মণিকোঠায় মণিশংকর

লিখেছেন:মিলি ঘোষ

জনপ্রিয়তা। এই শব্দটার সঙ্গে নানারকম অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। যারা একজন মানুষকে জনপ্রিয় করে তোলে, তাদের মনে থাকে আনন্দ। জনপ্রিয়তার কারণে কিছু সুখানুভূতি, কিছু আশা তাদের আগলে রাখে। আর এক শ্রেণির লোক থাকে, যারা অন্যের জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করে। যে মাত্রায় পৌঁছে মানুষ জনপ্রিয় হন, সেই মাত্রায় পৌঁছতে না পারার আস্ফালন থাকে তাদের মধ্যে। হতে পারেন তিনি একজন সঙ্গীত শিল্পী, একজন খেলোয়াড়, একজন লেখক বা একজন বিজ্ঞানী। কখনও তাঁদের নামের আগে গুণী শিল্পী, দক্ষ খেলোয়াড়, সুলেখক বা মেধাবী বিজ্ঞানী বলা হয় না। বরং যত্ন করে সম্মানজনক শব্দ-ভান্ডার সরিয়ে রেখে জনপ্রিয় শব্দটাই ব্যবহার করা হয়। জনপ্রিয় শব্দটা যেন সেই ব্যক্তির যোগ্যতার মাপকাঠি কমিয়ে আনার হাতিয়ার। 

 

সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় একজন অত্যন্ত সুলেখক ছিলেন। তাঁর লেখার মান তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। আর এই জায়গাতেই সমস্যা। সম্প্রতি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মৃত্যুর পরেও তিনি জনপ্রিয়ই থেকে গেলেন, সুলেখক হতে পারলেন না! অথচ সত্যজিৎ রায় শংকরের লিখিত উপন্যাস 'জন অরণ্য' নিয়ে সিনেমা বানালেন। সত্যজিৎ নিজে বলেছিলেন, শংকরের লেখা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বেকারত্বের যে ভয়ানক রূপ শংকর এঁকেছিলেন তাঁর 'জন অরণ্য' উপন্যাসে  বাঙালি কোনোদিন তা ভুলবে না। উপন্যাসের শুরুতে টেরিটি বাজারের সামনে এক হতশ্রী লাইট পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সোমনাথ ব্যানার্জী। দিনটা ছিল পয়লা আষাঢ়। এই তারিখটা সোমনাথের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। পয়লা আষাঢ় সোমনাথের জন্মদিন আর ওর মায়ের মৃত্যুদিন। শুরু থেকেই লেখার বাঁধন এত শক্ত ছিল, পাঠক বই ছেড়ে উঠতে পারেনি।

মনে পড়ে, সোমনাথের সহপাঠী সুকুমারের কথা? সম্পূর্ণ বিপরীত আর্থিক পরিকাঠামোয় বড় হওয়া দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু! সুকুমার যখন পাবলিক সার্ভিস কমিশন, স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের ফর্ম গলা ফাটিয়ে বিক্রি করছে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে, সোমনাথ তখন উল্টো দিকের ফুটপাথ ধরে কাঁধে ঝোলা নিয়ে খোলা আকাশের নিচের বাসিন্দাদের ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে। 

 

লেখকের 'একা একা একাশি' বইটি তাঁর জীবনের একটি অসামান্য দলিল। এই বইটি থেকেই পাই, এক সময় লেখকের পিঠে ছাপ পড়ে গেছিল - ওয়ান বুক অথর। এই নাম তিনি ঘুচিয়েছিলেন নিজের দক্ষতায়, কলমের জোরে। 

এতটা না হলেও বর্ষায় কলকাতা চিরকালই হাবুডুবু খেয়েছে। একদিন বৃষ্টি শেষে ধর্মতলায় জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকের হোটেলগুলো দেখতে দেখতে শংকরের মাথায় আসে হোটেল জীবন নিয়ে কিছু লেখার কথা। সেই শুরু হল - চৌরঙ্গী। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এসবই আমরা জেনেছি 'একা একা একাশি' পড়তে গিয়ে।

'চৌরঙ্গী' পাঠক সমাজে কতটা নাড়া দিয়েছিল, সে পাঠক মাত্রেই জানেন। লেখক নিজেই সেই হোটেলের একজন কর্মী ছিলেন। সেখানে স্যাটা বোস নামে এক উজ্জ্বল চরিত্রকে দেখতে পাই , যার আসল নাম ছিল সত্যসুন্দর বোস। স্যাটা বোসের কথা বলতে গেলে এই প্রতিবেদন চৌরঙ্গী কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। তাই অন্য কিছু চরিত্রের কথা বলতে চাই, যাঁদের মানুষ বইটির শেষ অক্ষরটির সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যেতে সময় নেয় না। তাঁদের আনন্দ দুঃখ বেদনার নানান প্রতিচ্ছবি শংকর তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস চৌরঙ্গীতে ফুটিয়ে তুলেছেন। আপাত দৃষ্টিতে আলো ঝলমলে শাজাহান হোটেল, যেন সর্বাঙ্গ বাহুল্যে মোড়া এক রাজপুত্র তাঁর লোক-লস্কর নিয়ে বিশ্বের তাবড় তাবড় বিত্তশালীদের আহ্বান জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু এই হোটেলের পরতে পরতে কত মানুষের যন্ত্রণার আখ্যান লুকিয়ে থাকে এই বই না পরলে আমরা জানতেও পারতাম না। এসেছে করবী গুহর কথা। ডাক্তার সাদারল্যান্ডের জীবনের অজানা ইতিহাস, যা তিনি লেখককে একটা চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন। লেখক নিপুণ দক্ষতায় তা আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। সে কাহিনী পড়ে আমরা বিহ্বল! স্তম্ভিত! আমরাও যেন কান পেতে শুনতে পাই শাজাহান হোটেলের মানুষদের প্রবহমান যন্ত্রণার নীরব কান্না।

হয়তো আরও বহু ঘটনার সাক্ষী থেকে গেছে শাজাহান হোটেল। লেখক আমাদের যতটুকু জানতে দিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জেনেছি। আর তাতেই আমরা মুগ্ধ। শংকর নিজেই বলেছেন, শাজাহান হোটেলের ছোট ঘরে পৃথিবীর গোপনতম বৈভব তিনি আবিষ্কার করেছেন। সেই ঐশ্বর্যের খুব সামান্যই তিনি আমাদের উপহার দিতে পেরেছেন। 

একই কথা আসতে পারে 'কত অজানারে' বইটি নিয়ে। লেখক যতটুকু জানতে দিয়েছেন, আমরা ততটুকুই জানতে পেরেছি, যা আমাদের কাছে ছিল অজানা।

 

আশির ওপর পৌঁছে শঙ্করের হয়তো মনে হয়েছিল, জীবন-তরণী এবার  শেষ খেয়া পার করবে। তাই তাঁর সঞ্চিত ভান্ডারের সবটাই উজাড় করে দিলেন। বইয়ের নাম দিলেন 'একা একা একাশি'। ঈশ্বরের নিশ্চয়ই ইচ্ছা অন্যরকম ছিল। তাই আরও বারো বছর তাঁকে রেখে দিলেন আমাদের মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও তিনি সৃষ্টি করলেন তাঁর রচনা। তবে, 'একা একা একাশি' বইটির কথা বারবার উল্লেখ করার কারণ আছে। বারওয়েল সাহেবের কথা বইটির সিংহ ভাগ জুড়ে ছিল, যা অল্প কথায় বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এই বইটির শেষ পাতায় তিনি যা লিখে গেলেন, তা এই লেখায় উল্লেখ না করলে সাহিত্যিক শংকরকে শ্রদ্ধা জানানো আমার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে শুধু না, লেখকের প্রতি নিজেকে চরম অকৃতজ্ঞ ভেবে আজীবন কুণ্ঠা বোধ করব।

প্রশ্ন জাগে, লেখক আগে না পাঠক আগে। এই প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা নেই। লেখক লিখছেন বলেই তো পাঠক পাঠ করছেন। আবার না পড়ে কেউ লেখক হতে পারে না। প্রশ্ন, প্রশ্নই থেকে যায়। কিন্তু শংকর উদাত্ত কণ্ঠে বললেন, পাঠক আগে। পাঠকহীন সমাজে লেখকের জন্ম হতে পারে না। তাঁর আপামর পাঠককে বইটির শেষ পাতায় তিনি প্রণতি জানাতে ভুললেন না। এর পরেও কি তিনি শুধুই জনপ্রিয়? সুলেখক নন?

 

পরজন্ম যদি সত্যিই থাকে, মণিশংকর মুখোপাধ্যায় আবার আসবেন আমাদের মাঝে। যে কলমটি তিনি নিয়ে গেছেন, সেটি নিয়েই আসবেন। হয়তো জনপ্রিয় হয়েই আসবেন। সুলেখক তো আমরা চিনে নেব।

 

0 Comments
Leave a reply