মানুষ কেন যুদ্ধ করে

লিখেছেন:সুজাতা পান্থী সরকার

শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছে।

পাহাড়ের নীচ থেকে কুয়াশা ধোঁয়ার মতো উঠে আসছে ওপরে। বড় বড় আকাশ ছোঁয়া গাছগুলো আদিম অতিকায় জন্তুর মতো যেন ওত পেতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আক্রমণের অপেক্ষায়। মাঝে মধ্যে রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে শিকারের খোঁজে। আজ বোধহয় চাঁদ ওঠেনি। চারিদিক কেমন নিঝুম, নিথর।

এই হিম ঝরা অন্ধকারে কিম্ আর ফেরিয়েরা পাহাড়ি পায়ে চলা পথ ধরে চলেছে অন্য ছাউনির দিকে। চলতে চলতে কথা বলছে তারা। কিন্তু এই পরিবেশে আজকের এই কথোপকথন শুধুমাত্র ফাঁক ভরানোর সেতু নয়। আজ তাদের দু'জনের মধ্যেই কাজ করছে সামরিক উর্দির আড়ালে অন্য এক অনুভব।

'কিম্, তুমি নিশ্চয় স্বীকার করবে, এটা একটা ভুল হয়ে গেছে।' চলতে চলতে ফেরিয়েরা বলল।

'না। একেবারেই না। কোনো ভুল হয়নি।' মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল কিম্।

'কিন্তু' কম্যান্ডার উত্তেজিত হয়ে বলে চলল, 'কিন্তু এমন সব লোকেদের নিয়ে তুমি সৈন্যদল তৈরি করেছ, যাদের কোনোভাবেই বিশ্বাস করা চলে না। এমন কি দলের যে নেতা তার ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না। তবু একে ভুল বলবে না? আমার তো মনে হয়- এক্ষুনি এদের অন্যান্য ভালো দলগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া উচিত। তাহলেই সব ঠিক থাকবে। নইলে দেখে নিও। এর ফল ভালো হবে না।'

কিম্ তার বড়োসড়ো গোঁফের প্রান্তটা একমনে চিবোতে চিবোতে পথ চলছিল। একটুও না ভেবে সে উত্তর দিল। 'এদের নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। বরং বলতে পার বেশ নিশ্চিন্ত।'

একথা শোনবার পর কেই বা শান্ত থাকতে পারে। ফেরিয়েরা তার বরফের মতো ঠাণ্ডা চোখ দুটো ওপরে তুলে কপালে হাত ঘষতে ঘষতে বলল,

- 'কিম, কবে তোমার মাথায় ঢুকবে যে যুদ্ধক্ষেত্রটা পরীক্ষামূলক গবেষণাগার নয়। বুঝতে পারছি লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে মনে মনে তুমি কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খাড়া করে নিয়েছ। আর সেই আত্মতুষ্টিতে মজে আছ। তোমার মনের মতো করেই তো সব সাজিয়েছ। একদিকে প্রোলেতারিয়েত আর অন্যদিকে কৃষকরা। আসলে যে কাজটা তুমি করতে চাইছ তা হল- এই দুটো দলকে একসঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে যাদের মধ্যে শ্রেণী. সচেতনতা নেই তাদের সচেতন করতে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ঢুকিয়ে দিতে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে এসবের কি আদৌ দাম আছে?'

ছোটোবেলা থেকেই এ রোগটা কিমের আছে। কথা বলতে গিয়ে আটকে যায় কোনো কোনো সময়। তখন অস্বস্তি এড়াতে সে মাথা নাড়ে ঘন ঘন। এখনও ঠিক তাই হল। মাথা ঝাঁকিয়ে দম নিয়ে সে বলল,

- 'বাজে কথা। যতসব আজগুবি ভাবনা। যারা যুদ্ধ করে তাদের সবারই মধ্যে একটা বিশেষ তাগিদ থাকে। ... অবশ্য প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই তাগিদটা আলাদা ... কিন্তু তারা যখন একই জায়গায় একই শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, তখন সবারই উদ্দীপনা কিন্তু একই সুরে বাঁধা। .... এই ধর ড্রিট্রো, পেলে... এমন কি তুমিও... সবাই... তোমাদের বেঁচে থাকা বা হারিয়ে যাবার জন্য একটা ছোটো তুচ্ছ কারণই যথেষ্ট... আর রাজনৈতিক কাজ বলে তুমি যা ভাবছ তা হল... কেন সবাই যুদ্ধ করছে সে সম্বন্ধে যারা অবহিত নয়, তাদের একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করে দেওয়া। আমি শুধু এটুকুই করতে চাইছি।' 

কিম্ যখন অন্য লোকের সাথে কথা বলে বা কোনো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তখন তার কথাবার্তা পুরোপুরি যুক্তিসংগত। কোথাও কোনো অস্পষ্টতা নেই। কিন্তু যদি তার সামনে কোনো একজন লোক থাকে তাহলে অবধারিতভাবে সে লোকটার মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরবে। ফেরিয়েরা যে কোনো জিনিসকেই অনেক সহজ ভাবে দেখে। তার মধ্যেএত জটিলতা নেই। সে বলল,

‘ঠিক আছে। যত পার তুমি তাদের বোধ জাগ্রত কর। আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি যেভাবে বললাম- সেভাবেই তুমি তাদের সংগঠিত কর।'

কিম্ তার গোঁফের ফাঁক দিয়ে লম্বা শ্বাস নিল। 'তুমি কেন বুঝতে পারছ না, ফেরিয়েরা'.... কিম্ এবার অধৈর্য হয়েই বলতে শুরু করেছে,... 'এরা ফৌজি নয়। বা মিলিটারি ট্রেনিং নেওয়া সৈনিকও নয়। যাদের বলতে পারি যে এটা তোমাদের কর্তব্য। তোমাদের করতেই হবে। এদের কাছে কোনো কর্তব্যর কথা বলতে পারবে না। দেশ, স্বাধীনতা বা কমিউনিজম্ এতসব গালভরা তত্ত্বকথা আওড়াতে পারবে না। কেননা এসব শোনবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ এদের নেই। এদের নিজস্ব একটা আদর্শ আছে। মনে আছে তোমার- কুক যখন তাঁর চরমবাদী ধারণার কথা শোনাতে গিয়েছিলেন, কী হয়েছিল। তারা চিৎকার করে তাঁকে নামিয়ে দিয়েছিল মঞ্চ থেকে। ঘুসি মেরে। মানুষটাকে চেপে ধরেছিল মাটির সঙ্গে। রক্তাক্ত মুখে তবু কুক কিছু বলতে চেয়েছিলেন। তারা শোনেনি। শোনবার কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। কেননা তাদের কোনো আদর্শ, মিথ বা... 'বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক'... এ জাতীয় শ্লোগানের আদৌ প্রয়োজন নেই। তারা যুদ্ধ করে এবং মারা যায়। কোনো চিৎকার এবং তত্ত্ব ছাড়াই।'

'তাহলে.... তারা যুদ্ধ করে কেন?'

অনেকটা আত্মগতভাবে জিজ্ঞেস করল ফেরিয়েরা। সে নিজের মতো করে ভালোভাবেই জানে এরা কেন যুদ্ধ করে। তবু কিমের মতামতটা একবার শোনা যাক।

'ভালো কথা।' কিম্ বলল। তার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে যেন বহুদূর থেকে। এই অন্ধকারেও ফেরিয়েরা বুঝতে পারছে কিমের দৃষ্টি সুদূরে নিবদ্ধ। ধড়াচূড়া পরা মানুষটা হেঁটে যাচ্ছে তার পাশে পাশে। এই মুহূর্তে দেশ-কালের গণ্ডি অতিক্রম করে অত্যন্ত নিরাসক্ত ভাবে কিমের মন বিশ্লেষণ করে চলেছে যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা ও তার কারণ যা শুধুমাত্র এই যুদ্ধের সাথে সংলগ্ন নয়। পৃথিবীর যে কোনো যুদ্ধ সম্বন্ধে প্রযোজ্য। কিম্ বলে যাচ্ছে - 

- 'এখন। ঠিক এই সময়ে পাহাড়ের নীচ থেকে নিঃশব্দে অনেক সৈন্য উঠে আসছে পাহাড় বেয়ে আমাদের ছাউনি লক্ষ্য করে। কাল তাদের অনেকেই আহত হবে। মারা যাবে। এটা তারা ভালো করেই জানে। তবু কেন এমন জীবন যাপন করছে তারা। কেউ তো বাধ্য করেনি তাদের। তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেন তারা যুদ্ধ করছে।

প্রথমেই ধর কৃষকদের কথা। এই পাহাড়েই তারা সাতপুরুষ ধরে বসবাস করছে। জার্মানরা তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাদের গবাদি পশু নিয়ে নিয়েছে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করবার জন্য, নিজেদের দেশ বাঁচানোর জন্য সারা গ্রাম লড়াই করছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। জোয়ান থেকে সত্তর বছরের বুড়ো- মরচে ধরা পুরোনো বন্দুক নিয়ে, কর্তৃরয়ের শিকারে যাবার জ্যাকেট পরে তাদের হকের দেশ উদ্ধারের জন্য আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছে। এই দেশ তাদের কাছে অস্তিত্বের সমার্থক। এই স্বদেশ তাদের কাছে সবকিছু। একটা গভীর আদর্শ। এর জন্য তারা বাড়িঘর, শস্য, গবাদি পশু সবকিছু উৎসর্গ করেছে। সুতরাং তাদের বেঁচে থাকবার জন্য এই যুদ্ধ ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই। কিন্তু আবার একদল কৃষক আছে- যাদের কাছে দেশ শব্দটা স্বার্থপরতার আর এক নাম। এরা সবসময়েই ভাবছে তাদের বাড়িঘর, তাদের শস্য, তাদের গোরু-ভেড়া, তাদের ছাগল। আর তাদের সেসব সম্পত্তি যাতে নিরাপদ থাকে সেই জন্যই তারা হয়ে যাচ্ছে গুপ্তচর... ফ্যাসিস্ট... সেক্ষেত্রে সমস্ত গ্রাম আমাদের শত্রু।

এরপর আছে শ্রমিকরা। এদের একটা নিজস্ব পটভূমিকা আছে। মজুরি, ধর্মঘট, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম ইত্যাদি। এরা একটা বিশেষ শ্রেণী। শ্রমিক শ্রেণী। তারা জানে- যে জীবন তারা যাপন করছে। তার চেয়েও আরও ভালো কিছু তারা পেতে পারে। এবং সেই আরও ভালো করায়ত্ত করবার জন্য তারা যুদ্ধ করে। তাদেরও নিজস্ব একটা স্বদেশ আছে। যেটা তারা এখনও জয় করে উঠতে পারেনি। সেজন্যই তারা লড়াই করছে। তারা স্বপ্ন দেখে- নীচে চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা কারখানাগুলো তাদের হবে। সেখানকার দেওয়ালে লাল শালুতে লেখা পোস্টার...। গেটের মাথায়, চিমনিতে ব্যানার...। তাদের সংগ্রাম চলছে। চলবে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো ভাবপ্রবণতা বা আবেগ নেই।

এছাড়াও তুমি দেখতে পাবে একটা দল। যারা বুদ্ধিমান। তাদের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন ছাত্রও থাকতে পারে। অল্পবয়েসের ভাবাবেগ আর বইতে পড়া তত্ত্বের মিশেলে তারা টগবগ করে ফুটছে। প্রায়ই তাদের ধারণাগুলো অনির্দিষ্ট অস্বচ্ছ। তাদের দেশ হল কতকগুলো শব্দ ও বই-এর সমষ্টি। যুদ্ধ করতে করতে তারা দেখতে পায় কীভাবে তাদের ধারণাগুলো বদলে যাচ্ছে। যেসব গালভরা শব্দ এতদিন তারা উচ্চারণ করেছে, গড়েছে- বাস্তবে তার কোনো অর্থ নেই। যুদ্ধের ময়দানে নেমে জীবন সংগ্রামের নতুন মানে তারা খুঁজে পায়। এবং প্রশ্নহীনভাবে তাদের সংগ্রাম চলতে থাকে যতক্ষণ না সংগ্রামের নতুন অর্থ আবিষ্কৃত হয়। যাতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না।

তাহলে বাকি রইল কে?- বিদেশি বন্দিরা। যারা কোনোভাবে মৃত্যুর কারখানা থেকে পালিয়ে এসে যোগ দিয়েছে আমাদের সঙ্গে। সেই কন্সেনট্রেশান ক্যাম্পের স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করে ফেরে। তারা যুদ্ধ করছে একটা সত্যিকারের দেশের জন্য। যেখানে কেউ তাদের পরদেশি বলে ভাববে না। যেখানে তারা ঠাঁই পাবে। নিজেদের মতো করে থাকতে পারবে। 

কিন্তু আমার কি মনে হয় জানো ফেরিয়েরা, যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় কতগুলো প্রতীকের মধ্যে যুদ্ধ। ধর আমাদের এই যুদ্ধ জার্মানদের বিরুদ্ধে। হয়তো যাকে মারতে চাইছি, তাকে না পেলে সামনে যাকে পাচ্ছি তাকেই মারছি। নইলে অন্য আর একজনকে। অথবা আর এক....। এই বিকল্প কৌশলটা একজনের মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত সবটাই কেমন চিনদেশের ছায়ানাটকের মতো হয়ে যায় না? একটা মিথ...?'

ফেরিয়েরা তার লালচে দাড়িতে হাত বোলাচ্ছিল। সে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো দেখে। কোনো কিছুতেই এত জটিলতা খুঁজে বের করা তার ধাতে নেই। অধৈর্য হয়ে সে বলল,

ব্যাপারটা এইরকম নয়।'

'না, হুবহু ঠিক এইরকম নয়।' কিমের থামবার কোনো লক্ষণ নেই। সে বলে যাচ্ছে, 'আমি জানি যারা যুদ্ধ করছে, তাদের সকলের মধ্যে একটা জিনিসে মিল আছে। সেটা হল তাদের ভেতরের উন্মাদনা। এই ড্রিট্টোর ছাউনিটার কথাই ধর না। কে নেই সেখানে। ছিঁচকে চোর, ভেসে আসা ক্যারিবিয়ন, যুদ্ধফেরত সৈনিক, কালোবাজারী, দালাল, সমাজের একেবারে প্রত্যন্ত শ্রেণীর মানুষেরা। যাদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকায় সবাই। পাশে বসলে অন্যেরা গা বাঁচিয়ে সরে বসে। তারা কোনো না কোনোভাবে চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে জড়িয়ে গেছে। যুদ্ধে এদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলবারও কিছু নেই বা হারাবারও কিছু নেই- যদি না এদের মধ্যে কেউ বিকলাঙ্গ হয় বা কোনো গোঁড়ামি থাকে। কোনোরকম বৈপ্লবিক চিন্তা এদের মনে জীবনে কখনও উদয় হবে না। সমাজের জাঁতাকলে এমন করে এরা বাঁধা যে তাদের যেদিকে ঘোরান হবে, সেদিকেই ঘুরবে।

তাহলে কেন এরা যুদ্ধ করছে?

এই মানুষগুলোর তো কোনো স্বদেশ নেই। সত্যি হোক বা আবিষ্কৃত হোক। অথবা নতুন করে বানানো হোক। এককথায় এদের ভালোবাসার কোনো ভূমি নেই। যেখানে অস্তিত্বের শিকড় তারা মাটিতে আরও গভীরে প্রোথিত করবে।

তবু একথা তো স্বীকার করতেই হবে যে তাদের সাহস আছে। মনে উদ্দীপনা আছে। আর এটা কোথা থেকে আসে জানো?- তাদের নোংরা, জঘন্য, দারিদ্রপীড়িত শৈশব থেকে। তাদের অপরিসর, অপবিত্র বস্তির ঘর থেকে। চারিধারে অশ্লীলতা দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে ওঠা থেকে। সমাজের যা কিছু খারাপ তার চিহ্ন দেহে, মনে নিয়ে বেঁচে থাকা থেকে। এবং এইরকম জায়গায় দাঁড়িয়ে এক লহমার একটা ভুল পদক্ষেপ বা মুহূর্তের আবেগ অনেকসময়ই তাদের পৌঁছে দেয় সম্পূর্ণ অন্যপথে- ব্ল‍্যাক ব্রিগেডে। ঠিক যেমন করে পেলে ছিটকে গেছে ওদিকে। একই ঘৃণা, একই উন্মাদনা নিয়ে। আসলে কে কোন দলে গেল, সেটা বড় কথা নয়। সত্যিটা হল- যুদ্ধ। পেলে আর ড্রিট্রোর কথা ধর। দু'জনেই লড়ছে। যুদ্ধ করছে। দুটো বিরুদ্ধ শিবিরে। অথচ এরা উঠে এসেছে প্রায় একই রকম সামাজিক কাঠামো থেকে।

ফেরিয়েরা তার দাড়ির মধ্যে দিয়ে বিড়বিড় করে বলবার চেষ্টা করল, 'তাহলে তুমি বলতে চাও, আমাদের লোকেদের..... আর ওই ব্ল্যাক ব্রিগেডের লোকেদের.... যুদ্ধ করবার পিছনে একই উদ্দীপনা কাজ করছে।'

'এক .... একেবারে এক।'

কিম্ একটু থেমে অন্যমনস্কভাবে তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে কিছু একটা লিখতে চাইল। যেন বই -এর পাতাতে দাগ দিচ্ছে।

'একই জিনিস... তফাত কেবল একটাই। আমরা যা করছি সেটাই ঠিক। আর ওদেরটাই ভুল। এখানে আমরা লাভ করছি নতুন কিছু। কিন্তু ওরা, যা আছে তাকেই ঝকঝকে করে পালিশ করে তুলছে। বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, অসন্তোষ, দ্বেষ ড্রিট্রোর মতো লোকেদের, আমাদের এমন কি তোমাকে, আমাকে সবাইকে বাধ্য করছে বন্দুক হাতে নিয়ে শত্রুর দিকে তাক করতে। ফ্যাসিস্টদের বেলাতেও সেই একই কথা। এই ক্রোধ, অন্তরে জমে থাকা বিরক্তি তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এই মারণ যজ্ঞের মধ্যিখানে। কারণ তারাও স্বপ্ন দেখে মুক্তির, পরিত্রাণের। তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। যার উত্তর ইতিহাস দেবে।

একথা তো তুমি নিশ্চয় মানবে ফেরিয়েরা, আমাদের দিকে কিছুই হারাবার নেই। একটা গুলিও না। আমাদের লোকেরা যুদ্ধ করছে নিজেদের মুক্ত করতে। না হলে তাদের সন্তানদের মুক্ত করতে। একটা নির্বিঘ্ন, হিংসামুক্ত পৃথিবী তৈরি করতে। যেখানে তাদের কারুরই খারাপ থাকবার কোনো কারণ থাকবে না। 

অবশ্য অন্যপক্ষের লোকেরাও একটা উদ্দেশ্য সামনে রেখে লড়ছে। যদি সেক্ষেত্রে জয় হয়ই। তবুও তার কোনো মূল্য থাকবে না। কারণ তারা কোনো ইতিহাস রচনা করবে না। তাদের আত্মা মুক্ত হবে না। হয়তো আগামী কুড়ি বছর, একশ বছর বা একহাজার বছরের জন্য আবার এইরকম সংগ্রামের সূচনা করবে। যার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে। থামবে না কখনও।

আমরা যুদ্ধ করছি পুনরুজ্জীবনের জন্য। আর ওরা দাসত্ব গ্রহণের জন্য। সংগ্রামের অনেক পোশাকি অর্থ তুমি শুনবে নানা জনের কাছে। কিন্তু এটাই সংগ্রামের প্রকৃত অর্থ। এর থেকে সত্যি আর কিছু নেই। আমাদের মধ্যে এখন কাজ করছে মৌলিক নামহীন অদম্য একটা প্রেরণা। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছি তারই জন্যে। আমরা জানি- একদিন আমরা মুক্ত হব সবরকমের অপমান, অবনমন থেকে। শ্রমিক মুক্ত হবে শোষণ থেকে। কৃষক অজ্ঞতা থেকে, বুর্জোয়াদের নিষিদ্ধ বেখেয়ালি বিবেচনা থেকে, দুর্নীতি থেকে। আমি বিশ্বাস করি- এটাই আমার রাজনৈতিক চেতনা। আমরা চেয়েছি মানুষের দুঃখকষ্টকে তাদের মুক্তির কাজে লাগাতে। আর ফ্যাসিস্টরা সেখানে মানুষের যন্ত্রণাকে কাজে লাগায় আরও যন্ত্রণা দিতে। যে যন্ত্রণার কোনো উপশম নেই। এক যন্ত্রণা অন্য যন্ত্রণার বীজ বপন করে। তারা যুদ্ধ করে এই কারণেই।'

 

গাঢ় অন্ধকারে থেকে থেকে দেখা যাচ্ছে ফেরিয়েরার নীল চোখের দ্যুতি। আর তার দাড়ির লালচে আভা। হাঁটার ছন্দে তার মাথা দুলছে। মাকড়সার জালের মতো এত জটিল যুক্তি সে অনুভব করে না। এত কথা ভাবে না। মেসিনের মতো সে সংক্ষিপ্ত। পাহাড়ি চাষির মতো বাস্তববাদী। তার কাছে যে কোনো জিনিসের, তা সংগ্রাম বা যুদ্ধ যাই হোক না কেন, দুটো কিনারা- কাজ ও তার ফলাফল।

'অসম্ভব'। সে বলল 'একেবারে অসম্ভব। মাথার মধ্যে এইসব চিন্তাভাবনা নিয়ে কী করে যে তুমি একজন ভালো কমিশার হবে বা অন্যদের সাথে স্পষ্ট করে কথা বলবে ভেবে পাই না।'

ফেরিয়েরার কথায় রাগ করল না কিম্। কেবল হাসল একটু। সে জানে ফেরিয়েরা কখনও কোনোদিন তাকে বুঝতে পারবে না। ফেরিয়েরার মতো লোকেরা সর্বদা যথাযথ কথা বলে। যেমন- এ, বি, সি। চেয়ার, টেবিল, গাছ, মানুষ ইত্যাদি। যে কোনো জিনিসই তাদের কাছে হয় স্পষ্ট নইলে অন্যদের মাথায় গণ্ডগোল আছে। তাদের বৃত্তে দ্ব্যর্থক চিন্তা বা অন্ধকার ঘর বলে কিছু নেই। যা তারা চোখের সামনে দেখতে পায়- একমাত্র সে বিষয়েই মাথা ঘামায়। আর সব মিথ্যে।

কিন্তু এ নিয়ে কিম্ কোনো তর্ক করতে চায় না। কেননা সে মনে করে চিন্তা ভাবনার দিক থেকে সে অনেক ওপরে। তবে এই মুহূর্তে সে ফেরিয়েরার মতোই কেবল বাস্তবটা দেখতে চাইছে। অন্য কিছু নয়।

'ঠিক আছে। বিদায়।'

কিমের সাথে হাত মেলাল ফেরিয়েরা। সামনের রাস্তাটা দু'ভাগ হয়ে গেছে। এখন ফেরিয়েরা যাবে প্রথমে গ্যাম্বার ছাউনিতে। তারপর কিম বেলিনোর কাছে।

তারা আলাদা হয়ে গেল কেননা কাল সকালে যুদ্ধের আগে সবকটা শিবিরই একবার করে ঘুরে যেতে হবে। যুদ্ধের শেষ সময়ের প্রস্তুতি কেমন হল বা দলের লোকেদের মনোবল অটুট আছে কিনা সে খবরটা জানা নিতান্ত জরুরি। না, আর কিছুই সে ভাববে না।

কিম একা হেঁটে যাচ্ছে এই ঝিম ধরা অন্ধকারে। তার কাঁধে হাল্কা, ছোটো স্টেনগানটা ঝুলছে একটা লাঠির মতো। কোনো কিছুতেই তার আর কিছু যায় আসে না।

গাছের গুড়িগুলো এই জমাট অন্ধকারে এক একটা অদ্ভুত মানুষের আকৃতি নিয়েছে। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, মানুষের মনের কোণে শৈশবের সেই ভয়টা থেকেই যায়। সে যতই বড়ো হোক। যতই বয়স বাড়ুক। যেখানেই যাক- ছোটোবেলার ভয়টা তার ঘাড়ে চেপে থাকে জিনের মতো। তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় সবার চোখের আড়ালে।

কিম ভাবছে- আমিও ভয় পেতাম। যদি না একটা ব্রিগেডের কমিশার হতাম। মানুষের জীবনের শেষ লক্ষ্য- ভয় না পাওয়া।

কখনও কোনোদিনও কোনো অবস্থায় ভয় না পাওয়া। কিন্তু সেটা কি এ জীবনে হয়ে উঠবে....।

তবু চেষ্টা করবে কিম্। খুব চেষ্টা করবে।

অন্যান্য কমিশারদের সঙ্গে বসে কিম যখন কোন পরিস্থিতি বিচার করে তখন তার কাছে সব জিনিস অত্যন্ত রহস্যময় হয়ে ওঠে। তার মনে হয় এই জীবনের সব ঘটনাগুলো ম্যাজিক। অলৌকিক। কখনও মনে হয় সে হেঁটে যাচ্ছে এক সাঙ্কেতিক পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে। তার নামেরই মতো। ছোট্ট কিম ঘুরে বেড়াচ্ছে ভারতবর্ষে। একেবারে কিপলিং-এর বইটার মতো। যে বইটা ছোটোবেলায় তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। শয়নে স্বপনে।

'কিম্..... কিম্.... কে কিম্?'

কে কিম্? কী তার পরিচয়- কিম ভেবে পায় না।

কোন পরিচয়টা আসলে তার নিজের। এক ধনী মানুষের সন্তান হিসেবে একটা বিষণ্ণ শৈশব কাটিয়ে, লাজুক কৈশোর পার করে সে আজ কেন এই পাহাড়ে একা হেঁটে যাচ্ছে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে? জীবন-মৃত্যুর খেলা খেলতে। এই মানুষটাই কি কিম্? নাকি তার অন্য কোনো সত্তা আছে।

সে কি অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করছে বা তার হিস্টিরিয়া হয়েছে। কিন্তু না। তার চিন্তাধারা তো যথেষ্ট যুক্তিসংগত। কোথাও কোনো অসংগতি চোখে পড়ছে না। সবকিছুই ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারছে।

কিন্তু তবুও সে শান্ত হতে পারছে না কেন?

নিজের অজ্ঞাতেই একের পর এক চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে ফেলছে তার মনের আকাশটা। চেষ্টা করেও কালো মেঘ সরিয়ে নীলআকাশ দেখতে পাচ্ছে না সে। তার পাশে পাশে চলতে থাকা আলকাতরার মতো অন্ধকারটা কখন যে সুডুত করে ঢুকে পড়েছে তার মনের মধ্যে। টেরও পায়নি। অন্ধকার সমুদ্রে আছড়ে পড়ছে উত্তাল ঢেউ।

তার পিতামাতা যারা মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিভূ। নিজের ক্ষমতায় বিত্ত অর্জন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে শান্তি ছিল। প্রোলেতারিয়েতরা অচঞ্চল। যেহেতু তারা জানে যে তারা কী চায়। ওই কৃষকরা যারা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে তাদের গ্রাম- তাদের মধ্যেও এমন অসন্তোষের ঘূর্ণাবর্ত নেই। সোভিয়েত সৈনিকদের মনেও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কারণ তারা তাদের মনকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে শৃঙ্খলা আর আবেগ দিয়ে যুদ্ধ করছে। তারা যুদ্ধ করছে এই কারণে নয় যে যুদ্ধটা খুব সুন্দর জিনিস। তারা লড়ছে কেননা এটা প্রয়োজনীয়। আর বলশেভিকরা? তারা একথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, স্বপ্ন দেখে- সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন একটা দেশ যেখানে সর্বত্র বিরাজ করছে প্রশান্তি। কোথাও কোনো দারিদ্র্য নেই। দুর্নীতি নেই। কারুর মনে কোনো অতৃপ্তি নেই। সামাজিক কারণে অন্তত।

কিন্তু কিম কেন পারছে না। সে কি কোনোদিন পারবে এমন অচঞ্চল হতে। একদিন হয়তো আমরা সবাই স্থির, অবিচল, শান্ত হয়ে যাব। আর বেশি কিছু বুঝতে চাইব না। কারণ আমাদের অজানা আর কিছুই থাকবে না তখন।

এখানকার লোকগুলো যেন সবসময়ই কোনো না কোনো সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু কিম এই চোখের কোল বসে যাওয়া, ঝুলে পড়া মুখে মানুষগুলোকে ভালোবেসে ফেলেছে। যেমন ড্রিট্রোর ছাউনির ওই ছেলেটা। কী যেন তার নাম- ছেলেটার চোখে মুখে ক্রোধের আগুন সর্বক্ষণ যেন ধিকধিক করে জ্বলছে। এমন কি যখন সে হাসে তখনও। অন্যেরা বলে তার দিদি নাকি এক বারবণিতা। সে যুদ্ধ করে। কারণ সে চায় এমন এক সমাজ ও সময়, যেখানে তার পরিচয় কোনো বারবণিতার ভাই বলে নয়। ওই যে ক্যালাব্রিয়ান ভাইরা- তারা যুদ্ধ করছে। যাতে তাদের নিজেদের দেশে যেখানে

দিয়ে। তার নামেরই মতো। ছোট্ট কিম ঘুরে বেড়াচ্ছে ভারতবর্ষে। একেবারে কিপলিং-এর বইটার মতো। যে বইটা ছোটোবেলায় তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল। শয়নে স্বপনে।

'কিম্..... কিম্ম্‌ম্.... কে কিম্?'

কে কিম্? কী তার পরিচয়- কিম ভেবে পায় না। 

কোন পরিচয়টা আসলে তার নিজের। এক ধনী মানুষের সন্তান হিসেবে একটা বিষণ্ণ শৈশব কাটিয়ে, লাজুক কৈশোর পার করে সে আজ কেন এই পাহাড়ে একা হেঁটে যাচ্ছে। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে? জীবন-মৃত্যুর খেলা খেলতে। এই মানুষটাই কি কিম্? নাকি তার অন্য কোনো সত্তা আছে।

সে কি অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করছে বা তার হিস্টিরিয়া হয়েছে। কিন্তু না। তার চিন্তাধারা তো যথেষ্ট যুক্তিসংগত। কোথাও কোনো অসংগতি চোখে পড়ছে না। সবকিছুই ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে পারছে।

কিন্তু তবুও সে শান্ত হতে পারছে না কেন?

নিজের অজ্ঞাতেই একের পর এক চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে ফেলছে তার মনের আকাশটা। চেষ্টা করেও কালো মেঘ সরিয়ে নীলআকাশ দেখতে পাচ্ছে না সে। তার পাশে পাশে চলতে থাকা আলকাতরার মতো অন্ধকারটা কখন যে সুডুত করে ঢুকে পড়েছে তার মনের মধ্যে। টেরও পায়নি। অন্ধকার সমুদ্রে আছড়ে পড়ছে উত্তাল ঢেউ।

তার পিতামাতা যারা মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিভূ। নিজের ক্ষমতায় বিত্ত অর্জন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে শান্তি ছিল। প্রোলেতারিয়েতরা অচঞ্চল। যেহেতু তারা জানে যে তারা কী চায়। ওই কৃষকরা যারা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে তাদের গ্রাম- তাদের মধ্যেও এমন অসন্তোষের ঘূর্ণাবর্ত নেই। সোভিয়েত সৈনিকদের মনেও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কারণ তারা তাদের মনকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে শৃঙ্খলা আর আবেগ দিয়ে যুদ্ধ করছে। তারা যুদ্ধ করছে এই কারণে নয় যে যুদ্ধটা খুব সুন্দর জিনিস। তারা লড়ছে কেননা এটা প্রয়োজনীয়। আর বলশেভিকরা? তারা একথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, স্বপ্ন দেখে- সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন একটা দেশ যেখানে সর্বত্র বিরাজ করছে প্রশান্তি। কোথাও কোনো দারিদ্র্য নেই। দুর্নীতি নেই। কারুর মনে কোনো অতৃপ্তি নেই। সামাজিক কারণে অন্তত।

কিন্তু কিম কেন পারছে না। সে কি কোনোদিন পারবে এমন অচঞ্চল হতে। একদিন হয়তো আমরা সবাই স্থির, অবিচল, শান্ত হয়ে যাব। আর বেশি কিছু বুঝতে চাইব না। কারণ আমাদের অজানা আর কিছুই থাকবে না তখন।

এখানকার লোকগুলো যেন সবসময়ই কোনো না কোনো সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু কিম এই চোখের কোল বসে যাওয়া, ঝুলে পড়া মুখে মানুষগুলোকে ভালোবেসে ফেলেছে। যেমন ড্রিট্রোর ছাউনির ওই ছেলেটা। কী যেন তার নাম- ছেলেটার চোখে মুখে ক্রোধের আগুন সর্বক্ষণ যেন ধিকধিক করে জ্বলছে। এমন কি যখন সে হাসে তখনও। অন্যেরা বলে তার দিদি নাকি এক বারবণিতা। সে যুদ্ধ করে। কারণ সে চায় এমন এক সমাজ ও সময়, যেখানে তার পরিচয় কোনো বারবণিতার ভাই বলে নয়। ওই যে ক্যালাব্রিয়ান ভাইরা- তারা যুদ্ধ করছে। যাতে তাদের নিজেদের দেশে যেখানে তারা বড়ো হয়ে উঠেছে সেখানে বিদেশি বলে কেউ তাদের ঘৃণা করবে না। অথবা দৈত্যের মতো বিশাল লোকটা। বর্বর, নির্দয়। ওর সঙ্গীরা বলে একটি মেয়ে ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার পর থেকেই ও এমন হয়ে গেছে। সেও যুদ্ধ করছে...।

আমাদের সকলেরই কোথাও না কোথাও গোপন ক্ষত আছে। যার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধকে আমরা হাতিয়ার বলে মনে করছি। এমন কি ফেরিয়েরা- সেও হয়তো স্বপ্নের পৃথিবীতে পা রাখতে পারেনি বলে যুদ্ধ করছে। সে কি হতাশ, বিধ্বস্ত। নইলে অমন মন দিয়ে যুদ্ধের নতুন চাল নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবে কেন?

যদিও লাল ভল্লুক এর মধ্যে পড়ে না। কারণ সে যা চায় তা সবই সম্ভব। সে সবসময় সঠিক জিনিসটাই চাইতে জানে। যা সে চায় তাকে সে সম্ভব করে তুলতে পারে। এটাই রাজনৈতিক কাজ এবং একজন কমিশারের কাজ।

 

কিম ভাবে- একদিন এসব কিছুই আর আমাকে আলোড়িত করবে না। আমার মনে বিরাজ করবে গভীর প্রশান্তি। আমি মানুষকে দেখব সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। সম্ভবতই বা কেন? সম্ভবত কথাটা আমি আর কখনও ব্যবহার করব না।

ড্রিটোর দিকে বন্দুক তুলে ধরে তাকে গুলি করে মারতে হবে আমায়।

এতবেশি জড়িয়ে পড়েছি এখানকার মানুষজনের সাথে। ড্রিট্রোর সাথে। আমি জানি -ড্রিট্রো সকলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর বলেই এত কষ্ট পাচ্ছে। কারুর সাথে খারাপ ব্যবহার করার মতো আঘাত পৃথিবীতে আর কিছুতেই দেওয়া যায় না।

একদিন খুব ছোটোবেলায় নিজেকে দু'দিন একটা ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলাম। কিছু খাইনি। জল পর্যন্ত না। তারপর বাড়ির অন্যরা মই বেয়ে ঘরে ঢুকে জানালা দিয়ে আমাকে উদ্ধার করে। সেদিন আমি নিজেকে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। সান্ত্বনা দিতে চাইছিলাম। ড্রিট্রোও ঠিক সেই জিনিসটাই করছে। ড্রিট্রো জানে- আমরা তাকে গুলি করে মারব। সে চায় গুলিবিদ্ধ হতে। কখনও কখনও এমন প্রত্যাঘাত, এমন চাওয়া আচ্ছন্ন করে রাখে মানুষকে।

আর পেলে- সে কী করছে এই মুহূর্তে। কিম্ হেঁটে যাচ্ছে লার্চ গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। তার মনে পড়ছে পেলের কথা। পেলে এখন নীচের শহরে কাফুর অন্ধকারে মড়ার খুলির প্রতীক আঁকা টুপি মাথায় দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। সে নিশ্চয় একা। একা- তার নামহীন ভ্রান্ত ঘৃণার পশরা নিয়ে। একা-তার প্রতারণার যন্ত্রণা নিয়ে। আর সেই কারণেই অন্ধ ক্রোধে জনহীন রাজপথে সে তার বন্দুক নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, লুকিয়ে থাকা বিড়াল মারছে। সেই শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে কোন বুর্জোয়ার। নড়ে চড়ে পাশ ফিরে আবার সে চেষ্টা করছে নিদ্রায় বিভোর হতে।

 

কিম ভাবছে- এই গাঢ় অন্ধকারে জার্মান ও ফ্যাসিস্ট দল নিশ্চিত গুঁড়ি মেরে উঠে আসছে ওপরের পাহাড়ি উপত্যকায়। কাঠবিড়ালির মতো নিঃশব্দ ক্ষিপ্রতায়। তারা কী জানে না- কেবল আকাশে রঙ বদলের অপেক্ষা। হিমেল ভোরে যখন পাখি ডাকবে। ফুলেরা জাগবে। তখনই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে যাবে এখান থেকে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে তাদের ইউনিফর্ম পরা দেহগুলো।

এই মুহূর্তে কোনো একজন সৈনিক হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে ট্রাকে যেতে যেতে। ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গিয়ে সে অস্ফুটে বলছে,

 - 'আমি তোমাকে ভালোবাসি, কেট।'

 আর ছ'সাত ঘণ্টা। তারপর আমরাই হয়তো মেরে ফেলব তাকে। এমন কি যদি সে নাও ভাবে 'আমি তোমাকে ভালোবাসি, কেট।' তবুও। তবুও তার ফলাফল একই। যা সে ভেবেছে। যা সে করছে সব বাতিল হয়ে যাবে ইতিহাস থেকে। হারিয়ে যাবে।

কিন্তু আমি। এই যে আমি হেঁটে যাচ্ছি লার্চ গাছের বনের মধ্যে দিয়ে। আমার প্রতিটি পদক্ষেপ চিহ্ন রেখে যাচ্ছে ইতিহাসে। আমি যে ভাবছি,

-'আমি তোমায় ভালোবাসি, আদ্রিয়ানা।' এটা একটা ইতিহাস। যার এক মহৎ পরিণতি আছে। কাল যুদ্ধক্ষেত্রে আমি একজন সত্যিকারের মানুষের মতো যুদ্ধ করব। সেই আমি যে ভেবেছিল-আমি তোমাকে ভালোবাসি, আদ্রিয়ানা।

হয়তো কাল আমি দারুণ অলৌকিক কোনো ঘটনা ঘটাতে পারব না। হয়তো জার্মানদের সামনে মারা যাব। কিন্তু মৃত্যুর আগে আমি যা যা করেছি বা আমার মৃত্যু সামান্য হলেও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। এবং আমার আজ রাতের এই চিন্তাভাবনা, আমার কালকের ইতিহাসকে প্রভাবিত করবে। আগামী কালের মানব জাতির ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

কিন্তু এখন আমি আমার কল্পনার রাজ্যে যেখানে ছোটোবেলায় প্রায়ই পালাতাম- সেখানে বিচরণ করতে চাইছি না। বরং ভাবতে চেষ্টা করছি। কালকের আক্রমণের খুঁটিনাটি নিয়ে। অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার বা স্কোয়াড সম্বন্ধে। এখন আমার এসব নিয়েই ভাবা উচিত।

তবু কী যে হয়- ওই মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে, তাদের সম্বন্ধে নতুন করে আবিষ্কার করতেই বেশি ভালো লাগে আমার। আচ্ছা! ওই লোকগুলো কি যুদ্ধ পরবর্তী ইতালিকে চিনতে পারবে। তারা কি কখনও বুঝতে পারবে, মানুষের উত্তরণের জন্যে নিরন্তর সংগ্রামের প্রয়োজন। যতক্ষণ না পূর্ণ উত্তরণ ঘটে।

আমি জানি- লাল ভল্লুক পারবে। অবাক হয়ে যাই। ভাবি, কী করে সে তার ভাবনাগুলো কাজে রূপান্তরিত করে। কিন্তু যখন আর কিছুই করবার থাকবে না তখন লাল ভল্লুক কীভাবে তার এই বিপজ্জনক অভিযানে সামিল হবার অদম্য উৎসাহ নিয়ে চুপ করে থাকবে। তাদের ওই লাল ভল্লুকের মতো হওয়া উচিত। আমাদের সকলের লাল ভল্লুকের মতো হওয়া উচিত।

সবাই নয়। তবে কেউ কেউ নিশ্চয় থাকবে- যাদের মধ্যে মাঝ সমুদ্রের মতো অগাধ প্রশান্তি জমাট বেঁধে স্থির হয়ে যাবে। তারা আবার হয়ে যাবে একা। একাকী। আর তখনই তাদের মধ্যেকার মূক পাথরের মতো স্থৈর্য, জানতে বুঝতে না চাওয়ার অচল অবস্থা পথ খুঁজবে তার চাপ বাইরে বের করে দেবার। তারা আবার জড়িয়ে পড়বে নানা অনৈতিক কাজকর্মে। অন্যায় করবে। ভুলে যাবে যে ইতিহাসের পাশাপাশি একদিন তারা হেঁটেছে। দাঁতে দাঁত চেপে শ্বাস নিয়েছে। পুরনো ফ্যাসিস্টরা বলবে,

'ওহ, পার্টিজানরা আবার..... আগেই বলেছিলাম... দেখেই বুঝেছি।'

তারা কিছুই বোঝেনি কোনোদিন। না আগে। না পরে।

একদিন কিম অচঞ্চল হয়ে যাবে। এখন তার কাছে সব স্পষ্ট। ড্রিট্রো, পিন, ক্যালাব্রিয়ান ভাইরা। সে জানে সবার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে- নির্ভীক ও করুণাহীন ব্যবহার।

কখনও যখন এমন কুয়াশা মাখা রাতে গাছের মধ্যে দিয়ে সে হেঁটে যায়। তার মনের মধ্যে কুয়াশাগুলো আরও জমাট বাঁধতে থাকে। ঘন হতে শুরু করে। তবু সে এমন একজন মানুষ যে সবকিছু বিশ্লেষণ করে। কমিশারদের বলে- এ. বি. সি.। আসলে সে একজন বলশেভিক। সমস্ত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা যে রাখে।

ঘন কুয়াশায় কিমের ভিতর অনুরণিত হতে থাকে। কেবল একটাই কথা। ।

- 'আমি তোমায় ভালোবাসি, আদ্রিয়ানা'

 

সারা উপত্যকা জুড়ে পাতলা চাদরের মতো কুয়াশা বিছিয়ে আছে সর্বত্র। ঢালু পথ বেয়ে মাথা নিচু করে সোজা হেঁটে চলেছে কিম্। এক মনে। লেকের ধারের রাস্তার মতোই পাথুরে জমি দু'ধারে। লার্চ গাছগুলো আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে-প্রান্তরে বাঁধা খুঁটির মতো।

'কিম্.... কিম্.... কে কিম্?'

 

তার নিজেকে মনে হচ্ছে শৈশবের পড়া উপন্যাসের মতো। কিছুটা ইংরেজ। কিছুটা ভারতীয় একটি ছোটো ছেলে। বৃদ্ধ লামার সঙ্গে সে খুঁজতে বেরিয়েছে পবিত্রতার নদী।

দু'ঘণ্টা আগেই কিম্ কথা বলে এসেছে মিথ্যুক ড্রিট্টোর সঙ্গে। বারবণিতার ভাই। যুদ্ধ করছে। কার সাথে। সম্ভবত নিজের সঙ্গে।

এখন সে যাচ্ছে বেলিনোর ছাউনিতে। বেলিনো- এই ব্রিগেডে সবার সেরা। তার সঙ্গে আছে একটা রাশিয়ান স্কোয়াড। জেল পালানো বন্দীরা এর সামিল। সীমান্তের কাছে ওদের দুর্গ বানানোর কাজে লাগানো হত। নজর এড়িয়ে পালিয়ে এসে বন্দুক ধরেছে তাদেরই বিরুদ্ধে যারা এতদিন শোষণ করেছে, অত্যাচার করেছে ওদের ওপর। -

কে যায়?

একজন প্রহরারত রাশিয়ানের কণ্ঠস্বর।

কিম তার নাম বলল।

- কোনো খবর আছে কমিশার? 

এটা আলেইক্সির গলা। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে সে কলেজে। সেও যুদ্ধ করছে।

- কাল একটা যুদ্ধ হবে, আলেইক্সি।

- যুদ্ধ? একশোটা ফ্যাসিস্ট মরবে তো?

 

 

 

 

 

 

 

লেখক পরিচিতি - ইতালো কালভিনো (১৯২৩–১৯৮৫) ছিলেন একজন দূরদর্শী ইতালীয় সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং ঔপন্যাসিক, যাঁর সাহিত্যকর্ম বাস্তববাদ ও কল্পবিজ্ঞানের (ফ্যান্টাসি) মধ্যকার দূরত্বকে চমৎকারভাবে ঘুচিয়ে দিয়েছিল। তাঁর চমত্কার উত্তর-আধুনিক (পোস্টমডার্ন) শৈলী এবং কাঠামোগত অভিনবত্বের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন; ইনভিজিবল সিটিজ এবং ইফ অন আ উইন্টার্স নাইট আ ট্রাভেলার-এর মতো কালজয়ী উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি কথাসাহিত্যের চেনা গণ্ডিকে বারবার নতুন রূপ দিয়েছেন। বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের সাথে লোকগাথার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে মানুষের অস্তিত্বের জটিলতা এবং গল্প বলার নিজস্ব কলাকৌশল।

ইতালীয় রূপকথা সংগ্রহ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য, যা তাঁর গল্পবলার সহজাত ক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি শব্দের জাদু আর রূপকের আড়ালে এক চিরন্তন সত্যের সন্ধান করে গেছেন। আজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম উদ্ভাবনী এবং প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে তিনি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

 

0 Comments
Leave a reply