শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছোটগল্পকে দীর্ঘকাল মূলত করুণরস, নারীর দুঃখ, পল্লিজীবন ও মানবিক সহানুভূতির সাহিত্য হিসেবে পাঠ করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে তাঁর নির্বাচিত ছোটগল্পসম্ভারকে অন্য একটি ধারণাগত বিন্দু থেকে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে—দৈনন্দিন সম্পর্কের নৈতিকতা। এখানে পরিবার, জাত, ধর্ম, সম্পত্তি, যৌননীতি, জল-অন্নের অধিকার এবং সামাজিক সম্মান—সবকিছুই বৃহৎ রাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; ক্ষুদ্র দৈনন্দিন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’ ও ‘মেজদিদি’-তে পরিবারকে ক্ষুদ্র ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠান; ‘বিলাসী’, ‘অভাগীর স্বর্গ’ ও ‘মহেশ’-এ জাত-শ্রেণি ও সম্পদের অসম বণ্টনের মধ্যে বেঁচে থাকার মৌল প্রশ্ন; ‘দর্পচূর্ণ’, ‘আঁধারে আলো’, ‘হরিলক্ষ্মী’, ‘অনুরাধা’ প্রভৃতিতে নারীর আত্মমর্যাদা ও সম্পর্কের নৈতিক পুনর্বিন্যাস; আর ‘মন্দির’, ‘আলো ও ছায়া’, ‘ছেলেধরা’ ও ‘মামলার ফল’-এ আবেগ, ব্যঙ্গ, প্রতীক ও কথ্যভাষার শিল্পরূপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রবন্ধটির প্রধান অভিমত—শরৎচন্দ্রের আবেগপ্রবণতা নিছক অশ্রুসঞ্চারী কৌশল নয়; যথার্থ স্থানে তা সামাজিক অবিচারকে পাঠকের নৈতিক অনুভূতির মধ্যে স্থানান্তরিত করার এক বিশেষ জ্ঞানপদ্ধতি। তবে তাঁর মানবতাবাদের সীমাও আছে—কাঠামোগত সমস্যার সমাধান অনেক সময় ব্যক্তিগত হৃদয়-পরিবর্তন বা সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে। এই সীমা সত্ত্বেও তাঁর শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলি বাংলা সাহিত্য-সমাজের দৈনন্দিন ক্ষমতা, বর্জন ও মানবিক প্রতিরোধের গভীর দলিল।
মূল শব্দ: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ছোটগল্প, সম্পর্কের নৈতিকতা, পরিবার, জাতপাত, দারিদ্র্য, নারী, মানবতাবাদ, সামাজিক বর্জন।
শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প পাঠের কয়েকটি প্রথাগত প্রবণতা আছে—‘দরদ’, ‘সহানুভূতি’, ‘করুণা’, ‘নারীহৃদয়’, ‘পল্লিজীবন’। শব্দগুলি ভুল নয়, কিন্তু এগুলি প্রায়শই তাঁর গল্পের সামাজিক তীক্ষ্ণতাকে কোমল আবেগের আবরণে ঢেকে দেয়। বাস্তবে শরৎচন্দ্রের অনেক ছোটগল্পে ভয়াবহতা ঘটেছে অস্ত্র, রাজনীতি বা প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় হিংসার মাধ্যমে নয়; বরং কে কার ঘরে থাকবে, কে কার অন্ন খাবে, কার ভালোবাসা সামাজিকভাবে বৈধ, কার স্পর্শ গ্রহণযোগ্য, কার মৃতদেহ সম্মানজনক সৎকার পাবে, কিংবা কার পাত্রে একঘটি জল পড়বে—এইসব আপাত ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তের মধ্যে। অর্থাৎ তাঁর গল্পজগতে ক্ষমতা দৈনন্দিনতার ভিতরে ছড়িয়ে থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবার, জাত, ধর্ম, সম্পত্তি ও লিঙ্গনীতি আলাদা আলাদা বিষয় নয়; এগুলি মানুষের ‘অন্তর্ভুক্ত’ বা ‘বহিষ্কৃত’ হওয়ার পরস্পরসংযুক্ত ব্যবস্থা।
সাধারণত শরৎচন্দ্রের ছোটগল্পগুলিতে সামাজিক-পরিবারিক সমস্যা, নারী ও শিশুচরিত্র, আত্মজীবন-ঘনিষ্ঠতা দেখা যায়। তিনি বাস্তবের অপ্রিয় সত্য থেকে সরে যাননি; যৌথ পরিবারের দ্বন্দ্ব, বৈধব্য, জাতিভেদ, দরিদ্র প্রজা, জমিদারি শোষণ, নারী-পুরুষের অসম মর্যাদা এবং ভাষার সামাজিক বৈচিত্র্য তাঁর গল্পে ঘনিষ্ঠভাবে উপস্থিত। আলোচ্য প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন—মানুষের প্রতি যত্ন, স্বীকৃতি ও মর্যাদার অধিকার যখন সামাজিক বিধানের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে, তখন শরৎচন্দ্র কোন নৈতিকতার পাশে দাঁড়ান?
শরৎচন্দ্রের পারিবারিক গল্পগুলিতে গৃহ কেবল স্নেহের আশ্রয় নয়; তা সম্পত্তি, বয়স, লিঙ্গ, আত্মীয়তার ক্রম এবং ‘গুরুজন’-এর বৈধতার ওপর নির্মিত এক ক্ষুদ্র শাসনব্যবস্থা। ‘রামের সুমতি’-তে দুষ্টু, অবাধ্য রামকে শাসনের প্রশ্ন যতটা শিশুশিক্ষার, তার চেয়ে বেশি পরিবারের ভেতর ক্ষমতার বিতরণের। নারায়ণীর স্নেহ রামকে শুধুই প্রশ্রয় দেয় না; তা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষশাসিত বিচারবোধের বিরুদ্ধে শিশুর অসম্পূর্ণতা, ভুল এবং পুনরাবৃত্তির অধিকারকে রক্ষা করে। রামের ‘সুমতি’ তাই নীতিশিক্ষার সরল ফল নয়; সম্পর্কের নিরাপত্তা না-থাকলে সংশোধনের সুযোগও তৈরি হয় না—গল্পটির গভীর মানবিক বোধ এখানেই।
‘বিন্দুর ছেলে’-তেও মাতৃত্বকে শরৎচন্দ্র জৈবিক পরিচয়ে স্থির রাখেন না। শিশুকে ঘিরে আকর্ষণ, অধিকারবোধ, হিংসা, আত্মীয়তার প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা মিলিয়ে মাতৃত্ব এখানে সামাজিকভাবে নির্মিত এক আবেগ-পরিসর। মাতৃত্বের প্রকৃত অধিকার কার, সন্তানের ওপর কার দাবি সামাজিকভাবে বৈধ এবং সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ কীভাবে সেই অকৃত্রিম স্নেহকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়—এইসব জটিল প্রশ্নই গল্পটিকে নিছক সন্তানহীনতার হাহাকার থেকে উত্তীর্ণ করে এক বৃহত্তর মাত্রা প্রদান করেছে। যৌথ পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও নারীদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের সংঘাত শরৎচন্দ্রের গল্পের একটি ধারাবাহিক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত; ‘বিন্দুর ছেলে’ সেই সম্পর্ক-রাজনীতির একটি সূক্ষ্ম উদাহরণ।
এই নৈতিক দ্বন্দ্ব সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রূপ পায় ‘মেজদিদি’-তে। অনাথ কেষ্টকে আশ্রয় ও স্নেহ দেওয়ার কারণে হেমাঙ্গিনীকে পরিবারের প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। স্বামী যখন ‘গুরুজন’-এর মর্যাদাকে যুক্তি হিসেবে সামনে আনেন, হেমাঙ্গিনীর উত্তর, “তারা গুরুজন, আমিও মা। গুরুজন নিজের মান নিজে নিঃশেষ করে আনলে আমি কি দিয়ে ভরতি করব।”¹ এই কয়েকটি বাক্যে শরৎচন্দ্র কর্তৃত্বের একটি মৌল পুনঃসংজ্ঞা করেন। বয়স বা আত্মীয়তার অবস্থান কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নৈতিক মর্যাদা দেয় না; মর্যাদা আচরণের দ্বারা অর্জিত এবং আচরণের দ্বারাই নষ্ট হতে পারে।
হেমাঙ্গিনীর ‘আমিও মা’ উচ্চারণটি কেবল মাতৃত্বের আবেগ নয়—এটি ক্ষমতার বিপরীতে যত্নের নৈতিক সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। কেষ্ট তাঁর গর্ভজাত সন্তান নয়, তাই তার প্রতি স্নেহ সামাজিক বাধ্যবাধকতাও নয়; এই ‘অবাধ্য’ যত্নই গল্পের নৈতিক শক্তি। পরিবার যেখানে শিশুকে শ্রম, অপমান ও আনুগত্যের অধীন করতে চায়, সেখানে হেমাঙ্গিনী মানুষটিকে সম্পর্কের মর্যাদায় পুনঃস্থাপন করেন। অতএব শরৎচন্দ্রের সংসার-চেতনায় পরিবার মূল্যবান তখনই, যখন তা দুর্বলকে আশ্রয় দেয়; পরিবার যদি কেবল কর্তৃত্বের পুনরুৎপাদন করে, তবে মাতৃস্নেহই তার বিরুদ্ধে নৈতিক বিদ্রোহ হয়ে উঠতে পারে।
শরৎচন্দ্রের প্রান্তিক মানুষকে নিয়ে লেখা গল্পগুলির শক্তি এই যে, সামাজিক অবমাননাকে তিনি কেবল ‘খারাপ মানুষের’ নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখান না; বহু ক্ষেত্রে তা প্রথা, ধর্মীয় শুচিতা, সম্পত্তি ও সামাজিক সম্মানের স্বাভাবিক ভাষার মধ্যেই কাজ করে। ‘বিলাসী’-তে মৃত্যুঞ্জয় ও সাপুড়ে-কন্যা বিলাসীর সম্পর্কের বিরুদ্ধে সমাজের প্রতিক্রিয়া দেখায়—ভালোবাসা ব্যক্তিগত হলেও তার বৈধতা নির্ধারণ করে জাতের সামাজিক আদালত। মৃত্যুঞ্জয়ের সামাজিক পরিচয় ভেঙে যায়, কারণ সে সম্পর্ক নির্বাচনের অধিকারকে জাতিগত শৃঙ্খলার চেয়ে বড় করে দেখে। সমাজ তাকে শাস্তি দেয় শুধু একটি নিষিদ্ধ প্রেমের জন্য নয়; আসলে সে জাতের পুনরুৎপাদনের নিয়ম অমান্য করেছে। শরৎচন্দ্র এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার আধুনিক ভাষা ব্যবহার না করেও দেখিয়েছেন, সামাজিক পরিচয়ের ওপর নিজের জীবনের দাবি প্রতিষ্ঠা করাই কখনো সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধ।
‘অভাগীর স্বর্গ’-এ বঞ্চনার ক্ষেত্র আরও নির্মম, কারণ সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস মৃত্যুর পরও শেষ হয় না। অভাগীর আকাঙ্ক্ষা—পুত্রের হাতে সম্মানজনক দাহ। যে নারী জীবদ্দশায় সমাজের নিম্নতম স্তরে, মৃত্যুর সময়ও কাঠ, ভূমি, আচার ও স্বীকৃতির ওপর তার পূর্ণ অধিকার নেই। ফলে গল্পের ‘স্বর্গ’ এক গভীর ব্যঙ্গাত্মক ধারণা—পরকালের প্রতিশ্রুতি যত উজ্জ্বল, এই পৃথিবীতে তার দেহ তত অধিকারহীন। শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদ এখানে ধর্মবিরোধী নয়; বরং ধর্মীয় মুক্তির ভাষাকে জিজ্ঞাসা করে—যে সমাজ মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যু পর্যন্ত দেয় না, তার পবিত্রতার দাবির নৈতিক ভিত্তি কোথায়?
‘একাদশী বৈরাগী’ এই দ্বন্দ্বকে অন্যভাবে জটিল করে। একাদশী চরিত্রে কঠোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামাজিক সন্দেহ এবং গভীর ব্যক্তিগত স্নেহ পাশাপাশি থাকে। তাকে একমাত্রিক ‘সুদখোর’ বা ‘বৈরাগী’ বলে শেষ করা যায় না। গল্পটি একক ঘটনার দিকে সংগঠিত এবং একাদশীর আপাতবিরোধী মানসিক উপাদানই এর কেন্দ্রবিন্দু। শরৎচন্দ্রের নৈতিক বাস্তবতা তাই সাদা-কালো নয়—সামাজিক অবস্থান মানুষকে নিষ্ঠুর করতে পারে, কিন্তু একই মানুষ অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে গভীর মমতাও ধারণ করতে পারে। এই দ্বৈততা মানবিকতার প্রশস্তি নয়, বরং নৈতিক বিচারকে জটিল করার শিল্প।
এই ধারার পরিণত ও সবচেয়ে কঠোর গল্প ‘মহেশ’। গফুরের দারিদ্র্য এখানে শুধু আয়-অভাবে সীমাবদ্ধ নয়; তা জমি, খড়, জল, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক কণ্ঠ—সবকিছুর ঘাটতি। খরার দিনে গ্রামের জলাশয় শুকিয়ে গেলে জমিদারের পুকুর সাধারণের জন্য অপ্রাপ্য; মুসলমান বলে ছোট আমিনা জলের জন্য কাছে পর্যন্ত যেতে পারে না, দূরে দাঁড়িয়ে কারও দয়ার অপেক্ষা করে। পরে জমিদারের পিয়াদার সামনে গফুরের প্রতিবাদ—খাজনা দিয়ে বাস করলে সে কারও গোলাম নয়—প্রকাশ করে যে তার দারিদ্র্যের সঙ্গে মর্যাদাহীনতাও যুক্ত। জলবঞ্চনা, জমিদারি কর্তৃত্ব ও গফুরের প্রতিবাদের এই ধারাটি স্পষ্ট। গরু মহেশের প্রতি গফুরের সম্পর্ক এই সামাজিক ব্যবস্থার বিপরীতে এক বিকল্প আত্মীয়তা নির্মাণ করে। সে বলে—“মহেশ, তুই আমার ছেলে… তোকে আমি পেটপুরে খেতে দিতে পারি নে, কিন্তু তুই তো জানিস্ তোকে আমি কত ভালোবাসি।”²
এই সম্বোধনে মানুষ ও পশুর সীমা আবেগে বিলুপ্ত হয়; কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, ‘ছেলে’ শব্দটি গফুরের বঞ্চনার সম্পূর্ণ অর্থ উন্মোচন করে। সে মহেশকে খেতে দিতে পারে না কারণ সে তাকে ভালোবাসে না—এমন নয়; বরং সম্পদ-বণ্টনের কাঠামো তার ভালোবাসাকে কার্যকর হতে দেয় না। প্রেম আছে, খাদ্য নেই; দায় আছে, সক্ষমতা নেই। এই ব্যবধানই ‘মহেশ’-এর ট্র্যাজেডি। অনাহার, খরা, জমিদারি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বিভাজন শেষপর্যন্ত গফুরকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেয়, যেখানে নিজের প্রিয় প্রাণীকেই সে আঘাতে হত্যা করে। ফলে হত্যাটি ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত হিংসা কীভাবে নিপীড়িতের হাত দিয়েই আরেক দুর্বল জীবের ওপর নেমে আসে, তার ভয়াবহ রূপ। মহেশের অনাহারক্লিষ্ট মৃত্যুর দৃশ্য এবং তার পরবর্তী গফুরের মানসিক ভাঙন এই পরিণতিকে নির্মমভাবে সম্পূর্ণ করেছে। শরৎচন্দ্রের করুণা এখানে সামাজিক বিশ্লেষণে উত্তীর্ণ।
‘মহেশ’-এর আরেকটি তাৎপর্য এই যে, এখানে দয়া ও অধিকারের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমিনা জল পায় কেবল কারও করুণা হলে; গফুর জমিদারের কাছে টিকে থাকে আনুগত্য প্রদর্শন করলে; মহেশ খাদ্য পায় মালিকের নিজস্ব ভাঙা ঘরের খড় সরিয়ে। অর্থাৎ তাদের জীবন কোনো নিশ্চিত অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, অন্যের সদিচ্ছার ওপর ঝুলে থাকে। এই অবস্থাকে ধারণাগতভাবে অস্বীকৃত নাগরিকত্ব বলা যায়—মানুষ সমাজে আছে, খাজনা দেয়, শ্রম করে, কিন্তু সম্পদ ও মর্যাদার বণ্টনে তার উপস্থিতি পূর্ণ স্বীকৃতি পায় না। তাই গফুরের প্রতিবাদী বাক্যটি কেবল ব্যক্তিগত ক্রোধ নয়; অধিকারহীন মানুষের আত্মমর্যাদার ক্ষীণ ঘোষণা। তার পরাজয় দেখায়, শাসিত রাষ্ট্রের প্রজা হওয়া এবং স্থানীয় ক্ষমতার সামনে বাস্তবে স্বাধীন মানুষ হওয়া এক জিনিস নয়। এইখানে ছোটগল্পটি পল্লিজীবনের করুণ ছবি অতিক্রম করে ক্ষমতা, সম্পদ ও স্বীকৃতির সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর সামাজিক ভাষ্য হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অভাগীর স্বর্গ’ ও ‘মহেশ’-কে পাশাপাশি পড়লে শরৎচন্দ্রের প্রান্ত-চেতনার একটি ধারাবাহিকতা দেখা যায়। প্রথম গল্পে মৃত্যুর জন্য কাঠ, আগুন ও সামাজিক আচার; দ্বিতীয়টিতে জীবনের জন্য ঘাস, খড় ও জল—উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতির মৌল উপকরণ সামাজিক মালিকানা ও জাত-শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ। যেন সমাজ প্রথমে পৃথিবীর সম্পদকে ব্যক্তিগত অধিকারে ভাগ করে, পরে সেই ভাগকেই ধর্ম ও মর্যাদার ভাষায় বৈধ করে। শরৎচন্দ্র কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব পেশ করেন না; কিন্তু উপকরণের এই ক্ষুদ্র তালিকাই তাঁর সামাজিক বিশ্লেষণকে বস্তুগত ভিত্তি দেয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও সৎকার—এগুলি অনুভূতির বিষয় হওয়ার আগে দেহের অধিকার। এই দেহগত সত্যকে কেন্দ্র করেই তাঁর মানবতাবাদ সবচেয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
শরৎচন্দ্রের নারীচরিত্র নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তাঁকে কেবল ‘নারীদরদী’ বললে নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তক্ষমতার প্রশ্ন চাপা পড়ে। ‘দর্পচূর্ণ’-এ ইন্দুমতীর শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান দাম্পত্যের প্রচলিত স্ত্রৈণ বিনয়কে প্রত্যাখ্যান করে; কিন্তু শরৎচন্দ্র তার আত্মমর্যাদাকে অনালোচিত নায়কোচিত গুণেও পরিণত করেন না। নরেনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে অহং, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং আবেগের অক্ষমতা একে অপরকে আঘাত করে। শেষ পর্যন্ত ‘দর্প’ ভাঙা মানে নারীকে পুরুষের কাছে নিঃশর্তভাবে নত করা নয়; বরং উভয়েরই বুঝতে শেখা যে সম্পর্ক কেবল অধিকারের ওপর দাঁড়ালে তা শুষ্ক হয়।
‘আঁধারে আলো’-তে সামাজিকভাবে ‘পতিতা’ বলে চিহ্নিত নারীর অস্তিত্বকে শরৎচন্দ্র নৈতিকতার বাইরের অন্ধকারে ফেলে রাখেন না। বিজলীকে ঘিরে আকর্ষণ, অপমান, প্রতিশোধ, আত্মবোধ এবং সত্যেন্দ্রর বিচার—সবকিছু মিলিয়ে গল্পটি দেখায় যে সমাজ নারীর অতীতকে তার সম্পূর্ণ সত্তার প্রতিশব্দ করে তোলে। কিন্তু মানুষ তার সামাজিক স্তরের চেয়ে বড়। শরৎচন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এইখানে—তিনি ‘পতন’কে শুধু যৌননীতির ভাষায় বিচার না করে আত্মসম্মান, স্বীকৃতি ও সম্পর্কের যোগ্যতার প্রশ্নে পুনর্বিন্যাস করেন। তবে তাঁর নৈতিক নির্মাণে নারীর ‘উদ্ধার’ অনেক সময় পুরুষের দৃষ্টি বা গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত—এই সীমাটি লক্ষ করা প্রয়োজন। মানবিক পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা নারী নিজে অর্জন করলেও সামাজিক স্বীকৃতির দরজা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ-নিয়ন্ত্রিতই থাকে।
‘পথ-নির্দেশ’, ‘হরিলক্ষ্মী’, ‘সতী’, ‘অনুরাধা’ ও ‘পরেশ’-এর মতো গল্পে নারীর অবস্থান আরও বহুমাত্রিক। কোথাও বৈধব্য ও সম্পর্কের সামাজিক বিধান, কোথাও শ্রেণিভেদ ও দাম্পত্যের অসমতা, কোথাও নারীর স্বনির্বাচিত নৈতিক সিদ্ধান্ত, কোথাও পরিবারকে টিকিয়ে রাখার অদৃশ্য শ্রম—এসবের মধ্যে দিয়ে শরৎচন্দ্র নারীকে কেবল অত্যাচারিত সত্তা হিসেবে নির্মাণ করেন না; তিনি দেখান, পরিবারে নৈতিকতার বাস্তব প্রয়োগ প্রায়শই নারীর অঘোষিত শ্রমের ওপর নির্ভর করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আইন, সম্পত্তি ও সামাজিক সম্মানের প্রকাশ্য ক্ষমতা পুরুষকে দিলেও সম্পর্ক রক্ষা, অসুস্থের সেবা, শিশুর আশ্রয়, পরিবারে ক্ষমা ও পুনর্মিলনের দায়িত্ব নারীর ওপর ন্যস্ত করে। এই দ্বৈততা নারীর শক্তির উৎস, আবার তার শোষণেরও পদ্ধতি।
এখানে শরৎচন্দ্রের আধুনিকতা দ্ব্যর্থক। তিনি নারীর আকাঙ্ক্ষা, অপমান, প্রেম, অসম্মতি ও আত্মমর্যাদাকে সাহিত্যিক কেন্দ্র দেন—যা তাঁর সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি সর্বদা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে নারীর স্বাধীন স্বনির্মাণ কল্পনা করেন না; প্রায়শই উত্তরণের পথ উন্নততর দাম্পত্য, সহৃদয় পুরুষ বা মানবিক পরিবারের মধ্যে ফিরে আসে। সুতরাং তাঁর নারীমুক্তি মূলত সম্পর্ক-সংস্কারের প্রকল্প, সম্পর্ক-অস্বীকারের নয়। এই সীমাবদ্ধতাই তাঁর রচনাকে ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট করে; আবার এইখানেই তাঁর শক্তিও—তিনি সংসারের ভিতর থেকে সংসারের নৈতিক কাঠামো বদলাতে চান।
নারীচরিত্রগুলির ক্ষেত্রেও একই নীতি কাজ করে—সামাজিক মর্যাদা তখনই অর্থপূর্ণ, যখন তার সঙ্গে সিদ্ধান্তের অধিকার যুক্ত থাকে। ‘অনুরাধা’ বা ‘হরিলক্ষ্মী’-র মতো পরিণত রচনায় শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি কেবল নারী কী সহ্য করে, তার দিকে নয়; সে কীভাবে পরিস্থিতির নৈতিক অর্থ নির্ধারণ করে, তার দিকেও সরে আসে। এখানে আত্মমর্যাদা উচ্চকণ্ঠ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নয়; কখনো সম্পর্কের মধ্যে নিজের সীমা নির্ধারণ, কখনো অপমান সহ্য না করা, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে যত্নকে বেছে নেওয়া। ফলে তাঁর নারীচরিত্রের আধুনিকতা পাশ্চাত্য ব্যক্তিস্বাধীনতার সরাসরি অনুকরণে নয়; বরং বাঙালি পারিবারিক জীবনের মধ্যেই নারীর বিচারক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টায় নিহিত। এই কারণেই তাঁর নারীরা একই সঙ্গে ঐতিহ্যের ভিতরে এবং ঐতিহ্যের সমালোচক।
শিশু শরৎচন্দ্রের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক সমাজের তুলনায় ‘পবিত্র’ কোনো বিমূর্ত প্রতীক নয়; বরং ক্ষমতার অসমতায় সবচেয়ে নির্ভরশীল সত্তা। ‘রামের সুমতি’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘মেজদিদি’ এবং ‘ছেলেধরা’-র বিভিন্ন পরিস্থিতি দেখায়, শিশুকে ঘিরে প্রাপ্তবয়স্কদের ভয়, কর্তৃত্ব, মালিকানা, স্নেহ ও ভুলবিচার কীভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। শিশুর দৃষ্টিতে সমাজের প্রতিষ্ঠিত যুক্তি প্রায়ই অদ্ভুত হয়ে ওঠে। যে শাসন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে শৃঙ্খলা, তা শিশুর শরীরে অপমান; যে পারিবারিক স্বার্থ প্রাপ্তবয়স্কের কাছে যুক্তিযুক্ত, তা শিশুর কাছে বিচ্ছেদ; যে গুজব সমাজে দ্রুত সত্য হয়ে ওঠে, তা ‘ছেলেধরা’-য় কৌতুক ও আতঙ্কের মিশ্র নাটক সৃষ্টি করে।
শিশুচরিত্র ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে শরৎচন্দ্র পাঠকের নৈতিক অবস্থানও বদলে দেন। তিনি পাঠককে ক্ষমতাবানের আসন থেকে সরিয়ে এমন এক সত্তার পাশে বসান, যার পক্ষে নিজের বক্তব্যকে সামাজিকভাবে বৈধ করা কঠিন। ফলে ‘মায়া’ একটি নৈতিক-রাজনৈতিক কাজ করে—পাঠক যখন কেষ্ট, রাম বা অন্য দুর্বল শিশুর দিক থেকে ঘটনাকে দেখতে শেখে, তখন পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ভাষা আর নিরপেক্ষ মনে হয় না। এই শিল্পকৌশল তাঁর গল্পের পাঠযোগ্যতার বড় কারণ—বক্তব্যকে তত্ত্বের কাঠামোয় আবদ্ধ না রেখে অনুভবের বিন্যাস বদলে দেওয়া।
শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত আবেগ’-এর অভিযোগ পুরোনো। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পে আবেগ কী কাজ করে, তা না দেখে শুধু চোখের জলের পরিমাণ বিচার করলে শিল্পরূপের মূল কৌশল অদৃশ্য হয়। ‘মন্দির’-এর শুরুতে অপর্ণার শৈশব, দেবমন্দির ও পারিবারিক স্মৃতি এমনভাবে যুক্ত যে মন্দিরটি ধর্মীয় স্থাপত্যের চেয়ে ব্যক্তিসত্তার অংশ হয়ে ওঠে—“এই মন্দিরটি যে তাহারও বক্ষ-শোণিতের মত … সমস্ত কর্ম্ম ও খেলা-ধূলার মধ্যেও প্রমাণ করিতে বসিল।”³ ‘বক্ষ-শোণিত’ উপমাটি এখানে অলংকারমাত্র নয়। বস্তু, স্থান ও স্মৃতির মধ্যেকার সম্পর্ককে শরীরী করে তোলাই তার কাজ। অপর্ণার ধর্মবোধ কোনো বিমূর্ত শাস্ত্রজ্ঞানের ফল নয়; দৈনন্দিন পরিচর্যা, পিতার স্মৃতি, গন্ধ, ফুল, আলো ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসে তা গঠিত। অর্থাৎ শরৎচন্দ্র নৈতিক অনুভূতিকে ধারণার আগে অভিজ্ঞতায় স্থাপন করেন। এই পদ্ধতি তাঁর সামাজিক গল্পেও কাজ করে—পাঠক প্রথমে গফুরের ক্ষুধা অনুভব করে, পরে শোষণ বোঝে; প্রথমে কেষ্টের অপমান দেখে, পরে ‘গুরুজন’-এর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে।
‘আলো ও ছায়া’ শিরোনাম নিজেই শরৎচন্দ্রের নন্দনতত্ত্বের একটি সূত্র। তাঁর চরিত্ররা সম্পূর্ণ আলো বা সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়; প্রেমে অহং, স্নেহে অধিকার, ধর্মে নিষ্ঠা ও নিষ্ঠুরতা, সামাজিক সম্মানে ভণ্ডামি, বিদ্রোহে আত্মপ্রবঞ্চনা—বিপরীত শক্তি পাশাপাশি থাকে। এই দ্বৈততার কারণেই একাদশী বৈরাগী, ইন্দুমতী, বিজলী বা গফুরকে নীতিগল্পের চরিত্র বলে মনে হয় না। চরিত্রের আচরণ ভুল হলেও তার মানবিক ব্যাখ্যা থাকে; আবার সহানুভূতি পেলেই তার সব কাজ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। এই নৈতিক অনির্ণেয়তা শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় সরল গদ্যের আড়ালে থাকা জটিলতা।
‘মামলার ফল’ ও ‘ছেলেধরা’-র মতো গল্প তাঁর শিল্পের আরেকটি দিক সামনে আনে—কৌতুক, ভুলবোঝাবুঝি, সামাজিক অভিনয় ও কথ্যভাষার নাটকীয়তা। শরৎচন্দ্রের জগৎ কেবল কান্নায় পূর্ণ নয়; হাসিও সেখানে সামাজিক সত্য উন্মোচনের অস্ত্র। কথোপকথন-নির্ভর গতি, মুখের ভাষার স্বাভাবিকতা এবং ছোট ছোট আচরণগত বৈপরীত্য চরিত্রকে দ্রুত জীবন্ত করে। তাঁর ‘সরলতা’ তাই শিল্পহীন সহজতা নয়; পাঠকের সামনে ব্যাখ্যার ভার কমিয়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করার এক সচেতন গদ্যনীতি।
শরৎচন্দ্রের ভাষার আরেকটি লক্ষণীয় শক্তি হলো নৈতিক সিদ্ধান্তকে লেখকের সর্বজ্ঞ মন্তব্যে চূড়ান্ত না করে সংলাপ, অঙ্গভঙ্গি ও ক্ষুদ্র বস্তুগত ঘটনার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। জলভরা কলস, অনাহারী গরুর মুখ, কেষ্টর দরজার বাইরে ডাক, মন্দিরের ফুল—এসব বস্তু কাহিনির সাজসজ্জা নয়; চরিত্রের সামাজিক অবস্থাকে দৃশ্যমান করার সংকেত। ফলে পাঠককে আগে থেকেই বলা হয় না কে ন্যায়বান; বরং ঘটনাবিন্যাস তাকে নিজেই নৈতিক অবস্থান নিতে বাধ্য করে। এই পরোক্ষতা শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার সঙ্গে শিল্পের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রচনা করেছে—ভাষা সহজ, কিন্তু সেই সহজতার মধ্যে নৈতিক প্রতিধ্বনি দীর্ঘস্থায়ী।
শরৎচন্দ্রের মানবতাবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি—তিনি সামাজিক সমস্যাকে পরিসংখ্যান বা নৈতিক বক্তৃতায় দূরে সরিয়ে রাখেন না; তাকে ঘরের মধ্যে, শরীরের ক্ষুধায়, শিশুর কান্নায়, নারীর অপমানে, পশুর তৃষ্ণায় অনুভবযোগ্য করেন। এই পদ্ধতিতে অনুভূতি জ্ঞানের শত্রু নয়; বরং সামাজিক সত্য জানার একটি পথ। ‘মহেশ’-এ জলবণ্টন, জমিদারি কর্তৃত্ব ও সাম্প্রদায়িক দূরত্ব নিয়ে আলাদা রাজনৈতিক বক্তৃতা নেই, কিন্তু আমিনার জল না-পাওয়া এবং গফুরের অসহায়তা সেই কাঠামোকে আরও তীব্রভাবে বুঝিয়ে দেয়। ‘মেজদিদি’-তে পারিবারিক ক্ষমতার তত্ত্ব নেই, কিন্তু “আমিও মা” বাক্যটি কর্তৃত্বের নৈতিক বৈধতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিতর্কের দরজা খুলে দেয়।
তবে এই নন্দনের সীমাও আছে। বহু গল্পে সামাজিক অন্যায়ের বিকল্প হিসেবে শরৎচন্দ্র ব্যক্তিগত হৃদয়-পরিবর্তন, সহৃদয় আশ্রয়, ক্ষমা বা উন্নত সম্পর্কের সম্ভাবনায় আস্থা রাখেন। এতে প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ কখনো ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতায় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। জমিদারি, জাতপাত বা নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কেবল ‘ভালো মানুষ’ তৈরি করে দূর হয় না। ‘মহেশ’ ও ‘অভাগীর স্বর্গ’-এর মতো গল্প এই সীমা অতিক্রম করে, কারণ সেখানে চরিত্রের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা কাঠামোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট নয়। গফুর মহেশকে ভালোবাসে, তবু খাদ্য দিতে পারে না; কাঙালী মাকে ভালোবাসে, তবু সম্মানজনক সৎকার নিশ্চিত করতে পারে না। এখানেই শরৎচন্দ্রের করুণা সামাজিক প্রতিবাদে পরিণত হয়।
অতএব তাঁকে একদিকে সমাজ-সংস্কারক প্রচারক, অন্যদিকে নিছক হৃদয়াবেগের লেখক—দুইভাবেই সরলীকরণ করা উচিত নয়। তাঁর শিল্পের বিশেষত্ব হলো সামাজিক কাঠামোর নির্মমতাকে সম্পর্কের ক্ষুদ্র দৃশ্যে অনুবাদ করা। তিনি বিপ্লবের ভাষায় প্রতিষ্ঠান ভাঙেন না; বরং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অযোগ্যতা এমনভাবে প্রকাশ করেন যে পাঠকের কাছে তার ‘স্বাভাবিকতা’ আর অক্ষত থাকে না। এই নীরব অস্বীকৃতিই তাঁর গল্পের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদী শক্তি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নির্বাচিত ছোটগল্পসম্ভার নিবিড়ভাবে পড়লে স্পষ্ট হয়, তাঁর সাহিত্যিক কেন্দ্র ‘দুঃখী মানুষ’ নয়, বরং সম্পর্কের মধ্যে মানুষের মর্যাদা। ‘রামের সুমতি’ ও ‘বিন্দুর ছেলে’-তে শিশুকে ঘিরে পরিবার কীভাবে অধিকার ও স্নেহের সংঘাতক্ষেত্র হয়; ‘মেজদিদি’-তে মাতৃত্ব কীভাবে জৈবিক সীমা ছাড়িয়ে কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যত্নের নৈতিক দাবি তোলে; ‘বিলাসী’-তে জাতিগত বিধি প্রেমের স্বাধীনতাকে অপরাধে পরিণত করে; ‘অভাগীর স্বর্গ’-এ সামাজিক বর্জন মৃত্যুর পরও শরীরকে অনুসরণ করে; ‘মহেশ’-এ জমি, জল, ধর্ম, শ্রেণি ও জমিদারি ক্ষমতা মিলে ভালোবাসাকে কার্যকর হওয়ার ন্যূনতম উপকরণ থেকে বঞ্চিত করে। অন্যদিকে ‘দর্পচূর্ণ’, ‘আঁধারে আলো’, ‘হরিলক্ষ্মী’, ‘অনুরাধা’ প্রভৃতি গল্পে নারীর মর্যাদা, অপমান, আকাঙ্ক্ষা ও দাম্পত্যের নৈতিক সমতা আলোচনায় আসে। এই বহুমাত্রিক জগৎকে একমাত্র ‘করুণরস’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
এই পাঠের আলোকে শরৎচন্দ্রের ছোটগল্পের একটি নতুন ধারণাগত পরিচয় প্রস্তাব করা যায়—তাঁর গল্পগুলি দৈনন্দিনতার ক্ষুদ্র ন্যায়-অন্যায়ের আখ্যান। তাঁর চরিত্ররা আদালত, সংসদ বা তত্ত্বের ভাষায় ন্যায় দাবি করে না; তারা কখনো একবাটি ভাত, কখনো একঘটি জল, কখনো শিশুর আশ্রয়, কখনো ভালোবাসার সামাজিক স্বীকৃতি, কখনো সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকার চায়। এই ‘ছোট’ দাবিগুলিই আসলে মানুষের অস্তিত্বের মৌল শর্ত। ফলে ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত পরিসর তাঁর পক্ষে বিশেষ উপযোগী—বৃহৎ ইতিহাসের বদলে একটি সম্পর্ক, একটি অপমান, একটি ক্ষুধা বা একটি সিদ্ধান্তের ওপর আলো ফেলেই তিনি সমগ্র সামাজিক ব্যবস্থার ছায়া দৃশ্যমান করেন।
শরৎচন্দ্রের গল্পের সমাজ ও ভাষা ইতিহাসের দলিল এবং প্রত্যক্ষ জীবন-অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ। কিন্তু তাঁর স্থায়িত্ব শুধু দলিলমূল্যে নয়। তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড়ো অর্জন—তিনি পাঠককে বিচারকের আসন থেকে সরিয়ে সম্পর্কের দায়ে যুক্ত করেন। কেষ্টকে দেখার পর ‘গুরুজন’-এর সংজ্ঞা বদলায়; গফুরকে জানার পর দরিদ্র কৃষকের ক্রোধকে কেবল অপরাধ বলা কঠিন হয়; অভাগীর মৃত্যুর পর ধর্মীয় শুচিতার ভাষা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে; বিলাসীর পাশে দাঁড়ালে জাতের পবিত্রতা মানবিকতার চেয়ে ক্ষুদ্র মনে হয়। সাহিত্য এখানে শুধু সহানুভূতি শেখায় না—সহানুভূতির মধ্যে দিয়ে পুনরায় সামাজিক সত্যের মানচিত্র অঙ্কন করে।
এই কারণেই শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প আজও প্রাসঙ্গিক। সমাজের বহিরঙ্গ বদলেছে, কিন্তু মর্যাদা, যত্ন, সম্পদের অধিকার, সামাজিক স্তরবিন্যাস ও সম্পর্কের বৈধতা নিয়ে মানুষের দ্বন্দ্ব শেষ হয়নি। তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো সমাজের নৈতিক মান কেবল তার ঘোষিত আদর্শে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির সঙ্গে কেমন আচরণ করে। সেই দুর্বল মানুষের মুখে, শিশুর অভিমানে, নারীর প্রতিবাদে, গরিব কৃষকের অসহায়তায় এবং এমনকি অনাহারী পশুর চোখেও শরৎচন্দ্র সমাজের নৈতিক আয়না স্থাপন করেছিলেন। তাঁর ছোটগল্পের সত্য তাই আবেগের অতিরিক্ত আতিশয্য নয়; আবেগের ভিতর দিয়ে উপলব্ধ এক গভীর সামাজিক জ্ঞান।
১. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মেজদিদি’, শরৎ সাহিত্য-সংগ্রহ (অষ্টম সম্ভার), এম. সি. সরকার অ্যান্ড সনস্ প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৫৫, পৃ. ২৭৭।
২. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মহেশ’, শরৎ সাহিত্য-সংগ্রহ (ত্রয়োদশ সম্ভার), এম. সি. সরকার অ্যান্ড সনস্ প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৬০, পৃ. ৩১৪।
৩. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘মন্দির’, শরৎ সাহিত্য-সংগ্রহ (ষষ্ঠ সম্ভার), এম. সি. সরকার অ্যান্ড সনস্ প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৫৪, পৃ. ৩৬৮।