও ইয়েস, অফ কোর্স! মোস্ট ওয়েলকাম।
ঢুকেই উৎসাহ আর বিস্ময় মাখিয়ে প্রশ্ন,
— একি আপনি গেলেন না? সবাই তো সোনাঝুরি হাটে গেল। শরীর খারাপ লাগছে?
বিছানায় আধশোয়া ছিলাম। উঠে বসলাম।
-----না না, শরীর ঠিকই আছে। আসলে ইচ্ছে করছিল না।
হাতের বইয়ের দিকে তাকিয়ে,
--— আপনি গল্পের বই পড়তে ভালোবাসেন বুঝি! আমি বোধহয় এসে বিরক্ত করলাম।
—একেবারেই তা নয়। আপনার সাথে গল্প করলে সেটা গল্পের বই পড়া থেকে কোনও অংশে কম হবে না।
-— যাঃ, কী যে বলেন না আপনি!
প্রশ্রয়ের মৃদু ছোঁয়া যেন।
আমি আরও সহজ হলাম।
--— আরে দাঁড়িয়ে কেন? বসো।
পরক্ষণেই,
—-এইরে! তুমি বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না।
এবারে মাথাটা ঝাঁকিয়ে মোহিনী হাসিতে ভরিয়ে দিল। চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসতে বসতে,
-— কেন মনে করব বলুন তো! আপনি বয়সে বড়, আর তাছাড়া "তুমি’ বলার মধ্যে অনেক অন্তরঙ্গতা ফুটে ওঠে।
আবার হাসিতে ঘরটা ভরে ওঠে।
এক ঝলক তাকায় টেবিলে রাখা ব্ল্যাক ডগের দিকে।
-— একটু ড্রিংকস নিয়ে নিন না।
সামান্য থেমে,
--— আচ্ছা আমিই না হয় বানিয়ে দিচ্ছি।
চোখটা মটকে আমার দিকে তাকিয়েই,
--— ওমর খৈয়ামের সাকী. . . .
মনে হল আমি রুক্ষ মরুভূমির কোনও এক মরূদ্যানে। সূর্য দিগন্তে ঢলে পড়েছে. . . . . . " ঢল গয়া আবতাব অ্যায় সাকী, লা পিলা দে শরাবি. . . . . . .", আমার অতি প্রিয় গজল শিল্পী জগজিৎ সিং-এর গাওয়া বিখ্যাত এক গজলের উর্দু শায়রির পংক্তি মনে পড়ল। জগতে এমন কোন বুরবক আছে কি যে এমন মায়াবী মন্দের হাতছানি উপেক্ষা করে দৈনন্দিন একঘেয়ে ঘষটানো জীবনের নাগপাশ থেকে ক্ষণিকের জন্যও বেরিয়ে একবুক খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেবে না?
একটু চুপ করে থেকে, পরে বললাম,
-----থাক এখন ওসব না হয়! আজ তোমার গল্প বল।
অবাক হওয়া তখনও বাকি ছিল। গ্লাস কাছেই ছিল। জলের বোতলও। কার্টনের প্যাকেট থেকে বোতল বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ইশারায় ছিপিটা খুলে দিতে বলল। দিলাম। গেলাস এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ স্কলারের মতো ঢালতে লাগল,
-— কেন, থাকবে কেন! কারণকে অকারণে কেন বারণ করছেন।
মুখে ঈষৎ মোহময়ী হাসি ছড়িয়ে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে একটু ঝুঁকে গেলাস এগিয়ে দিল। হাতে নেশা, তার চেয়েও বেশি নেশা বুঝি তার চোখে। আজ এখানে ওমর খৈয়াম থাকলে বোধহয় আরও কত কালজয়ী শায়রির জন্ম হতো।
গেলাস নিতে গিয়ে তার হাতের ছোঁয়ার শিহরণে যেন নিস্তব্ধ রাজপুরীতে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে জাগিয়ে দিলাম। গায়ের হালকা পারফিউমের গন্ধের সাথে চোখের সামনে নিষিদ্ধ অঞ্চল আংশিক উন্মোচিত হয়ে গেল।
একটু বাদে চেয়ার ঠেলে উঠে বাইরে চলে গেল।
আমি তো ভারি ভাবনায় পড়ে গেলাম। অসংলগ্ন কিছু কথা কি বেফাঁস বেরিয়ে গেল. . . . . . . . . .
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দেখি ঝুমা ঢুকছে। হাতে ধরা প্লেটে গরম গরম চিকেন পকোড়া।
--— একটু চাট না হলে ওটা নেবেন কী করে, গলায় পরম শুভাকাঙ্ক্ষীর আশ্বাস।
চেয়ারটা আমার খাটের একটু কাছে টেনে নিয়ে বাঁ পায়ের ওপর ডান পা চাপিয়ে আয়েশ করে বসল। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ হাতে ধরা "জাম-এ-ভর-গুনাহ" এর দিকে চেয়ে রইল। আমি নেশাড়ু হিসাবে একেবারে তৃতীয় শ্রেণির নবিশ। ন-মাসে ছ-মাসে বন্ধুদের সাথে হুল্লোরে জমাটি আড্ডার মেজাজ ধরে রাখতে ওই একটু -আধটু গলা ভিজিয়ে নেওয়া আর কী! কিন্তু হাতে ধরা ধাকলেও আজ নেশা জেগেছে দু চোখে।
নীরবতা ভাঙল,
-— কী যেন বলছিলেন না! ও আমার কথা শুনতে চাইছিলেন বুঝি? অতি সাধারণ এক মেয়ের শোনানোর মতো কী বা এমন কথা থাকতে পারে, বলুন!
আমি চোখে চোখ রাখলাম,
-----তুমি কিন্তু মোটেই সাধারণ নও। এত বড় রিসর্ট যে একাই চালাতে পারে সে আর যাই হোক আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের থেকে তাকে আলাদা না ভাবাটা বাতুলতা মাত্র। আমি অবশ্য তোমায় জোরাজুরি করব না।
চুপ হয়ে গেল। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের নখ খুঁটতে লাগল। আস্তে আস্তে শুরু করল,
--— কলেজে পড়ার সময় অমিতের সাথে আলাপ হয়। লম্বা দোহারা চেহারা। এমন কিছু রাজপুত্রের মতো নয়। কিন্তু ওর বড় বড় স্বপ্নালু চোখে কেমন যেন মাদকতা ছিল যার আকর্ষণে আমি না বলতে পারিনি। ব্যাঙ্কের পি. ও. -র পরীক্ষায় ক্র্যাক করে একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কলকাতারই এক ব্রাঞ্চে জয়েন করল। আমাদের ঢাকুরিয়ার বাড়িতে মা, বাবা, দাদা আর আমি। মাঝে মাঝেই বাড়িতে আসত। তবে মা বা বাবা কেউই ওকে তেমন পছন্দ করত না। কিন্তু আমার দু চোখে তখন নেশার ঘোর। এরপর হঠাৎ এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় এল। এক রকম ভিজতে-ভিজতে। মা গিয়েছে শ্যামবাজারে মাসীর বাড়িতে। বাবা অফিসের ট্যুরে ভুবনেশ্বর। বাড়িতে দাদাও নেই। আমি একা। ওকে চা বানিয়ে দিলাম। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আমার দিকে কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। পুরুষের এমন চাহনি কখনও দেখিনি। বাইরে তুমুল শ্রাবণধারা। হঠাৎ কাছাকাছি কোথাও তীব্র শব্দে বাজ পড়ল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে অমিতকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরলাম। সরিয়ে দিল না। আমাকে নিবিড় করে নিল। আমিও আর বাধা দিতে পারলাম না। হারিয়ে গেলাম। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টির আওয়াজে সব বুঝি একাকার হয়ে গেল। এরপর থেকে একটু একটু ভয় পেতে শুরু করলাম। অমিতকে রাজী করালাম। মা-বাবা নিমরাজি থাকলেও ভালো চাকরির জন্য দাঁড়িপাল্লাটা সম্মতির দিকেই ঝুঁকে পড়ল। পরের অঘ্রাণেই সাতপাক ঘুরে শুভদৃষ্টি হয়ে গেল। নতুন সংসারে নানা স্বপ্নেরা জাল বুনতে লাগল। খুশি-খুনসুটি আর মান-অভিমানের আলোছায়ায় বছর খানেক কেটে গেল। এরপর থেকে কেমন করে যেন ধীরে ধীরে অমিতের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করতে লাগলাম। ভবানীপুরে ওর এক বন্ধু প্রীতমের ফ্ল্যাট। আমার বিয়ের মাসখানেকের মধ্যেই প্রীতমেরও হয়ে যায়। তখনই একদিন অমিত বলেছিল প্রীতমের হবু স্ত্রী রিয়া ওর পূর্ব পরিচিতা। আমি তেমন গায়ে মাখিনি। বিয়ের পরও অমিত মাঝেমধ্যে ভবানীপুরের ফ্ল্যাটে যাতায়াত করত। সেটাও কিছু দোষের ভাবিনি। আমি নিজেও অমিতের সাথে এক-আধবার ভবানীপুর গেছি। এইভাবে চলছিল। এবার নতুন একটা বিষয় নজরে আসতে লাগল। কিছুদিন অন্তর অন্তর অফিসের কাজে অমিত কলকাতার বাইরে একদিনের ট্যুর করতে লাগল। এতেও সন্দেহের কারণ দেখিনি। তখন সেল ফোনের ব্যাপক প্রচলন ছিল না। ট্যুরে গেলে কোনো খবর নিতে পারতাম না। একদিনের বলে প্রয়োজনও হত না।
এই পর্যন্ত বলে ঝুমা থেমে গেল। মাথাটা নামিয়ে চেয়ারে ঝোলানো চটি সহ ডান পা-টাকে মেঝেতে ঘষতে লাগল।
গেলাস তেমনই ধরা আছে। কয়েকটা মোটে সিপ্ নিয়েছি মাত্র।
কিছুক্ষণ থামল। দেওয়ালে রাখা ঘড়িতে টিক্ টিক্ আওয়াজে নিস্তব্ধতা ভাঙছে।
আবার মুখ তুলল,
---— দিনটা ছিল আগস্ট মাসের এক শনিবার। তার আগের দিন শুক্রবারে বলে গেছে জামশেদপুরে যেতে হবে। শনিবার বিকালে ফিরবে। দুপুর দুটো নাগাদ ওর ব্রাঞ্চ থেকে একজন বাসায় এল জরুরি একটা ফাইলের খোঁজে। জামশেদপুরের কথা শোনাতে সে আকাশ থেকে পড়ল। আমি কথা বাড়ালাম না। লোকটি ফিরে গেল। আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। কী ভেবে সোজা ভবানীপুরে গিয়ে প্রীতমের ফ্ল্যাটে ডোরবেল বাজালাম। দরজা খুলে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। সামনে অমিত দাঁড়িয়ে। পিছনে পিছনে রিয়াও। আমি ঘরে না ঢুকে রিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, " প্রীতমদা কোথায়? " উত্তরে জানাল, সে কলকাতার বাইরে। আমাকে খাতির করে ভিতরে নিয়ে যেতে চাইল। এক কোণে অমিত স্থাণু হয়ে দুঃস্বপ্নের ঘোরে। আমি কালক্ষেপ না করে তখনই ফিরে এলাম। পরে খবর নিয়ে জানতে পারলাম প্রীতম যখনই কলকাতার বাইরে কাজ নিয়ে যেত, সে সময়ে অমিতের অফিসের ট্যুর থাকত। এই ঘটনার ছ-মাসের মধ্যেই আমি ডিভোর্স দিয়ে দিই।
চোখের কোণটা দেখলাম চিকচিক করছে। ঠোঁট কামড়ে, উপরের না-চলা পাখার দিকে চেয়ে রইল।
আবার শুরু করল,
-— এই রিসর্টের এক অংশীদার বাবার বাল্যবন্ধু। তাঁরই বদান্যতায় আমি এখন আপনাদের সেবায়। প্রথমে বাবা, পরে মাও গত হয়েছেন। বউদি আর টুকানকে রেখে দাদা অকালে চলে যাওয়ার পর ওই টুকানের দায়িত্বটুকু পালন করার চেষ্টা করছি।
একটা লম্বা শ্বাস নিল। দু হাতের তালু মুখের কাছে এনে সামান্য ঘষে নিল। দূরে কোথাও মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
কথা শেষ করে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকাল,
--- এ কী! আপনি তো একটা নিয়েও শেষ করতে পারলেন না।
আমি স্বগতোক্তির সুরে নিচু গলায় বললাম,
— অন্য নেশায় যে মাতাল হয়েছে, হাতে ধরা ওই সামান্য রঙিন নেশায় তার কী-ই বা হবে!
ঝুমা আনমনা ছিল। এখন শুধাল,
— কিছু কি বললেন?
-— না না, বলছি আমি তেমন প্রথিতযশা নেশাড়ু নই। ওই কখনো-সখনো বন্ধুবান্ধবদের. . . . . . . .
-— আপনি না বেশ সুন্দর কথা বলেন কিন্তু!
একটু যেন হাসার চেষ্টা করল নিজেকে আড়াল করতে।
বাসের হর্ণের আওয়াজে সম্বিত ফিরল। ওরা ফিরে আসছে।
-— দেখুনতো বকবক করে আপনার কতখানি সময় নষ্ট করে দিলাম।
আমি অস্ফুটে কিছু বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তা শেষ হওয়ার আগেই ঝুমা উঠে চলে গেল।
অনি, বিলে, পাপনরা বন্যার জলের মতো ঢুকে পড়ল। পাপন চেঞ্জ না করেই ব্যাগ টেনে নিয়ে এসে বসল। কয়েকটা গ্লাসে পেগ বানিয়ে নিয়ে হাঁক পাড়ল,
-----এই যে, যে যারটা তুলে নাও।
অনি আমার দিকে ফিরে চোখ মটকে,
-— কী ' কাকা’! সব ঠিকঠাক আছে তো? আমরা কেউ ছিলাম না কিন্তু!
বিছানার পাশের ছোট টেবিলে রাখা বোতলটা উঁচু করে মেপে দেখে নিল,
— তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না। এতক্ষণে এইটুকু?
এরপর তাসের আসর বসে গেল--ফিস। তবে নিরামিষ নয়- অবশ্যই নগদ নারায়ণের বিনিময়ে। এক সময়ে রাতের খাওয়াও মিটে গেল। তবে কারণসুধার পরে রুটিটাই শ্রেয়। সঙ্গে স্যালাড আর চিকেন কষা। চাটনিতে সমাপ্তি। দুই সহকারী সব পরিবেশন করল। ঝুমা একবার এসে সবাই ঠিকমতো খেয়েছে কি না, তা জেনে ঘুরে গেল। তবে সকালের উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে কিছুটা চুপচাপ।
অনি আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল,
---'' গুরু, আকাশে যেন মেঘ দেখছি। তুমি কি বৃষ্টি নামিয়েছ নাকি? , বলেই সবাইকে লক্ষ্য করে হো হো করে হেসে উঠল।
সাড়ে বারোটা নাগাদ সবাই বিছানা নিলাম।
আমার ঘুম দেরিতে ভাঙে। চায়ের জন্য গেস্ট হাউস ছেড়ে কিচেনে যাওয়ার পথে দেখি ঝুমা চা হাতে আসছে।
স্নান হয়ে গেছে। আজ পরনে দুধসাদা পালাজো। ওপরে আকাশ নীল কুর্তি। কপালে ছোট্ট একটা ময়ূরকণ্ঠী টিপ আরও মোহময়ী করে তুলেছে।
চা দিয়েই মাথা নিচু করে কোনো কথা না বলে ফিরে গেল।
দুপুরে সবাই খেয়ে নিয়ে খানিক আড্ডা দিয়ে ফেরার জন্য তৈরি হতে লাগলাম।
একটু বাদে সবাই বাসে উঠে পড়ল, আমি আর ভাস্বরদা বাদে। ভাস্বরদা অন্যান্য স্টাফদের বকশিশ মিটিয়ে পরম দায়িত্ববান অভিভাবকের মতো একবার গেস্ট হাউসে ঢুঁ মেরে দেখতে গেছে কেউ কিছু ফেলে এসেছে কি না।
ধীর পায়ে ঝুমা এগিয়ে এল। এই শীতকালে অসময়ে আকাশ কেমন যেন মেঘলা হয়ে এল। মেঘ ছেয়ে আছে বুঝি তার মুখেও। কী জানি! হয়তো আমারই মনের ভুল। অনেকটা কাছে এল,
— কাল সন্ধ্যাটা এক লহমায় কীভাবে যেন কেটে গেল, তাই না! আরও অনেক না বলা কথা বুঝি রয়ে গেল। তবুও যা পেলাম সেটুকু পরম যত্নে মনের মণিকোঠায় গুপ্তধনের মতো আজীবন সঞ্চিত হয়ে থাকবে। আবার আসবেন, আশা রইল।
মনে হলো, না, এই আবেদন রিসর্টের ম্যানেজারের পেশাদারি আহ্বান হিসেবে নয়। সেখানে বুঝি হৃদয়ের আর্তি ছিল।
ঝুমার চোখে চোখ রেখে নামিয়ে নিলাম। ভাস্বরদা চলে আসতেই দুজনে উঠে পড়লাম।
পিছনে পড়ে রইল ঝুমা আর তার ফেলে আসা দিনের নানা রঙের জাল বুনেও স্বপ্নভঙ্গের করুণ কাহিনি। অপূর্ণ রয়ে গেল তার মদির চোখের চাউনির না-পড়তে-পারা ভাষা।
আমার সিটের পাশে জানালার কাছে এগিয়ে এসে কী যেন বলার চেষ্টা করল। বাসের গোঙানিতে সব চাপা পড়ে গেল। পিছনে পড়ে রইল শুধু একরাশ কালো ধোঁয়া।