প্রজন্ম প্রস্তুত

লিখেছেন:ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য

— বিশ্বনাথ বাবু আছেন...

ডাকটা কানে আসতেই দ্রুত ঘরে ঢুকে যায় অনিল। ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই আর। বাইরের লোকের সামনে আবার কি বলতে কি বলে বসে! বিপদ বাঁধে আবার।

দিন কয়েক আগে বিশুকে ভীষণ অপমানিত হতে হয়েছে, অনিলের জন্য। মালতী কেঁদে ছিল অনিলের পাশে বসে। বৌমা অনেক কথা শুনিয়েছিল অনিলকে। চার বছরের নাতিটাও কথা শোনাতে ছাড়েনি, বড্ড ভুলভাল কথা বলো তুমি! কারও কোনো কথায় কোনো উত্তর দেয়নি অনিল। তবে অবাক হয়েছিল পরদিন, নাতির কথা শুনে! বলে ঠিক করে কথা বলতে পারো না দাদু। যে দেশে যেমন নিয়ম! অনিল অবাক হয়েছিল একরত্তি নাতির কথার ভার শুনে। জিজ্ঞাসা করেছিল কে বললো তোকে এই কথা? মা-বাবা সবাই বলে। সততা নিয়ে আর বাঁচা যায় না, কেউ নাকি দাম দেয় না। দাদু, সততা কি গো? প্রশ্ন করেছিল অনিলের নাতি। অল্প কথায় কি আর সততা বোঝানো যায় ওইটুকু ছেলেকে! এক সময় ভেবে না হয় বলবে আপাতত উত্তরটা তোলা থাক। সেই মুহূর্তে নাতিকে কিছু বলেনি অনিল, বিশুর কি হবে সে ভাবনায় ডুবে ছিল।

সেদিন মানে দিন কয়েক আগে দুপুর বেলায় দোকান থেকে ফিরে চান করে দুয়ারে বসে ভাত খাচ্ছিল অনিল। মালতী আর বৌমা রান্নাঘরে ছিল। সদর দরজার সামনে এসে কারা ডাকে বিশুকে, বিশ্বনাথ বাবু...। সদর দরজা বন্ধ ছিল, বোঝার উপায় নেই কে বা কারা এসেছে। অনিলের বৌমা দরজা খুলতে যাবার আগেই অনিল পা ফেলে সদর দরজার দিকে। বৌমা সেই সময় শ্বশুরকে উদ্দেশ্য করে নিচু গলায় বলে ওদেরকে বলবেন আপনার ছেলে বাড়িতে নেই। বৌমার কথা শুনে অবাক হয়েছিল অনিল। এমন মিথ্যে বলা যায়!

বৌমার কথার অর্থ সেই সময় বোঝেনি অনিল, নিজের মত কথা বলেছিল বাইরে থাকা আসা লোকজনের সঙ্গে। তারপরেই অপমানিত হয়েছিল বিশু। পরে বুঝেছে। তাই আজ কে বা কারা এসেছে তাদের কাছে যাবার সাহস দেখায়নি অনিল। ঘরে এসে চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। পরিস্থিতিটা কে সামলায় সেটাই দেখার। বুকটা ধুকধুক করছে অনিলের। আবার যদি সেই ছেলেগুলো আসে তবে বিশুকে ছেড়ে কথা বলবে না। মারধর পর্যন্ত করতে পারে। ইস! কি যে হবে। আবার পাশের বাড়ির মদন ঘোষ, গোপাল বৈরাগী, হারু সামন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিশুকে অপমানিত হতে দেখে মজা লুটবে। একরাশ উদ্বেগ নিয়ে ঘর থেকে বাইরের দিকে চেয়ে থাকে অনিল। কি হয়! কি হয়! অনিলের নাতিটা উঠানে খেলা করছিল একা একা। হাঁক ডাক শুনে সেও চুপ করে গেছে। একরাশ প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে রয়েছে বন্ধ দরজার দিকে। মালতী গেছে পালেদের মাকালির দুয়ারে ধুপ বাতি জ্বালিয়ে পুজো দিতে রোজ দিনের মত। বৌমা চান করছে। তাহলে! ওদের সামনে যাবে কে? বিশু তো বেরোবেই না ঘর থেকে। বাড়িতে থেকেও বাড়িতে নেই বিশু। আর অনিল কোনোভাবেই যাবে না ওদের সামনে।

ততক্ষণে আরো একবার শোনা গেল, বিশ্বনাথ বাবু...।

নাতিটা দৌড়ে অনিলের কাছে আসে। তুমি যেন বাইরে যেও না দাদু। কি বলতে কি বলবে বাবার বিপদ হবে। মা আসুক। বলে একবার বিশুর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে উঠানে গিয়ে দাঁড়ায়। বিশুর মুখটা মনে পড়ে অনিলের। হয়তো থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘরের একপাশে। সেদিনের পর থেকে বাইকটাকেও আর ঘরের বাইরে রাখে না বিশু। যাতে বাইরে থেকে কেউ এলে বুঝতে না পারে বিশুর বাইক আছে। বাইকটা দেখে ভাববে কিস্তি শোধ করতে পারে না আবার বাইক চালানোর শখ! এরই মধ্যে একদিন ব্যাংকের লোকজন এসেছিল। অনিল বাড়ি ছিল না সেই সময়। মালতীর কাছে সব শুনেছে অনিল। লোন পরিশোধ না-করা নিয়ে কথা শুনিয়ে গেছে বিশুকে। বৌমা অবশ্য ওদেরকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। চওড়া গলায় নানা রকম কথা বলে ফিরিয়ে দিয়েছে। ব্যাংকের লোকেরা বলেছে পরে আবার আসবে। লোন ফেরত না দিলে একদিন বাড়িটাই নিয়ে নেবে। বিশু ওদের সামনে যায়নি, সাহসে কুলায় নি।

মাস তিনেক হলো বিশু বাড়িতেই থাকে। বাড়ির বাইরে বের হয় না। সরকারি চাকরি করতো বিশু। সেটা চলে গেছে। মানে ঠিক চলে যায়নি, ফিরে পেতেও পারে তবে সেটা ভাগ্যের ব্যাপার। কেউ বলে অসম্ভব, সর্বোচ্চ আদালতে রায় বদলাবে না, যাওয়া-চাকরি ফিরবে না আর। কথাটা শুনে বুকটা কেমন শুকিয়ে আসে অনিলের। অজানা ভয়ে গুটিয়ে আসে ভিতর থেকে। আহা অমন ছেলেটার কি হলো! কী ব্যস্ত থাকতো বিশু। হাসি খুশি থাকতো। আর এখন থম মেরে বসে থাকে। আপাতত বিশুর অফিস যাওয়া বন্ধ। বেতন বন্ধ। সংসার সচল রাখতে অনিলের চায়ের গুমটিই ভরসা। আজ পাঁচ ছয় বছরে শুধু ডাল ভাত আলু খাবার অভ্যাস হারিয়েছে অনিলের পরিবার। ছেলে চাকরি পাবার পর থেকে বেঁচে থাকার মান বেশ কয়েক ধাপ উঠেছে। বদলেছে অনেক কিছুই। মাটির বাড়িটা মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে নিচে চারটে উপরে দুটি পাকা ঘর করেছে বিশু। মার্বেল বসানো। ঝাঁ চকচকে। একেবারে চোখ ধাঁধানো ব্যাপার। যারা দেখেছে তারা জানে। পায়খানা বাথরুম রান্নাঘর সব দেখবার মতোো। বাঁধানো উঠান। ভবিষ্যতে গাড়ি কিনবে বলে গ্যারেজটাও রেডি করেছে, পরামর্শটা বৌমার ছিল। সামনের দিকে ফাঁকা একটা বড়ো জায়গা ছিল। অনিলের বাবার আমল থেকে বন জঙ্গল নিয়ে পড়ে ছিল। সেখানে বেশ বড়ো বাগান করেছে বিশু। গোটা বাড়িটা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সদর দরজা, চার চাকার কথা ভেবে বড়ো গেট সেও চোখ টানার মত। সব লোন নিয়ে করেছে। এত বড়ো বাড়ি বানিয়ে কি হবে বিশু? কয়টা মানুষ থাকতে কতটুকু জায়গা লাগে? একদিন বলেছিল অনিল। অনেক কষ্ট করেছি বাবা। আর নয়। বাড়ি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেবো সবাইকে। চাকরি করছি, দম আছে আমার। বলেছিল বিশু। অনিলকে বলেছিল তোমার চায়ের দোকানটা এবার পাকা করে দেব তাতে আমার সম্মান থাকবে। রাজি হয়নি অনিল। চায়ের গুমটিটা তো শুধু গুমটি নয় আরো অনেক কিছু। ওটা অনিলের জীবন সংগ্রামের সাক্ষী। ওটা অমনি-ই থাক। তারপর বিশু একদিন বলেছিল মাস্টারের বাবা তুমি। চায়ের গুমটি চালানো তোমার কাজ নয়। দুধের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিচ্ছি তোমার বৌমার নামে। তুমি শুধু বসে থাকবে। দুজন লোক থাকবে। দিন শেষে হিসাব নেবে। কথা শোনেনি অনিল। মালিক সেজে বসা সবার সাজে না। খাটো ধুতি ফতুয়া আর হাওয়াই চপ্পলই ভালো অনিলের। অবশ্য মুখ ফুটে কথাগুলো বলেনি ছেলেকে। চা বানাই। বিক্রি করি। পাঁচজন আসে। গল্প গুজব হয়, ভালোই লাগে। ওই সব ঝামেলায় গিয়ে কাজ নেই। তাই বলে নিরস্ত করেছিল বিশুকে। সায় দিয়েছিল মালতী। ভাগ্যিস! কয়দিন আগেই মালতী বলছিল কোনদিন না ব্যাংকের লোক এসে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে যায়। হায় ভগবান! কপালে যে কি আছে। বলে কাঁদছিল নীরবে। বিশুর কথা উঠলেই মালতী কাঁদে, বলে এমন সুখ তো চাইনি। অনিল চুপ থাকে।

বিশুর চাকরি নেই। খবরটা মাস খানেক আগে থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে ভেসে বেরাচ্ছিল, বিশু বা বিশুর মত অনেকেরই চাকরি চলে যাবে, যাবেই। নিয়োগ প্রক্রিয়াতে নাকি গলদ ছিল। পিছনের দরজা দিয়ে বেশ কিছুজন চাকরি পেয়েছে। পদস্থ লোকজনকে টাকা দিয়ে। লাখ লাখ টাকা! বিষয়টা জানাজানি হতেই তদন্ত হয়েছে। তারপর আদালত। তারপর একদফা রায়। তারপর বিশু বেকার। গৃহবন্দি। বিশুর মতো যারা তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ন্যায্য বিচার পেতে, দুজনের অন্যায় দুশো জনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে কেন? ন্যায্য প্রশ্ন। বিচার চাই। বিচার হবে। যতদিন না ফয়সালা হয়, ততদিন বিশুর চাকরি থাকবে না। গ্রামের পতিতপাবন বাবু বলে কী দিন এলো অনিল! প্রকাশ্যে অন্যায় করছে তারপর বলছে আমাদের চাকরি ন্যায্য। ভাব অনিল সামনে কোন সময় আসতে চলেছে। দেশটা রসাতলে গেল রে। ন্যায় অন্যায় বলে কিছু রইলো না। কার পাপ কে ভোগ করছে! ছি ছি ছি। এইবার এই ছেলেগুলো না সুইসাইড করে! মানসিক নির্যাতন, সামাজিক অপমান কতদিন সহ্য করবে! পতিতপাবন বাবুর ভাইপোর অবস্থাও বিশুর মতো। হয়তো তাই এমন কথা বলে। সুইসাইডের কথা শুনে অনিলের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে এসেছিল। অপলকে তাকিয়েছিল পতিতপাবন বাবুর দিকে। আর বিশুর কথা ভাবছিল। বুঝলি অনিল ন্যায় সততা এইসব এখন শুধু বইয়ের পাতাতেই আছে। এখন যারা নেহাত শিশু, সেই প্রজন্মের কথা ভেবে গায়ে কাঁটা দেয় আমার। সময়ের সঙ্গে এদের পরিবর্তনটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে অনিল, দেখিস তুই। এরা এক্কেবারে সেই তৈরি ছেলে। নিজের নাতিটার মুখটা মনে এসেছিল অনিলের। শোন অনিল তোর ছেলেটাকে চোখে চোখে রাখিস। বলেছিল পতিতপাবন বাবু। কথাটা মালতী আর বৌমাকে বলবে বলে ভেবেছিল অনিল কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়নি। কি ভাবে বলবে! কি মনে করবে ওরা। তার থেকে আবার কোন অশান্তি হয়, তাই।

পরিচিতরা এখন বিশুকে অন্য চোখে দেখে। বিশু কিভাবে চাকরি পেয়েছিল সেই নিয়ে কথা ওঠে গ্রামের নানা মহলে। বিশু সামনের দরজার নাকি পিছনের দরজার লোক সেই নিয়ে আড়ালে সন্দেহ প্রকাশ করে অনেকেই। আসল নকল মিলেমিশে একাকার। কাউকে কিছু বলার নেই। প্রমাণ করবার উপায়ও নেই।

গ্রামের নানা মহলের আলোচনা অনিলের কানে আসে, দোকানে এসে বলাবলি করে লোকে। দুঃখ পায় অনিল। বাড়ি ফিরে মালতীকে বলে। বৌমা শোনে। বিশুও। বিশুর মান সম্মানের ব্যাপার। বিশু আজকাল চুপ করে থাকে। বাইরের লোক তো দূরের কথা, বাড়ির লোকজনের সঙ্গেই কথা বলে না ভালো করে। সারাদিন ফোন অফ করে ঘরে শুয়ে থাকে। লোকজন বিশুর খোঁজ করতে এলে বৌমা বলে দেয় বিশু বাড়িতে নেই, কবে ফিরবে জানে না। এরপরেও কোনো প্রশ্ন বাইরে থেকে এলে প্রশ্নকর্তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশের বাড়ির মদন ঘোষ ব্যাপারটা দেখে বেশ মজা পায়। অনিলকে দেখলেই এগিয়ে এসে নানা কথা জিজ্ঞাসা করে, আসলে উদ্দেশ্য অন্য। কিভাবে বেঁচে আছে বিশু সেটাই জানতে চায়। ইদানিং অনিলের চায়ের দোকানে চা খেতে আসে মদন ঘোষ। আগে কখনো আসত না। উদ্দেশ্য চা খাওয়া নয়। কথার ছলে কথা জানতে চায় আসলে। অনিল কথার মার প্যাঁচ কম বোঝে। সেটাই সমস্যা। নিজে থেকে সাজিয়ে কথা বলতে গেলে অনিলের জিভটা কেমন ভারী হয়ে আসে। চেষ্টা করেও বলতে পারে না। মালতী স্বামীকে বোঝায় তুমি চুপ থাকবে। কারওর কোনো কথার উত্তর দেবে না। বৌমা বলে আজকের দিনে আপনি অচল। একটু চালাক চতুর হবার চেষ্টা করুন। তারপর শিখিয়ে দিয়েছে বিশু সম্পর্কে পথে ঘাটে কি কথা বলতে হবে। মিথ্যা বলার গুরুত্ব বুঝিয়েছে অনিল। অন্তত বিশুর কথা ভেবে বৌমার শেখানো কথা বলতেই হবে বলে অনিল তৈরি রাখে নিজেকে। তবে ভয় হয়, যদি সত্যিটা অভ্যাস বসে বলে ফেলে! সেদিন যেমন জীবন মাস্টার চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করেছিল বিশ্বনাথ এখন কি করছে অনিল? ফুটন্ত চায়ে চামচ নাড়াতে নাড়াতে অনিল প্রথমে ভাবছিল চুপ থাকবে। জীবন মাস্টার কি আর চুপ থাকতে দেবে অনিলকে! একই প্রশ্ন আবার করে। অনিল বলেছিল বাড়িতেই শুয়ে বসে থাকে। কি? জিজ্ঞাসা করে জীবন মাস্টার। সঙ্গে সঙ্গে শেখানো কথা মনে পড়ে যায় অনিলের। বলে পড়াশোনা করছে। চাকরির পরীক্ষা গুলো দেবে। কি একটা পরীক্ষাতে পাশও করেছে। এখন দেখা যাক কি হয়। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে কপালের ঘাম মুছে ছিল অনিল। তারপর নিজেই অবাক হয়েছিল, পারলো কি করে! অনিলের কথা শুনে জীবন মাস্টার বলে বাহ্ বেশ বেশ। সব সময় পজিটিভ থাকা উচিত। মদন ঘোষ পাশে ছিল। মনে হয় অনিলের কথাগুলো বিশ্বাস হয়নি। বারবার জিজ্ঞাসা করেছিল কোন চাকরির পরীক্ষা অনিল? এর মধ্যে আবার চাকরির পরীক্ষা কবে হলো? কোথাও তো নিয়োগ নেই। পেপারে তো দেখিনি! অনিল মুখ খোলেনি। আবার কথার জালে জড়িয়ে পড়বে। তবে পরিস্থিতিটা সামলাতে পেরেছিল। বৌমার কথাগুলো কানে নেয় অনিল। ভয় হয় যদি সময়ে মুখে না আসে শেখানো কথাগুলো। সেদিন যেমন হয়েছিল। অনিলের জন্য তো বিশুকে অপমানিত হতে হলো! তবে দায়ী একা অনিল নয়। বিশুও দায়ী। বিশুর চাকরি হারানো দুর্ভাগ্যের, ভীষণ দুর্ভাগ্যের। এক শ্রেণীর মানুষ চূড়ান্ত অন্যায় করলো। সেই অন্যায়ের বিষময় ফল ভোগ করছে বিশু। সমাজে এই ধরনের অন্যায় অপরাধ রুখবে কে? দিনকাল অন্য রকম। জীবনে এমন ঝড় ঝাপটা তো আসতেই পারে। সে দুর্যোগে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কৌশল বিশুর আয়ত্তের বাইরে। চাকরি করছে। ভালো বেতন মিলছে। পথে ঘাটে লোকে মাস্টার মশাই বলে সম্মান করছে। তাতেই জীবন যাপনের ধারণা বদলেছে বিশুর। অনাবশ্যক প্রাচুর্যের মৌতাতে মত্ত। লোককে অবাক করে দেবে বলে বাড়ি বানিয়েছে। নিজের ভয়াবহ আর্থিক দুরবস্থার জন্য দায়ী বিশু নিজেই। চাকরি হারিয়ে মরণ ছাড়া উপায়ন্তর ভাবতে পারে না। বিশুর জীবন যদি সাদামাটা হতো, চাহিদা আর উপার্জনের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে চলতো তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও শান্তি মিলতো। খেয়ে পড়ে বাঁচতো। পাওনাদারের ভয়ে গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হত না। অনিলের বয়স কম হলো না। সহজ সরল জীবন সব সময় সুখের। সেখানে লোক দেখানো চমক না থাক শান্তিতে বাঁচা যায়। অপদস্থ হবার ভয় থাকে না।

সেদিন বাইরের লোকের ডাক শুনে এঁটো হাতেই সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল অনিল। মোটরসাইকেল চেপে দুজন লোক এসেছে, বিশুরই বয়সী। ওদেরকে দেখে অনিল। আগে কখনো দেখেছে বলে মনে করতে পারলো না। অনিল ভাবে বিশুর বন্ধু, একসঙ্গে চাকরি করতো আগে একই অফিসে। হয়তো বিশুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। মানুষের দুর্দিনে মানুষ যেমন পাশে থাকবার অঙ্গীকার নিয়ে আসে। হাসি মুখে অনিল বলে বাড়িতে এসো বাবা। জানো তো সবই বিশুর মন মেজাজ ভালো নেই। কয়দিন ধরে শরীরটাও বিগড়েছে। যখন তখন বমি হচ্ছে। শুয়ে রয়েছে। ওরা বলে কাকু আমরা আর ভিতরে যাবো না আপনি বরং বিশ্বনাথ বাবুকে ডেকে দিন। বলুন বাইকের শো-রুম থেকে এসেছে, বারবার ফোন করেও পাওয়া যায় না ওনাকে। ওদের কথা শুনে ঘরে আসে অনিল। বিশুকে বলে তোকে বাইরে ডাকছে দুটি ছেলে। বলছে জরুরী প্রয়োজন। বাইকের শো-রুম থেকে এসেছে। এতক্ষণ ঘরে বসে সবই শুনেছে বিশু। অনিলকে দেখে ফুঁসে ওঠে। সাপের মত হিসহিস শব্দে বলে তোমার কি বোধ বুদ্ধি হবে না কোনো দিন! আমি যে রয়েছি বলতে গেছো কেন? মাথায় কি আছে তোমার! ওরা তাগাদা করতে এসেছে। বাইকের টাকা দিতে পারছি না আমি। কোথা থেকে দেবো। যাও আবার গিয়ে বলো যে আমি নেই-ই। বিশুর সামনে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকে অনিল। দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন, যাও, ওদের গিয়ে বলো আমি মরে গেছি। ইস! এইসব আবার কি কথা! মহা আতান্তরে পড়েছিল অনিল। কি করে! দুরুদুরু বুকে বাইরে এসে ছেলে দুইজনকে বলে আমার ছেলেটা অসুস্থ। বুঝতেই তো পারছো বাবা মাথার ঠিক নেই। তোমরা অন্য একদিন এসো না হয়। অনিলের কথা শুনে রেগে ওঠে ছেলে দুইজন। বলে, অন্য দিন এলে টাকা পেয়ে যাবো? চাকরি ফিরে পাবে আপনার ছেলে? ওসব ভাটের কথা বাদ দিন। ওনাকে ডাকুন। একটা বোঝাপড়া দরকার, বাইকটা তুলে নিয়ে চলে যাবো। ততক্ষণে মদন ঘোষ এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। অনিল পড়েছে বিড়ম্বনায়। কি করে! যান যান। শেখানো বুলি মারবেন না। ছেলেকে ডাকুন। বলে ওরা। মদন ঘোষ অনিলের সদর দরজায় এসে দাঁড়ায়। কি ব্যাপার জানতে চায় ছেলেদুটির কাছে। আর বলবেন না। বাইকের কিস্তি বন্ধ করে দিয়েছে। ফোন করলে ধরে না। বাধ্য হয়ে এসেছি। হাসতে থাকে মদন। বিষয়টা মাত্রা ছাড়াবে বুঝে বাইরে আসে বিশু। চরম অপমান করে ওরা। চিটিংবাজ! ধাপ্পাবাজি করছেন। গাড়ি চাপছেন ইনস্টলমেন্ট দেবেন না! নিজের বর্তমান অবস্থার কথা অতি সংক্ষেপে বোঝাতে চায় বিশু। কোনো কথা শুনতে রাজি নয় ওরা। ছেলের এমন করুণ অবস্থা দেখে ভীষণ খারাপ লাগে অনিলের। ইচ্ছে যায় বলে বাইকটা ফিরিয়ে দে বিশু। তাতে সম্মান থাকবে তোর। বলতে পারেনি অনিল। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে বৌমা এগিয়ে আসে। একদম বাইকে হাত দেবেন না। লোন দিয়েছেন বলে কি মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি! কি মনে করেছেন। মানুষটা বাঁচবে কি মরবে তার খবর নেওয়া নেই ধমকাতে এসেছেন! দুর হয়ে যান। কোনো অন্যায় না- করে চাকরিটা চলে গেল! আমরা কার কাছে যাবো? অন্যায় আমাদের সঙ্গে হয়নি! আমরা এইবার বাঁচি কি করে? বৌমার এমন চেহারা আগে কখনো দেখেনি অনিল। ছেলে দুজন চুপ করে যায়। বলে, বেশ পরে আবার আসবো। বলে বাইকে ওঠে। সে যখন আসবেন, আসবেন। এখন তো যান। নিয়ম মেনে চলে সব হবে! যা পারেন করে নিন। বলে ওদের মুখের ওপর সদর দরজা বন্ধ করে দেয় বৌমা। বিশু অনিলকে বলে এবার শান্তি পেলে! ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির! মরা ছাড়া আর আমার উপায় নেই কোনো। মুহূর্তে পতিতপাবন বাবুর কথাটা মাথায় আসে অনিলের। ছেলের দুই হাত ধরে অনিল। বিশুরে ওই কথা মুখে আনিস না বাবা। আত্মহত্যা মহাপাপ! আমি তো আছি। কথাগুলো বলেছিল অনিল। অনিলের মুঠো থেকে জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বিশু বলে তুমি থেকে কি করবে! গ্রামের মোড়ের মাথায় চায়ের গুমটি চালিয়ে জীবন চালিয়ে দেবে আমার। ঘরে চলে যায় বিশু। বাইকটাকে ঘরে ঢুকিয়ে রাখে। অনিল অবাক হয়!

ছেলের এমন অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে মালতী। বৌমা অনিল কে বলে দেখলেন আপনার জন্য কি হলো! গোটা গ্রামের লোক জানবে এইবার। সত্যি আপনার বোধবুদ্ধি যে কবে হবে! বৌমা কি বললো যে সব গায়ে মাখেনি অনিল। তবে বিশুর কথাটা মনে বড্ড নাড়া দিয়েছে। বিশু মরতে চাইছে! না না তা কি করে হয়। দিনের বেলায় সবার চোখের সামনে থাকে বিশু। ভয় কম। রাতের বেলায় কিছু করে বসলে! তাই ইদানিং রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে দুয়ারে এসে বসে অনিল। সাত পাঁচ ভাবে। প্রহর পাড় করে। আর বাড়িটাকে দেখে। এই বাড়ির জন্য আজ বিশুর কত যন্ত্রণা! কিসের প্রয়োজন ছিল এত কিছু করবার! দু একটা ছিমছাম ঘর হলেই চলতো। আসলে সহজ সরল জীবন ভাবতেই পারে না বিশু। উপায় করছি একটা কিছু করে লোককে দেখাতে হবে। লোকের বাহবা নিতেই হবে। আমার আছে আমার আছে করেই মরছে সবাই, বিশুও। অত অপমানের পরেও বিশু পারলো বাইকটাকে ফিরিয়ে দিতে! পারেনি। বরং ঘরে ঢুকিয়ে রাখলো। মনে এখনও আশা চাকরিটা ফিরে পাবে। জীবন আগের মত হবে। হলে তো ভালোই। না হলে! মরণ ছাড়া পথ আছে আর! অনিল বুঝে পায়না লোকে কি ভাবে, জীবনের জন্য উপার্জন নাকি উপার্জনের জন্য জীবন। বেঁচে থাকা কি সত্যিই ভীষণ জটিল! অনাবশ্যক চাহিদা মানুষকে রোজ একটু একটু করে অন্ধকার অবর্তের দিকে নিয়ে চলেছে, বুঝতে চায় না কেউ। এইবার যদি ব্যাংক বাড়িটাও কেড়ে নেয় কি হবে? কোথায় দাঁড়াবে পরিবারটা। কী প্রয়োজন ছিল বিলাস বহুল বাড়ি হাঁকানোর। সামনের জায়গাটাতে বাহারি বাগান, গ্যারেজ না করে যদি ফাঁকা রাখতো, সেই জায়গাটুকু বিক্রি করে ব্যাংকের টাকাটা মেটানো যেত। তাতে জীবনে শান্তি থাকতো। কে শোনে কার কথা! আসলে চাকরি বিক্রি, চাকরি ক্রয়, চাকরি-হারা পরিবারের জীবন সংগ্রাম সব সব কিছুইতে কোথাও না কোথাও মানুষের লোভ আছেই আছে। হয় অর্থের লোভ নয়তো জীবনটাকে চরম ভাবে ভোগ করে বেঁচে থাকবার লোভ নয়তো উপার্জনের অর্থে দিনে দিনে যে রাজকীয় অভ্যাস গড়ে উঠেছে তাকে আঁকড়ে থাকবার লোভ। জীবনে নিশ্চিত বিপর্যয় দেখেও অভ্যস্ত জীবনের আড়ম্বরতার মোহ ছাড়তে রাজি নয় মানুষ, লোভ সেখানেও। হয়তো তাই চারদিকে এত অন্যায় অসততা মিথ্যাচারের ছড়াছড়ি। পতিতপাবন বাবু বলে অনিল অন্যায় সর্বত্র বিরাজ করছে। দেশটা পচে গেছে রে। ভালো কিছু হবার নয়।

... বিশ্বনাথ বাবু আছেন? ডাকটা শোনা যায় আবার। অনিল কেঁপে ওঠে ভিতর থেকে।

দাদু আজ চারজন এসেছে দুটো বাইকে চেপে। আমি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম। নাতিটা এসে চুপিচুপি বলে গেল অনিলকে। তোর মা কোথায়? জিজ্ঞাসা করে অনিল। চান করছে। বলে দৌড়ে গিয়ে বিশুর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয় অনিলের নাতি। বাইরের লোকেদের গলা চড়েছে বেশ। এইবার কি হবে? ভীষণ ভয় পায় অনিল। হঠাৎ করেই সদর দরজা খোলার শব্দ কানে আসে। ঘর থেকে উঁকি দেয় অনিল। দেখে বিশুর ছেলে দরজা খুলেছে। দরজায় দাঁড়ানো দুই জন ছেলেকে চিনতে পারে অনিল। বাইকের শো-রুম থেকে আগের দিন এসেছিল। আজ আরো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। শো-রুমের ছেলেগুলোকে কোনো সুযোগ না দিয়ে হাত পা ছুঁড়ে ভীষণ চিৎকার করে বিশুর ছেলে। বলে, আমার বাবা বাড়িতে নেই। কবেই চলে গেছে এখন থেকে। ফিরবে কবে আমরা কেউ জানি না। আমি আমার বাবাকে কতদিন দেখিনি। বাবার বাইকটা নেই। আমার মা কাঁদে, আমি কাঁদি, দাদু ঠাকুমা কাঁদে আমার বাবার জন্য। আমরা খেতে পাচ্ছি না। তোমরা চলে যাও। ছেলে চারজন চুপ করে যায় বিশুর ছেলের কথার দাপট দেখে। মদন ঘোষ দাঁড়িয়ে ছিল একপাশে, মজা দেখতে এসেছিল। অনিলের নাতি মদনকে বলে লোকের বাড়ির কথা শুনতে খুব মজা লাগে তোমার। চলে যাও। কোনো দিন আসবে না আর আমাদের বাড়ির সামনে। বলে দরজাটা বন্ধ করে দেয় দুম করে। তারপর দৌড়ে আসে অনিলের কাছে। বলে ওরা চলে গেছে দাদু। আমি ভাগিয়ে দিলাম। এইবার বাবার ঘরের দরজাটা খুলে দিয়ে আসি। নাতিটা চলে যায়। অনিল অচল হয়ে বসে থাকে। যে দৃশ্য দেখল তা কল্পনার অতীত। এমন হতে পারে! একটা চার বছরের বাচ্চা! নাতিকে অপলকে দেখতে থাকে অনিল। দুই চোখ ভরা বিস্ময়। বিশু আসে অনিলের কাছে। বলে, দেখলে কিভাবে কথা বলতে হয় পাওনাদারের সঙ্গে!

হ্যাঁ, অনিল দেখেছে। সব দেখেছে। না জানি আরো কত কিছুই দেখবে!

সমাজ বড়ো ব্যাধিগ্রস্ত আজ। চারপাশে পাপ পাপ আর পাপ। দুর্নীতির হাত ধরে এগিয়ে চলেছে মানুষ। ন্যায় অন্যায়ের তোয়াক্কা করে না কেউ। আর এই সব কিছুর মাঝে এক ভয়ঙ্কর প্রজন্ম বড়ো হচ্ছে। সমাজের ক্রমবর্ধমান পাপ আর অন্যায়ের মাঝে যেকোনো উপায়ে নিজেদের অস্তিত্ব দম্ভের সঙ্গে টিকিয়ে রাখতে এই প্রজন্ম প্রস্তুত। বিশুর ছেলে সেই ভয়ংকর প্রজন্মের-ই একজন, নিশ্চিত অনিল।

 

0 Comments
Leave a reply