ফিলিস্তিনি কবিতাগুচ্ছ

লিখেছেন:অঞ্জন ঘোষ

এক গুচ্ছ দারবিশ 

 

মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনের আলবিরওয়ায় ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ তাঁর জন্ম। মাত্র ছয় বছর বয়সেই জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে এবং তারপর থেকে শুরু হয়েছে তাঁর উন্মূল উদ্বাস্তু জীবন। কোথাও থিতু হতে পারেননি। বাইরে-বাইরে জীবন কাটলেও ফিলিস্তিন ছিল তাঁর অন্তরে এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য তিনি আজীবন কলমযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। তাই তাঁকে ফিলিস্তিনের জাতীয় কবিও বলা হয়ে থাকে। আরবী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এই কবি ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট টেক্সাসে মৃত্যুবরণ করেন।

আরবে প্রাচীন কাল থেকেই কিত্আ বা খণ্ড-কবিতার চর্চা হয়ে আসছে। আমার অক্ষম অনুবাদে দারবিশের কয়েকটি কিত্‌আ।  এই কিত্‌আ গুলি অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলাম, গাজায় ফ্লোটিলা অবরোধের কালে। 

আসলে গাজায় ফ্লোটিলা কোনও তাৎক্ষণিক বিজয় নয়। দারবিশ সেই কবেই লিখে গেছেন, ‘আজই বেঁচে নাও কারণ আগামীকাল আরো ভয়ঙ্কর হতে পারে। আগামীকাল পরমাণু বোমাও ফেলা হতে পারে’।  এগুলো হচ্ছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কিছু মেটাফর। অসহায়ের লড়াই অনেকাংশেই মেটাফর নির্ভর অথচ মেটাফরই ভরসা যোগায় ভস্ম হতে ফিনিক্সের জেগে ওঠার । সেই ভাবনা থেকেই  দারবিশের কিত্‌আ গুলিকে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। 

আসলে প্রণোদনাটা ছিল কবি  হিজল জোবায়ের এর কাছ থেকে। হিজল, নাজওয়ান দারবিশের কতকগুলি কবিতা অনুবাদ করেছেন। হিজল কে বললাম, তাহলে আমি মাহমুদ দারবিশের কতকগুলি ‘কিত্‌আ’ চেষ্টা করে আপনাকে পাঠাই। হিজল উৎসাহ দিলেন, তাই। কিত্‌আ গুলিকে পৃথক করার জন্য সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করেছি, আদতে মূল সুর একটাই। মূলের আরবী থেকে অনুবাদ করেছেন, ফেদি জাউদা। 

(১)
অন্তিম সীমানার পর আমরা কোথায় যাব?
অন্তিম আকাশের পর কোথায় উড়ে যাবে পাখির দল?
বাতাস যখন অন্তিম শ্বাসটি নেয়,
গাছেরা ঘুমোবে কোথায় তারপর? 

(২) 
সমস্ত রাস্তাই এখন তোমার দিকে ধাবমান,
তোমাকে ভোলার জন্য যেটা বেছেছিলাম 
এমনকি সেই রাস্তাটাও।

(৩) 
আবার কবে আমাদের দেখা হবে?
যে বছর যুদ্ধ শেষ হবে।
যুদ্ধ কবে শেষ হবে?
যখন আমাদের দেখা হবে। 

(৪)
সৌন্দর্য্যও একদিন অসহায় হয় 
যুদ্ধক্ষেত্রে সদ্য ফোটা 
রডোডেনড্রেন যেমন।

(৫)
মানচিত্র দিয়ে নির্বাসন ধরা যায় না 
তুমি আপন ভূখণ্ডেই 
নির্বাসিত হতে পারো
তোমার নিজের বাড়িতেই, 
এমনকি তোমার নিজের ঘরেই। 

(৬)
যখন নিজস্ব কোন ভূখণ্ড নেই,
আমি আমার ভাষার মধ্যে,
শব্দের মধ্য দিয়ে 
আমার দেশ গড়ে তুলতে থাকি।

(৭)
মাতৃভূমি কোনও তোরঙ্গ নয় 
আমিও নই চিরন্তন পর্যটক। 
আমি তাই তোরঙ্গটি খুলে 
সব ছড়িয়ে দিয়েছি। 
আপাতত এইখানেই …

(৮)
নিজেকে বোঝালাম,
আমার ভিতরেই যে অন্ধকার 
সেখান থেকেই একটা চাঁদ উঠবে। 

(৯)
আমাদের চিরস্থায়ী অসুখ 
আমাদের আশা।

(১০)
যদি তুমি প্রশ্ন করো,
কতবার তুমি আমার মনের ভিতরে এসেছো, 
আমি বলব একবারই;
তারপর আর তুমি ফিরে যাওনি। 

(১১)
ফিলিস্তিন একটা রূপক
ফিলিস্তিন কোনও বাস্তব নয়।
তবে ওই রূপকটা বাস্তবের থেকেও
কঠিন বাস্তব। 

(১২)
আমি ইস্রায়েল কে ভালোবাসি না। 
ভালোবাসার মত কোনও কারণও নেই
কিন্তু ইহুদীদের প্রতি আমার কোনও ঘৃণা নেই।
 

মরণের গান

হিবা কামাল আবু নাদা ( ২৪ শে জুন , ১৯৯১ – ২০ শে অক্টোবর ২০২৩ ) 

ফিলিস্তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নারী আন্দোলন কর্মী। ইস্রায়েল এর গাজা দখলের সময় তাঁর পরিবার বায়াত জিরজা গ্রাম হতে উৎখাত হয়। সাহিত্য ছাড়াও সম্পৃক্ত ছিলেন অনাথ শিশুদের কাজে, নারী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসাবে। ‘মৃতদের জন্য অক্সিজেন নয়’, তাঁর বহু আলোচিত উপন্যাস। ২০ শে অক্টোবর, ২০২৩ অধিকৃত গাজার ‘খান ইউনুসে’ নিজের বাড়িতে জিওনিস্টদের বিমানহানায় মৃত্যু। তখন বয়স মাত্রই ৩২। ঐ বে-আইনী দখলদারীর সময়েই, একটানা মিসাইল আক্রমণ আর বিমান থেকে বোমাবর্ষণের মধ্যেও লিখে যাচ্ছিলেন, সংক্ষিপ্ত যত কবিতা অথবা শব্দের মধ্য দিয়ে অধরা আর্তি। এক অকাল প্রয়াত (নিহত ) কবিকে তাঁরই কবিতার টুকরো বা সম্পূর্ণর বাংলায় রূপান্তরে আমার শ্রদ্ধা। 

কয়েকটি লেখা মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে, ৭ ই অক্টোবর, ২০২৩ হতে ১৯ ই অক্টোবর, এক্স- হ্যান্ডেলে লেখা। তার পরদিন হিবা চলে যাবেন এই দুনিয়া থেকে। মূল আরবী হতে অনুবাদগুলি করেছেন, অ্যান্থনি এনজাগরু, ফেদি জাউদা, সালমা হারল্যান্ড এবং হুদা ফাকরেদ্দিন। তাঁদের কাছেও আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ। 

 

কেবল যাওয়া নয় 

কাল রাতে 
আমার বুকের কুঠুরির মধ্যে যে আলো
তার সঙ্গে গল্প করছিল, একটা তারা; 
বলল, আমরা কেবল স্ফুলিঙ্গ নয় 
মরে যেও না। এই স্ফুলিঙ্গের তলায়
পর্যটকরা ভ্রমণরত। 
ভালোবাসা থেকে জন্ম তোমার 
সুতরাং ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নিয়ে যেও না, 
যারা আতঙ্কিত তাদের কাছে 
একদিন, সমস্ত বাগানে অঙ্কুরিত হবে বীজ 
আমাদের নাম থেকে আর
হৃদয়ের সকল কামনা থেকে 
আর এই প্রাচীন ভাষা শিখিয়েছে
কীভাবে আকাঙ্খা দিয়ে 
অন্যদের ক্ষত নিরাময় করে তুলতে হয়। 
কীভাবে স্বর্গীয় সুবাস হতে হয় 
বদ্ধ ফুসফুসে 
যা করে শ্বাসের সঞ্চার 
আমরা সেই ক্ষতে
নিরাময়যোগ্য ওষধি দিই 
ব্যাথার ওষধি। 
হে আমার আলো , আমার অন্তর্গত আলো
এখনি যেও না 
যদি সকল নীহারিকাপুঞ্জও ঘিরে ধরে।
হে আমার আলো 
হে আমার আলো, আমার অন্তর্গত আলো
একবার বলো - 
আমার হৃদয়ে বাঁচো, 
শান্তিতে
তোমরা সবাই। 
হে আমার আলো, অন্তর্গত আলো। 

 

৮ই অক্টোবর, ২০২৩ 

মিসাইলের আগুন আর এই রাত্রি অন্ধকার 
শহরের রাত অন্ধকার
গোলার আওয়াজ ছাড়া এই রাত্রি নিস্তব্ধ 
শহরের রাত শব্দহীন
প্রার্থনার নিরাপত্তা ছাড়া
এই রাত্রি আতঙ্কের
শহরের রাত আতঙ্কের 
শহীদের আলো ছাড়া 
রাত্রি এই নিঝুম নিকষ আঁধার 
শুভরাত্রি গাজা। 
শুভরাত্রি গাজা। 

 

 

১২ ই অক্টোবর, ২০২৩

গাছগুলোকে নির্মমভাবে কাটা হচ্ছে
বাড়িগুলোও 
কেউ নেই, একটা শাখাও আর নেই 
গাজা, 
একটা পরিত্যক্ত ভূমিতে পরিণত হচ্ছে 
সমস্ত শহরটা একটা দীর্ঘ সমাধিক্ষেত্র 
যা দীর্ঘ হতে হতে 
আরব লীগের দরজা হতে 
জাতিসঙ্ঘের মঞ্চ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেল।
ঈশ্বরের হাতে সব সমর্পন করে 
আমরা সেই দীর্ঘায়িত সমাধিক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আছি। 

 

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৩

আমরা অনেক উঁচুতে একটা শহর গড়ে তুলছি, সেখানে চিকিৎসকরা আছে 
কিন্তু তাদের বিব্রত করার মত অসুস্থ মানুষ বা রুধিরস্রোত নেই 
শিক্ষকরা আছে শূন্য পাঠশালায় 
দুষ্টু বাচ্ছাগুলো কেউ নেই 
নতুন পরিবারগুলোর কোনো দুঃখ কষ্ট নেই 
চিত্রগ্রাহকরা সেই স্বর্গের ছবি তুলে রাখছে 
আর কবিরা লিখে রাখছে শাশ্বত প্রেমের দিন 
ওরা সবাই গাজা থেকে এসেছে এই স্বর্গে
সবাই 
ওরা একটা অবরোধহীন গাজা গড়ে তুলতে ব্যস্ত। 

 

১৮ই অক্টোবর, ২০২৩

আমাদের পারিবারিক ছবিঃ
শব বহনকারী ঝোলাগুলোর ভেতরে টুকরো টুকরো শরীর 
কোথাও অনেকটা ছাই 
বিভিন্ন মাপের পাঁচটা কাফন পাশাপাশি। 
গাজায় পারিবারিক ছবিগুলো এইরকমই, 
ওরা একসাথে ছিল 
একসাথেই চলে যাচ্ছে 
এই শহর ছেড়ে 

 

১৯ শে অক্টোবর, ২০২৩ 

বন্ধুদের তালিকা ছোট হচ্ছে ক্রমশই 
আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কফিন
আমি তাদের আর ছুঁতেও পারি না 
আমার কোনো শোক নেই
আমার কোনো কান্না 
হে ঈশ্বর
আমরা কী করব
হে ঈশ্বর 
এই অনন্ত বিস্তৃত হতে থাকা 
মৃতদেহের ব্যাঙ্কোয়েটের টেবিল 
আমাদের কল্পনাতেও আজ কেউ নেই
যে এটা থামাতে পারে। 


নিজেকে সংহত করো 

হায়! কী নিঃসঙ্গ আমরা 
অন্যদের সব যুদ্ধ জেতা হয়ে গেছে 
আর তুমি পরিত্যক্ত হয়েছ কাদায়
বন্ধ্যা কাদায়।
দারবিশ, তুমি কি জানোনা?
নিঃসঙ্গদের কাছে ফিরে আসেনা কোনো কবিতা 
যা কিছু হারিয়ে গেছে, 
চুরি হয়ে গেছে যা কিছু।
কী নিঃসঙ্গ আমরা 
এই অন্ধকারের দিন। আর আমি তাদের অভিশাপ দিই
যারা যুদ্ধ দিয়ে আমাদের ভাগ করে রেখেছে 
আর সারিবদ্ধভাবে নিয়ে যাচ্ছে অন্ত্যেষ্টির দিকে 
কী নিঃসঙ্গ আমরা 
এই দুনিয়া একটা খোলা বাজার 
আর তোমার এই মহান দেশকে বাজারে নীলামে চড়িয়ে দেওয়া হল 
শেষ! 
কী নিঃসঙ্গ আমরা 
এই ঔদ্ধত্যের কাল 
যেখানে আমাদের পাশে কেউ নেই 
কখনো না।
কী নিঃসঙ্গ আমরা 
তোমার সব কবিতা মুছে ফেলো, 
যত পুরনো আর নতুন লেখা 
চোখের জলও।  প্যালেস্তাইন 
নিজেকে করো সংহত। 

 

স্বদেশের জন্য সাতটি আকাশ 

আমাদের ফুসফুসের মধ্যে এক স্বদেশ
আমাদের নিঃশ্বাসে নির্বাসন,
আমাদের শিরায় ছুটে যাচ্ছে এক স্বদেশ
হেঁটে যাচ্ছি তার দিকে 
শোকের উদ্যানে বেড়ে উঠছে স্বদেশ
এক আগন্তুক দ্রাক্ষাকুঞ্জ, 
দ্রাক্ষালতায় নিরালম্ব অশ্রুবিন্দু 
তার কণ্ঠ হতে চলে গেছে গান
আমাদের কণ্ঠে আজ তার সুর 
তোমাকে কি আমরা ত্যাগ করতে পারি?
তুমিও কি আমাদের ছেড়ে দিতে পারো?
তুমি সেই রক্তধারা 
আর, আমরা তো রক্তক্ষরণে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। 
ক্ষুধা আর রুটি সমার্থক, যেভাবে জেনেছি গ্রন্থরাজি হতে 
আলো আর অন্ধকার, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো
জেনে নিয়েছি ভালোবাসার শেষ প্রান্তে আশা
আর ছন্দের মরূতে গর্ভিনী মেঘের দল 
এই এক স্বদেশ, যা ফিরে আসে নগ্ন হয়ে, বারবার
সে জানে কীভাবে পোশাকের মত আমাদের জড়িয়ে নিতে হয় 
রক্তস্রোতে গোপন রাখে জলোচ্ছ্বাস
আর প্রতি হৃদস্পন্দনে ভাষায় জাহাজ 
নিশ্চিন্ত বালিশের তলায় রাখে হাঁটাপথ
স্বপ্নের সরণিতে যত সব শহর 
সে কি নিদ্রায় থাকবে আমাদের মাঝে 
বারবার আবিস্কার করতে থাকবে সময়কে, বারবার?
আগন্তুক যত জলপাই গাছগুলোর মত 
অচেনা তাদের স্বাদ আর বর্ণ, 
এই পৃথিবীতে আমাদের জন্য কোনো জায়গা নেই 
একটা সংকীর্ণ বারান্দা ঘিরে আসছে ক্রমশঃ  
যেন আমরা অজস্র কলঙ্ক, আমাদের কামনাগুলো অপরাধ
স্বদেশের জন্য প্রেম একটা গভীর পাপ। 

 

মাটি আর রক্তের ঘ্রাণ

নাজওয়ান দারবিশ, জন্ম যাঁর ১৯৭৮ এ, মাহমুদ দারবিশ এর ঠিক ৩৭ বছর পর। মাহমুদ দারবিশের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে নাজওয়ান বলেছিলেন, অবশ্যই আছে, মাটি আর রক্তের। ফিলিস্তিনের মাটি আর ফিলিস্তিনী দের রক্তের উত্তরাধিকার । কুড়িটি ভাষায় নাজওয়ান অনুদিত হয়েছেন, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল নাজওয়ান, ফিলিস্তিনের মাটি আঁকড়ে আছেন। 

সবকটি কবিতাই আরবী হতে ইংরাজিতে রূপান্তর করেছেন করিম জেমস আবু-জাইদ। সেখান থেকে বর্তমান অনুবাদগুলি। 

 

মেরি 

আমার মা, ইদানীং যীশুর কাহিনীতে মগ্ন হয়ে থাকেন।

তাঁর বিছানা ঘিরে দখল নেয় আমার পাঠাগার থেকে নিয়ে আসা যত বই, উপন্যাস, গল্পগাথা, বিতর্ক; লেখকরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে রত হয়। মাঝে মাঝে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে ডেকে সেই দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে বলেন ( এই যেমন কিছুক্ষণ আগেই আমি ঐতিহাসিক কামাল সালিবি কে মায়ের দ্বন্দ্বের ভাবনা থেকে উদ্ধার  করলাম, যাঁর কপাল ফেটে গিয়েছিল ক্যাথলিক পাথরে)। 

যিশুর সন্ধানে রত আমার মা কে আমি হতাশ করতে পারিনা, তিনি এক নিমগ্ন পাঠক। আমি তো প্রথম ইন্তিফাদায় শহীদ হইনি, দ্বিতীয় ইন্তিফাদাতেও নয়, এমনকি তৃতীয়তেও নয়, আর তোমাকে বলছি, আগামী কোনো ইন্তিফাদাতেও আমি শহীদ হব না, বুকে বোমা বেঁধে নিয়ে যদি কোনো সারস আসে আততায়ীর মত, তাহলেও নয়। 

মা যত পড়তে থাকেন,  তাঁর কল্পনাগুলো আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে থাকে… আমি তাঁকে বই আর পেরেকের যোগান দিতে থাকি।

[ ইন্তিফাদা কথার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘ ঝাঁকুনি’ হলেও সমসাময়িক আরবী ভাষায় এর অর্থ স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান। ] 

 

এই মাটি নিয়ে লিখতে চাই

সেই শব্দগুলো আমি খুঁজছি 
যারা এই মাটি আর জমি হয়ে উঠবে। 
কিন্তু, আমি রোমানদের খোদাই করা সেই প্রস্তরমূর্তি
যাকে বিস্মৃত হয়েছিল আরবরা 
উপনিবেশের প্রভুরা যার হাত কেটে নিয়ে 
যাদুঘরে সাজিয়ে রেখেছিল,
তবুও আমি লিখতে চাই
এই ভূমিখণ্ডকে। 
আমার শব্দরা সবর্ত্রগামী
নীরবতাই আমার কাহিনী। 

 

গোলাবর্ষণ থেমে গেছে 

আগামীকাল তোমাকে কেউ চিনবে না; 
এখন গোলাবর্ষণ থেমেছে, 
তা আবার তোমার মধ্যে শুরু হবে 
বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ছে আর পুড়ে যাচ্ছে দূরের দিগন্ত 
সেই আগুন এখন দৌড়ে বেড়াচ্ছে তোমার মধ্যে 
সেই আগুন; যা পাথরকেও গিলে ফেলতে পারে।  
নিহতেরা এখন ঘুমের অতলে,
কিন্তু তোমার ঘুম আসছে না 
আসবেও না কোনদিন 
আসবেও না, যতক্ষণ না পাথরগুলো ধুলো হয়ে পড়ছে 
যে ধুলো আদতে অবসৃত ঈশ্বরের চোখের জল 
ক্ষমা নিহত, লুপ্ত; 
আর করুণার শরীর বেয়ে ঝরছে রক্তধারা  
তোমাকে আজও কেউ চেনেনা 
আগামীকালও চিনবে না কেউ 
তুমি সেই গাছ 
যা রোপিত হয়েছিল গোলার আঘাতে ধ্বস্ত ভূমিতে।

 

কোনোরকমে শ্বাস 

দুঃখ আর কান্না উজিয়ে আসছে ঘরগুলো থেকে 
আর আমি এক প্রেতের মত তোমার পরিত্যক্ত বাড়িতে এসেছি 
আমার অন্তিম এখন আমার মুঠিতে ধরা,
নিজের ধ্বংস কাঁধে নিয়ে নিদ্রাতুর হেঁটে যাচ্ছি 
এই এত এত শূন্যতা নিয়ে 
এত নৈশব্দ নিয়ে, হাঁটি 
আর পরিত্যক্ত বাড়িগুলো আমায় ঘিরতে থাকে  
পরিত্যক্ত বাতাস তোমার বাড়িগুলোতে 
আমি তাদের শূন্য হৃদয়ে , কোনরকমে শ্বাস নিচ্ছি।
কোনো আরব
অথবা কোনো পারস্যদেশের মানুষ
অথবা বাইজেন্টায়িনের কেউ
আমাকে কেউ বোঝেনা। 
আমার কি কোনো ইতিহাস ছিল না? 
কী করে হারিয়ে গেল সেসব?
আর সেই কবিতাগুলো 
আর তোমরাও; 
রেখে গেলে অগাধ শূন্যতা 
বুকের খাঁচা ছাড়া একটা গ্রহ 
তোমরা এই গ্রহটাকে চাপিয়ে দিলে আমার কাঁধে 
যদি বলি, আমি চিরতরে চলে যাচ্ছি
তাহলেও কেউ বিদায় জানাতে আসবে না 
কেবল এক পরিত্যক্ত রু রু বাতাস
যার কর্কশ কণ্ঠ আমার স্বরকে গ্রাস করে নেয়।

 

এই অন্ধকার 

আমি যে অন্ধকারে থাকি , তার বিষয়ে কিছু কথা 
যার কঠিন পাথর থেকে আমার দিনগুলোকে খোদাই করি। 
আমি ওপরে উঠতেই থাকি 
যতক্ষণ না আমি নিজেই সেই অন্ধকার হয়ে যাই।

 

একটা দীর্ঘ ক্ষত 

বসে আছো সময়ের হতভাগা একটা খাঁড়িতে
যার কোথাও কোন আশা নেই , আভূমি প্রণত
যেন ঈশ্বরের অন্তহীন মুখে এক দীর্ঘ ক্ষত।
তুমি বসে আছো, তোমার পাশ দিয়ে ঝরে পড়ছে টুকরো টুকরো আশা 
এক উন্মাদ আগুনের মধ্যে 
যেমনভাবে দেশগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে 
span style="font-size:11pt">একের পর এক, 
এক নির্মম আততায়ীর হাতে।
অত্যাচারীরাও ঝরে যাচ্ছে,
বদ্ধ জলাভূমির ওপরে 
বৃষ্টির ফোঁটার মত 
যখন ভেঙ্গে পড়ছে দেশ ও কাল 
তুমি শুয়ে আছো একটা সরু খাঁড়িতে 
ঈশ্বরের মুখে একটা ক্ষতচিহ্ন যেন । 

 

যেটুকু বাকি আছে আজ 

এক বেগুনী অন্ধকারকে অনুসরণ করা ছাড়া 
আমার হাতে আর কোনো কাজ নেই 
এই সেই মাটি
যেখানে পুরাণকথায় ধরছে দীর্ঘ চিড় , ভাঙছে 
হ্যাঁ , ভালোবাসাও তাই 
যেমন আমার দেশের মুখ ।
আমার দেশ আমার মানুষ
তারা এখন আমার ভিতরে এক প্রেতচ্ছায়া । 

 

ইস্তাম্বুলের ভূমিকম্প বিষয়ক কিছু কথা 

( অন্তিম  স্তবক ) 
আমি আমার কাছের মানুষদের সাথে নিয়ে 
ধ্বংসস্তূপ সরাবো 
তাদের সাথে নিয়ে গড়ে তুলবো নতুন ঘর 
আমার ক্রোধ এখন স্তিমিত 
কারণ এই ধ্বংস ঘটিয়েছে সর্বংসহা ধরিত্রী
ঔপনিবেশিক বিমানপোতগুলো
যা নিয়ে আসে বেজন্মা বিমানচালকরা 
তারা বোমা ফেলে এটা ঘটায়নি । 

যেখানে রাখবে তোমার হাত 
প্রভুর সেই ক্রুশকাঠ কেউ খুঁজে পায়নি 
আর আমাদের ক্রুশকাঠ?
তুমি যাকে দেশ বলো 
তার যেখানে হাত রাখবে 
সেখানেই পাবে। 
এক হাত হতে আরেক হাতে
এক অনন্ত হতে আরেক অনন্তে
আমি সেই ক্রুশকাঠগুলো
জড়ো করতে থাকি ।

 

0 Comments
Leave a reply