শরৎ সাহিত্যে নারী চরিত্র

লিখেছেন:প্রলয় বসু

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাশিল্পী। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে শরৎ-সাহিত্যের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার মূলে নারী-অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তিনি তাঁর অনন্য কলমশৈলীতে প্রায় কুঠারাঘাত করে গেছেন। এমনকি কখনো কখনো তিনি অনিলা দেবী, অপরাজিতা দেবী ইত্যাদি ছদ্মনামেও লিখেছেন। ১৯১৩ থেকে ১৯৩৮—দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি সৃষ্টি করেছেন অবিস্মরণীয় নানা নারীচরিত্র। আজ তাঁর জন্মের দেড়শ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর মনন ও চিন্তনকে নারীপ্রগতির এক জ্বলন্ত দলিল বলে মনে হয়।

দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ—

“যে ধর্ম বনিয়াদ গড়িয়াছে আদিম জননী ইভের পাপের উপর, যে ধর্ম সংসারের সমস্ত অধঃপতনের মূলে নারীকে বসাইয়া দিয়াছে, সে ধর্ম সত্য বলিয়া যে-কেহ অন্তরের মধ্যে বিশ্বাস করিয়াছে, তাহার সাধ্য নয় নারীজাতিকে শ্রদ্ধার চোখে দ্যাখে।”

সেই প্রয়োজনের নিরিখেই এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তাঁকে, তাঁর লেখনীসত্তাকে নারীজাগরণ ও প্রগতির তাগিদে আর একবার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করাই এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।

তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রগুলির পরিসর সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুরু করে নিম্নবর্গীয় নারী, পতিতা, বিধবা, প্রেমাকুলা ও অরক্ষণীয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

শরৎচন্দ্র ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে লিখেছেন—‘সমাজ নারীর ভুলভ্রান্তি এক পাইও ক্ষমা করিবে না, পুরুষের ষোলো আনাই ক্ষমা করিবে।’ মূলত সামাজিক নানা বন্ধনে, ধর্মীয় জীর্ণ আচারে এবং কুসংস্কারে জীবনকে যেখানে বিষাক্ত করে রাখা হয়েছিল, সেই প্রচলিত হিন্দু সমাজের অনুশাসন মেনে নিয়েই শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাসের নারীচরিত্র চিত্রণ করেছেন।

শরৎচন্দ্র একসময় বহু কুলত্যাগিনী বঙ্গরমণীর ইতিহাস সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, দারিদ্র্য অথবা স্বামীগৃহের অত্যাচার ও উৎপীড়নের কারণে বহু মহিলা কুলত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে পতিতা চরিত্রগুলির প্রেম, একনিষ্ঠতা ও সেবাপরায়ণতার চিত্রও অক্লেশে তুলে ধরেছেন। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় পিয়ারী বাইজির কথা, যে বাল্যপ্রণয়ের টানে আজীবন শ্রীকান্তনিষ্ঠ থাকে। চন্দ্রমুখী অনুরক্ত থাকে দেবদাসের প্রতি। ‘আঁধারে আলো’ গল্পের প্রধান নারী চরিত্র বাইজি-পাড়ার বিজলী সত্যেন্দ্রের প্রেমে বাইজি-পেশা ছেড়ে দিয়ে বলে—‘যে রোগে আলো জ্বাললে আঁধার মরে, সূর্যি উঠলে রাত্রি মরে—আজ সেই রোগেই তোমাদের বাইজি চিরদিনের জন্য মরে গেল।’

অবশেষে প্রেমের আলোয় বিজলীর রূপান্তর সমাজের তথাকথিত অন্ধকার দিক থেকে আলোর পথে আসার এক প্রতীক হয়ে থেকে যায়। ১৯২২ সালে এই উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ হয়, যেখানে সত্যেন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা অভিনেতা শিশির ভাদুড়ী এবং বিজলী চরিত্রে রূপদান করেছিলেন দুর্গা রানী। সত্যেন্দ্রের স্ত্রী রাধারানীর হাতের নোয়া অক্ষয় হওয়ার কামনা জানিয়ে বিজলীর চিরবিদায়। এটা নিশ্চিত, সত্যেন্দ্রের ছবিখানা সঙ্গে নিয়ে গেলেও আর কখনো, কোনোদিন তাদের দেখা হবে না। চার বছর আগের সত্যেন্দ্রের প্রত্যাখ্যান এভাবেই ফিরিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে গেছে এই বিজলী চরিত্র।

কিন্তু এসব প্রেমের সামাজিক স্বীকৃতি সম্ভব নয়। তাই প্রতিস্পর্ধী লেখক লিখেছেন—‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না—ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।’ উদাহরণ হিসেবে বিখ্যাত উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’-এর বুদ্ধিমতী, আত্মনির্ভরশীল নারী কিরণময়ীর প্রতি আলোকপাত করা যাক। দিবাকরের প্রতি চরম অনুরক্ত থাকা সত্ত্বেও সে উপেন্দ্রর প্রতি তার সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ চেতনা ও চাহিদাকে ত্যাগ করতে না পেরে অন্তিমে পাগলিনী হয়ে যায়।

আবার, আর এক বিখ্যাত উপন্যাস ‘গৃহদাহ’-এর অচলার বিবাহোত্তর প্রেম প্রথাগত হিন্দু ভাবনার পরিপন্থী হয়েছে। অসুস্থ স্বামী মহিমকে ফেলে সুরেশের সঙ্গে তার আপাতগমন সমাজের চোখে তাকে বিচ্ছিন্না করে, অবশেষে নিষিদ্ধা ও আশ্রয়হীনা করে তুলেছে।

‘দেবদাস’ উপন্যাসের পার্বতীর নিঃশর্ত প্রেম সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কাছে নতিস্বীকার করে তাকে ট্র্যাজিক নায়িকার মর্যাদা দিয়েছে। সমাজের কঠোর বিধিনিষেধের বেড়াজালে নিজের ভালোবাসাকে বলি দিতে বাধ্য হয়েছে সে। আবার ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসে শরৎচন্দ্র এক সমাজ-পরিত্যক্তা নারীর চরম দুর্দশার ছবি পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন। এই উপন্যাসের এগারো বছরের নাবালিকা কন্যা জ্ঞানদা বাংলা সাহিত্যের অতি করুণ চরিত্রগুলির অন্যতম। ‘অরক্ষণীয়া’ নামটিই প্রকাশ করে দেয়, সমাজে নারী কতটা অরক্ষিত।

জ্ঞানদা একটি ছোট, এগারো বছরের নাবালিকা মেয়ে, যে তার মামার কথায়—‘একটা সোমত্ত মাগী’—যেভাবে সমাজ দ্বারা নির্যাতিতা হয়, তা ব্যাখ্যাতীত। লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, উপেক্ষা ও উপহাসে জ্ঞানদা চরিত্রটি সিনডেরেলার কথা মনে করিয়ে দেয়; কিন্তু এতটুকু বয়সে তার ওপর যে মানসিক নিপীড়ন চলে, তা সিনডেরেলার চেয়েও ভয়ঙ্কর। তবুও সৌভাগ্যের যে, শেষ অংশে এসে অতুলের পরিবর্তন ঘটে। জ্ঞানদার সেবাপরায়ণতার সেইসব স্মৃতি, যা তাকে একদিন মৃত্যুর পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল, সেগুলির মান্যতা দিয়ে সে তার পুরনো ভালোবাসার কাছে আবার ফিরে আসে।

‘নিষ্কৃতি’ উপন্যাসের মূল নারীচরিত্রগুলি হলো শৈলজা, সিদ্ধেশ্বরী এবং বিধবা রানী। এর মধ্যে তৃতীয় চরিত্রটি অবশ্যই একজন আবেগপ্রবণ ও বেদনাহত নারী; আবার শৈলজা সহজ, সরল, স্নেহপ্রবণ বঙ্গনারী। চরিত্র দুটির বৈপরীত্য উপন্যাসটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

‘বড়দিদি’ শরৎচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জমিদার ব্রজরাজ লাহিড়ীর বিধবা মেয়ে মাধবী; যে অল্প বয়সে বিধবা, সুন্দরী ও সেবাপরায়ণা। মাধবী দেবী সুরেন্দ্রনাথকে বাড়িতে আশ্রয় দেন, লেখাপড়ায় উৎসাহিত করেন, গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন এবং ক্রমে সুরেন্দ্রের প্রতি এক অকারণ ভালোবাসায় সিক্ত হন। পরে অভিমানবশত সুরেন্দ্র ব্রজবাবুর গৃহ ত্যাগ করে। মাধবীর মন ভেঙে যায়।

মাধবীর বান্ধবী তার এই ভগ্নদশা দেখে ঠাট্টার ছলেই বলে, মাধবীর অমন রাঙা পায়ের সৌন্দর্যও কি সুরেন্দ্রকে বাঁধতে পারল না? মাধবী জানে, বিধবার হৃদয়ের ভালোবাসার মূল্য কঠোর হিন্দু সমাজে নিষিদ্ধ। তাই তার সকরুণ অশ্রুসজল উক্তি—‘আমি যে বিধবা দিদি!’ বলাবাহুল্য, এক্ষেত্রেও প্রেমের পরিণতি তো দূর অস্ত, ন্যূনতম মান্যতাও পায়নি সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে। মাধবীর একমাত্র অযোগ্যতা ছিল, সে বিধবা এবং সমাজের কাছে নিজের পবিত্রতা রক্ষায় দায়বদ্ধ।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ অনুসারে, সুরেন্দ্র যখন “ফিরিয়া আসিল না, তখন মাধবী একরূপ অন্ন জল ত্যাগ করিল। তাহার মনে হইত, সুরেন্দ্রনাথ অনাহারে আছে। যে বাড়ির জিনিষ চাহিয়া খাইতে পারে না, পরের কাছে কি সে চাহিতে পারে?” এমনই এক অনুচ্চারিত, অসফল প্রেমের গাথা ‘বড়দিদি’।

শরৎ-উপন্যাসে নারীচরিত্রের আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকে যদি ‘দত্তা’ উপন্যাসের দৃঢ়চেতা বিজয়ার চরিত্র অনুল্লেখিত থেকে যায়। তাঁর জীবনের প্রেম ও সামাজিক বাধ্যবাধকতার টানাপোড়েন উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষিতা বিজয়া, কিন্তু শরৎবাবুর লেখা অন্য নারীচরিত্রগুলির মতো নয়। সে স্বাধীনচেতা, নিজের পছন্দ-অপছন্দ স্পষ্ট করে জানাতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এক অকুতোভয় চরিত্র।

প্রয়াত পিতৃবন্ধুর ছেলে নরেন—ডাক্তার—এবং অপর ক্ষমতাবান পিতৃবন্ধু রাসবিহারীর ছেলে বিলাসকে কেন্দ্র করে তার আবর্তন এই উপন্যাসের অলঙ্কার। এই চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নারীচরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক প্রথা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার মধ্যেকার জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলেছেন। ১৯১৮ সালে রচিত এই উপন্যাসকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৬ বছর পর ‘বিজয়া’ নাট্যরূপ পায়।

উপন্যাসের আলোচনা বেশ কিছুটা হলো। এবার ফিরে দেখা যাক ছোটগল্পের দিকে। সেক্ষেত্রে একটি অনুরূপ চরিত্র হল ‘অভাগীর স্বর্গ’-এর ‘অভাগী’ চরিত্রটি, যে তার ন্যূনতম সামাজিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে অত্যন্ত করুণভাবে মৃত্যুবরণ করে; ততোধিক করুণ তার অন্ত্যেষ্টির পরিহাস। চরম শ্রেণিবিভেদ ও সামাজিক অমানবিকতার এমন নির্মম উদাহরণ এবং তার নীরব প্রতিবাদ বাংলা সাহিত্যে আর বড় বেশি নেই।

আবার ‘কাশীনাথ’ গল্পসংকলনের অন্তর্ভুক্ত ছোটগল্প ‘অনুপমার প্রেম’-এর নায়িকা অনুপমা একটি সৎ, নিষ্পাপ ও কোমলমনা মেয়ে। এই অনুপমা কিন্তু অভাগীর মতো দরিদ্র, নিপীড়িত, বঞ্চিত সমাজের প্রতিনিধি নয়; বরং বিত্তশালী ঘরের দুলালী। প্রথম পরিচ্ছেদে লেখক নিজেই বলেছেন—“অনুপমা নভেল পড়িয়া পড়িয়া মাথাটা একেবারে বিগড়াইয়া ফেলাইয়া দিয়াছে… অনু ভাবিল, সে একটি মাধবীলতা; সম্প্রতি মঞ্জরিয়া উঠিতেছে, এ অবস্থায় আশু সহকার-শাখা-বেষ্টিতা না হইলে, ফোট ফোট কুঁড়িগুলি কিছুতেই পূর্ণ বিকশিত হইতে পারিবে না। তাই খুঁজিয়া পাতিয়া একটি নবীনকান্তি-সহকার মনোনীত করিয়া লইল এবং দুই-চারি দিবসেই তাহাকে মন-প্রাণ জীবন-যৌবন সব দিয়া ফেলিল।”

অবশেষে বিরহের জ্বালা ও সামাজিক বাধা মেনে নিয়ে ক্রমশ সে শুকোতে লাগল।

প্রেম আর সামাজিক দ্বন্দ্ব শরৎ-সাহিত্যে নারীচরিত্রের অন্যতম উপাদান হয়ে উঠেছে। এটি হয়তো নবজাগরণ বা রেনেসাঁর ফসল, কিন্তু তা গড়ে উঠতে গিয়েও যেন রক্ষণশীলতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই। শরৎ-সমালোচক হুমায়ুন কবির তাঁর ‘শরৎ সাহিত্যের মূলতত্ত্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন—

“শরৎচন্দ্রের মধ্যে বিপ্লবাত্মক প্রেরণা থাকা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে এমন একটি রক্ষণশীলতার ভাব আছে, যার জন্য সময়ে সময়ে মানুষ অবাক হয়ে যায়। এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায় তাঁর নারীচরিত্র চিত্রণে। তাঁর বহু নায়িকা সামাজিক রীতিনীতির বিরোধিতা করেছে। তাদের কারুর কারুর মধ্যে এমনি বুদ্ধির চমক ঝলসে উঠে নিভে গেছে, যা সত্যিই অদ্ভুত। সামাজিক জীবনে ও চিন্তারাজ্যে সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েও অন্তঃসারশূন্য তুচ্ছ সংস্কারের প্রতি তাদের মোহ কাটেনি।”

রাজলক্ষ্মী তথা পিয়ারী বাইজী, অচলা, ‘শেষ প্রশ্ন’-এর কমল, ‘পথের দাবী’-র ভারতী—এগুলি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ‘চরিত্রহীন’-এর সাবিত্রী চরিত্র প্রসঙ্গে শরৎ-সমালোচক নারায়ণ চৌধুরী বলেছেন—“সাবিত্রীকে চিরকাল দাসীবৃত্তি করেই যেতে হল, তার অপরিমেয় ভালোবাসার মূল্যই লেখক দিলেন না।” ‘পল্লীসমাজ’-এও বিধবা রমার রমেশের প্রতি প্রেম লেখকের কলমে রক্ষণশীল হিন্দুসমাজের স্বীকৃতি পেল না।

ড. পৌলমী চক্রবর্তী ‘শরৎ-সাহিত্য এবং নারীচেতনা’ প্রবন্ধে ভারী চমৎকারভাবে শরৎচন্দ্রের নারীবাদী নিভৃত রূপটি চিত্রিত করেছেন এইভাবে—

“শরৎ-সাহিত্যের নায়িকারাও আপন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর। সমাজের রক্ষণশীল ধারণা ও তার যূপকাষ্ঠে ক্রমাগত বলিপ্রদত্ত নারীদের এক আশ্চর্য জীবনবেদ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যসৃষ্টি। সমাজের চিরাচরিত ধারণার ভিত্তিমূলে আঘাতের সিদ্ধান্ত তাঁকে দ্বিধান্বিত করে নি। ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে চিরকাল নারীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতাকে খর্ব করার চেষ্টা করেছে প্রতিনিয়ত, তাদের সামাজিক পরিস্থিতি ও মনের বিচিত্র গতিবিধি অনায়াস দক্ষতায় চিত্রিত করেছেন শরৎচন্দ্র; অবশ্যই তাঁকে এ বিষয়ে সাহায্য করেছে তাঁর সহানুভূতিশীল মন। তাঁর দরদী মনের গভীরতা ও সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি তাঁকে দিয়েছে অবিস্মরণীয় কথাশিল্পীর মর্যাদা।”

অনিলা দেবী ছদ্মনামে লেখা ‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র তাই লিখেছেন—

“নারীত্বের মূল্য কি? অর্থাৎ কি পরিমাণে তিনি সেবাপরায়ণা, স্নেহশীলা, সতী এবং দুঃখ-কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ তাঁহাকে লইয়া কি পরিমাণ মানুষের সুখ ও সুবিধা ঘটিবে। এবং তিনি কি পরিমাণে রূপসী! অর্থাৎ পুরুষের লালসা ও প্রবৃত্তিকে কতটা পরিমাণে তিনি নিবদ্ধ ও তৃপ্ত রাখিতে পারিবেন—দাম কষিবার এ ছাড়া যে অন্য কোনো পথ নাই, সে কথা আমি পৃথিবীর ইতিহাস খুলিয়া প্রমাণ করিয়া দিতে পারি।”

তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্ররা অতিমাত্রায় রক্তমাংসের, প্রতিদিনের দেখা এক-একটি চরিত্র—যারা দোষে-গুণে ভরা। তবে এই চরিত্রগুলি প্রগতিবাদী হয়েও রক্ষণশীলতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। প্রচলিত হিন্দু সমাজের অনুশাসন মেনে নিয়েই শরৎচন্দ্র গল্প ও উপন্যাসের নারীচরিত্র চিত্রণে অগ্রসর হয়েছেন।

নারীকে প্রাধান্য দিয়ে লেখক ঘুণে ধরা, পচনশীল, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে যে সত্য, সুন্দর ও উৎকর্ষ দিয়ে আলোকিত করে রাখে, সেই নারীকেই সর্বাগ্রে রেখেছেন। আর এই দ্বান্দ্বিক পরিণতিগুলিই শরৎ-সাহিত্যকে সামাজিকতার নিরিখে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শরৎচন্দ্রের রচনায় নারীমুক্তির চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর অন্তর্জগতের বেদনা ও ব্যথা; যার উপশম লেখক করতে না পারলেও সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।

পরিশেষে স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সমাজে শরৎচন্দ্রের সাহিত্যপ্রভাব নিয়ে ‘পথের দাবী’ প্রসঙ্গে পত্রালাপে ২৭শে মাঘ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে কী বলেছেন, একটু দেখে নিই—

“তুমি যদি কাগজে রাজবিরুদ্ধ কথা লিখতে, তাহলে তার প্রভাব স্বল্প ও ক্ষণস্থায়ী হত। কিন্তু তোমার মত লেখক গল্পচ্ছলে যে কথা লিখবে তার প্রভাব নিয়ত চলতেই থাকবে—দেশে ও কালে তার ব্যাপ্তির বিরাম নেই।”

বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি হয়েও, তাঁর স্বকীয়তাকে মেনে নিয়েও সাহিত্যে শুধু প্রকৃতি, প্রেম ইত্যাদি নয়, জনমানুষের কথা ও ব্যথা সময়চেতনার নিরিখে যেন নতুন করে শুনিয়েছেন শরৎচন্দ্র—আর এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। আরও অনেক কালজয়ী শরৎ-সৃষ্ট নারীচরিত্র আলোচনার বাইরে থেকে গেল, জানি।

‘স্বরাজ সাধনায় নারী’ প্রবন্ধে অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নারী প্রসঙ্গে তাঁর মূল্যায়ন যেভাবে করেছেন, সেটির উল্লেখ করেই এই সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন শেষ করি—

“পৃথিবীতে কোন সংস্কারই কখনও দল বেঁধে হয় না! একাকীই দাঁড়াতে হয়। এর দুঃখ আছে। কিন্তু এই স্বেচ্ছাকৃত একাকীত্বের দুঃখ, একদিন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বহুর কল্যাণকর হয়। মেয়েকে যে মানুষ বলে নয়, কেবল মেয়ে বলে, দায় বলে, ভার বলে নেয় না, সে-ই কেবল এর দুঃখ বইতে পারে, অপরে পারে না। আর কেবল নেওয়াই নয়, মেয়েমানুষকে মানুষ করার ভারও তারই উপরে এবং এইখানেই পিতৃত্বের সত্যকার গৌরব।”

 

0 Comments
Leave a reply