.jpg)
শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষে চারদিকে একটা বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সে বিষয়ে আপনারা অবহিত আছেন নিশ্চয়ই।
কবীর সুমন একটি সাম্প্রতিক ভিডিওতে বলেই ফেলেছেন—
“হিন্দু বাঙালি মুসলমান বাঙালিকে বাঙালিই বলতে চাইছে না… মুসলমান… এবং এ ব্যাপারে আমাদের গুরু কে? সবার আগে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি ‘শ্রীকান্ত’-তে লিখছেন, আজ বিকেলে অমুক মাঠে বাঙালিদের সঙ্গে মুসলমানদের ফুটবল খেলা আছে… হুজুর, এরপর আমার আর কোনো বক্তব্য নেই।”
শুধু কবীর সুমনই নন, এই আলোচনা নিয়ে সমাজমাধ্যমও বেশ সরগরম। সমানে চলছে তর্ক-বিতর্ক, কূটতর্ক এবং পালটা যুক্তি ও কুযুক্তি।
ভাবতে অবাক লাগে, সার্ধশতবর্ষে তাঁর লেখা ‘অভাগীর স্বর্গ’ বা ‘মহেশ’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গল্প নিয়ে আলোচনা চলছে না। চলছে না তাঁর সময়ের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস ‘পথের দাবী’ নিয়েও।
বরং বাঙালি মেতেছে তিনি কত ফুট, কত গজ সাম্প্রদায়িক ছিলেন—সেই নিয়ে।
প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক তপোব্রত ঘোষ উপরোক্ত বিবাদ নিয়ে জানাচ্ছেন—
“‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের প্রথম পরিচ্ছেদের পঞ্চম অনুচ্ছেদের প্রথম বাক্যে কিশোর শ্রীকান্ত উত্তমপুরুষীয় বয়ানে বলেছে, ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ্।’ (শরৎ সমিতি প্রকাশিত জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, খণ্ড ১, পৃ. ১)
ওই ইশকুলের মাঠটা কোথায়?
বছর দশেকের বালক শরৎচন্দ্র বঙ্গদেশের দেবানন্দপুর থেকে মামার বাড়ি বিহারের ভাগলপুরে চলে যান এবং সেখানে তাঁর প্রায় সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত থাকেন। শরৎচন্দ্রের মাতামহ কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন (‘শরৎ-পরিচয়’, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, পৃ. ১৩৫)—
‘শ্রীকান্তের প্রথম পর্বের আরম্ভেই আমরা দেখি যে, একটি ‘ফুট-বল ম্যাচে’র পরিসমাপ্তির পর মারামারি; এবং বিপন্ন শ্রীকান্তকে ইন্দ্রনাথ আততায়ীর হাত থেকে উদ্ধার করছে। এই মারামারির সময় সেখানে বর্তমান লেখকের উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য ঘটেছিল। ভাগলপুর “টয়েনবি স্পোর্টের” একটি খেলার শেষে এ ব্যাপারটি ঘটে এবং ইন্দ্রনাথের (রাজু) দল লাঠির জোরে বিপক্ষ পক্ষকে তাড়িয়ে দেয়।’
এই ‘টয়েনবি স্পোর্ট’-এর ‘টয়েনবি’ সম্ভবত George Toyenbee, যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ভাগলপুরের কমিশনার ছিলেন।
সুরেন্দ্রনাথ-প্রদত্ত এই তথ্যটিকে গোপালচন্দ্র রায় নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেই তাঁর ‘শরৎচন্দ্র’ (প্রথম খণ্ড—জীবনী, সাহিত্য সদন, ১৯৭৬, পৃ. ২৮) গ্রন্থে গ্রহণ করেছেন।
এখানে এই আনুষঙ্গিক তথ্যটিও সংযোজন করা যেতে পারে যে, ভাগলপুরে শরৎচন্দ্রের মাতামহ কেদারনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিবেশী রামরতন মজুমদারের পুত্র রাজেন্দ্রনাথের ওরফে রাজুর সঙ্গে শরৎচন্দ্রের বন্ধুত্ব হয়। এই রাজেন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে দু’বার দেখা দিয়েছেন—একবার ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বে ‘ইন্দ্রনাথ’ নামে, আর-একবার ‘শেষপ্রশ্ন’ উপন্যাসে ‘রাজেন’ নামে।
কিশোর শ্রীকান্ত যে-বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির দেউড়িতে হিন্দুস্থানি পেয়াদারা সুর করে তুলসীদাস পড়েন। এক পালোয়ানের উল্লেখও থাকে, যার নাম কিশোরী সিং। ওই বাড়িতে তথাকথিত বাঘের ওরফে ছিনাথ বহুরূপীর প্রাদুর্ভাবে শ্রীকান্তের পিসেমশাই পাশের বাড়ির গগনবাবুদের ‘মুঙ্গেরী গাদা বন্দুক’-টির কথা ভেবে ‘বন্দুক লাও’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।
মনে পড়ে যায়, পূর্বোক্ত ‘শরৎ-পরিচয়’ বইয়ে সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার জানিয়েছিলেন, ‘মুঙ্গের আর ভাগলপুর’ ‘বাঙালি-অধ্যুষিত দুটি কাছাকাছি শহর’; ‘পাটনা এবং কলকাতার ফ্যাসান প্রথমে আসে মুঙ্গেরে এবং তারপর রক্ষণশীল ভাগলপুর ধীরে ধীরে তার অনুকরণ করে।’ (পৃ. ১৩৯-৪০)
ওই ফুটবল ম্যাচের দিন ইন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার মাসখানেক পর এক রাত্রে শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথের সঙ্গে ডিঙিনৌকায় উঠে পড়ে। মাছ চুরি করে ঝাউবনের পাশ দিয়ে, মক্কাখেতের ভিতর দিয়ে ইন্দ্রনাথ এমনভাবে ডিঙিটাকে বের করে নিয়ে যাবে যে জেলেরা টেরও পাবে না। আর যদিও-বা পায়, শ্রীকান্তকে ‘আশ্বস্ত’ করে ইন্দ্রনাথ বলে—তাহলে ডিঙি থেকে লাফিয়ে পড়ে ডুবসাঁতার দিয়ে ‘সতুয়ার চড়া’-য় উঠে পড়লেই হবে। ভাগলপুরের গঙ্গাগর্ভ থেকে উত্থিত এই ‘সতীর চড়া’ লোকমুখে ‘সতুয়ার চড়া’ নামে বিখ্যাত ছিল।
মাছচুরির পর সত্যিই যখন জেলেরা টের পেয়ে পিছু নেয়, তখন ইন্দ্রনাথ ভুট্টাখেতের মধ্যে ডিঙি ঢুকিয়ে দেয়। বনের মধ্যে ক্যানেস্তারা পিটোনোর আওয়াজ পেয়ে চমকে-ওঠা শ্রীকান্তের প্রশ্নের উত্তরে ইন্দ্রনাথ জানায় যে, চাষিরা ক্যানেস্তারা পিটিয়ে খেত থেকে বুনো শুয়োর তাড়াচ্ছে। জেলেদের ফাঁকি দিয়ে ওদের ডিঙিনৌকা ভুট্টা-জনারের চড়ার পাশ দিয়ে ভেসে চলে।
আমি ইচ্ছে করেই শ্রীকান্তের বাসস্থানের স্থানিক সাংস্কৃতিক আবহ (locale) এবং শ্রীকান্ত-ইন্দ্রনাথের নিশীথ অভিযানের আঞ্চলিক ভূসংস্থান (topography)—এই দুটি দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এই কথাটায় পৌঁছোবার জন্যই তা করেছি যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ পাদে শরৎচন্দ্রের কৈশোরকালীন ভাগলপুরে বসবাসকারী মুসলমানরা প্রায় কেউই বাঙালি মুসলমান ছিলেন না; তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন বিহারি মুসলমান—নিজেদের মধ্যে উর্দুতে এবং স্থানীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে হিন্দিতে কথা বলতেন।
ফলত, এমনকি সর্বজ্ঞ কথকের প্রথমপুরুষীয় বয়ানেও নয়, বরং কিশোর শ্রীকান্তের উত্তমপুরুষীয় বয়ানে ভাগলপুরের ইশকুলের মাঠে ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের’ ফুটবল ম্যাচের উল্লেখটির মধ্যে মুসলমানকে ‘অপর’ করে রাখার জন্য শরৎচন্দ্রের কোনো হিন্দু এজেন্ডার কল্পনাকে কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!
এই প্রসঙ্গে লক্ষ করুন, ইন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথমবার শাহজির আস্তানায় গিয়ে শ্রীকান্ত হিন্দিতে কথা-বলা শাহজিকে অবাঙালি মুসলমান বলেই ভেবেছিল। আর ঠিক সেই কারণেই শাহজির সঙ্গে ইন্দ্রনাথের কথোপকথনে শ্রীকান্ত বিশেষভাবে লক্ষ করেছিল যে, ‘শাহজী হিন্দিতে কথা কহিলেও ইন্দ্র বাঙ্গলা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার করিল না।’
অর্থাৎ, অবাঙালি বিহারি মুসলমানদের সঙ্গে কথোপকথনে ইন্দ্রনাথ হিন্দিতে কথা বলে থাকলেও এখানে যে বাংলা বলছে, সেটাই শ্রীকান্তের নজর টানার কারণ।
একই ব্যাপার ঘটে ওই দিনই অন্নদাকে প্রথম দেখে শ্রীকান্তের প্রতিক্রিয়ায়—‘পরনে হিন্দুস্থানী মুসলমানীর মতো জামাকাপড়’, অথচ ‘পরিষ্কার বাঙ্গলায়’ অন্নদা কথা বলছেন!
শ্রীকান্তের এই উপর্যুপরি বিস্ময় থেকে এটাই প্রতিভাত হচ্ছে যে, ভাগলপুরে বাংলায়-কথা-বলা বাঙালি মুসলমান দেখতে শ্রীকান্ত অভ্যস্ত নয়।
আর-একটি কথা বলে এই প্রসঙ্গ আমি শেষ করব।
বাল্য থেকে কৈশোরে—বঙ্গদেশের দেবানন্দপুর থেকে বিহারের ভাগলপুরে—শরৎচন্দ্রের জীবনকে শ্রীকান্তের জীবন অনুসরণ করেছে। ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের গোড়ায় আমরা কিশোর শ্রীকান্তের ভাগলপুরের জীবনকে পাচ্ছি। এর আগেকার বালক শ্রীকান্তের বঙ্গদেশীয় জীবনকে পাওয়া যাবে ‘শ্রীকান্ত’ চতুর্থ পর্বের গোড়ায়। অর্থাৎ উপন্যাসের শেষাংশের গোড়া থেকে উল্টোমুখে উপন্যাসের প্রথমাংশের গোড়ায় শ্রীকান্তের জীবন এগিয়েছে তার বাল্য থেকে কৈশোরে।
শ্রীকান্তের সেই বাল্যবয়সে তার বন্ধু ছিল বাঙালি মুসলমান বালক গহর। তারা ছিল পাঠশালার বন্ধু। একই নদীর তীরে ক্রোশখানেকের ব্যবধানে দুই বন্ধুর বাড়ি। দুজনের মেলামেশায় কি হিন্দু শ্রীকান্তের বাড়ি থেকে কোনো বাধা ছিল? একেবারেই না!
গহরের বাবার একটা সেকেলে গাদাবন্দুক ছিল। সেটাকে নিয়ে নদীর ধারে, আমবাগানে, ঝোপঝাড়ে দুজনে পাখি মেরে বেড়াত। এমনকি—শ্রীকান্ত বলেছে, “ছেলেবেলা কতদিন তাহাদের বাড়িতে রাত কাটাইয়াছি,—তাহাদের মা মুড়ি গুড় দুধ কলা দিয়া আমার ফলারের জোগাড় করিয়া দিত।” (শরৎ সমিতি প্রকাশিত জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, খণ্ড ১, পৃ. ২৫৪)
এখানে একটি সূক্ষ্ম অনুপুঙ্খের সত্যনিষ্ঠ উল্লেখ বিস্ময়কর—এইজন্যই শরৎচন্দ্র বড় ঔপন্যাসিক। গহরের মা শ্রীকান্তকে কোনো রান্না-করা খাদ্য দিতেন না; রাত্রেও তিনি শ্রীকান্তের ‘ফলারের জোগাড়’ করে দিতেন।
শ্রীকান্তের হিন্দু অভিভাবকরা কেউ গায়ে পড়ে লোকাচারের এই নিষেধটুকু তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেননি, মুসলমান অভিভাবকরাও খুব সহজভাবে এই নিষেধটুকু মান্য করেছেন। নিশ্চয় বালক শ্রীকান্তও এটা লক্ষ করেছিল, নইলে তার স্মৃতিতে এটা থাকবে কেন? কিন্তু এর জন্য গহরের সঙ্গে শ্রীকান্তের বন্ধুত্বে কোনো চিড় ধরেনি। যদি তা ধরত, তাহলে দীর্ঘকাল অদর্শনের পর পরিণত বয়সে যখন তাদের পুনরায় দেখা হল, অমনি তাদের বন্ধুত্ব নিজের অন্তর্গত শক্তিতেই মধ্যবর্তী বিচ্ছেদকালকে মুহূর্তে অতিক্রম করতে পারত না।
আমি কেন বাঙালি মুসলমান পরিবারের সঙ্গে বালক শ্রীকান্তের এই হার্দ্য সংসর্গের কথাটা আপনাদের মনে করিয়ে দিলাম?
এই কারণে যে, কিশোর শ্রীকান্ত যখন ভাগলপুরের মুসলমানদের অবাঙালিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে খুব সরল স্বতঃস্ফূর্ততায় ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের’ ফুটবল ম্যাচের কথাটা বলবে, তখন অনুগ্রহ করে আপনাদের কৃত্রিম সেক্যুলারিজমের আপদটাকে শ্রীকান্তের উপর চাপিয়ে শরৎচন্দ্রের তথাকথিত হিন্দু এজেন্ডা আবিষ্কার করতে বসবেন না।
সেই ‘পরিচয়’-এর আমলের অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে হালের শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত শরৎচন্দ্রকে নিয়ে এক ধরনের highhandedness বুদ্ধিজীবী বাঙালির অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। আমি বুদ্ধিজীবী নই। তাই আসন্ন শরৎ-সার্ধশতবর্ষপূর্তি (সেপ্টেম্বর ১৮৭৬—সেপ্টেম্বর ২০২৬)-কে স্মরণে রেখে এবং কবীর সুমনকে উপলক্ষ্য করে শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে পুনরাবৃত্ত একটি অন্যায় অভিযোগের ভিত্তিহীনতা দেখানোর চেষ্টা করলাম।”
এখানে আরও সব কূটতর প্রশ্ন আসতে লাগল। তন্মধ্যে একটি হল—
“প্রশ্নটি হল, ভাগলপুরে সংঘটিত ওই ফুটবল ম্যাচের এক পক্ষ যদি বিহারি মুসলমানই হয়, তো কেন শ্রীকান্ত ‘বাঙ্গালী ও বিহারি ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ্’ লিখল না?”
এর উত্তরে তপোধীর লিখলেন—
“ভাগলপুরের মুসলমানরা বিহারি হলেও ভাগলপুরের বিহারীরা তো সবাই মুসলমান ছিলেন না! বহু বিহারি হিন্দুও ছিলেন! সেক্ষেত্রে শ্রীকান্ত যদি ‘বাঙ্গালী ও বিহারি ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ্’ লিখত, তাহলে ওই ম্যাচের এক পক্ষের মুসলমান exclusivity তো প্রকাশ পেত না!
অন্য একটি সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তরও আগাম দিয়ে রাখি—কেন শ্রীকান্ত তাহলে ‘হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ্’ লিখল না?”
এখানে তিনি নিজেই নিজের যুক্তিকে কর্তন করে জানাচ্ছেন—
“আমার অনুমান এই যে, ভাগলপুরে খ্রিস্টান চার্চকে কেন্দ্র করে তো বটেই, উপরন্তু ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত CMS (Church Mission Society) হাইস্কুলকে কেন্দ্র করে জড়ো-হওয়া অল্পসংখ্যক বাঙালি খ্রিস্টান পরিবার থেকে আসা কিছু ছাত্রেরও ওই ‘টয়েনবি স্পোর্ট’-এর আয়োজিত ফুটবল ম্যাচের বাঙালি পক্ষে অংশগ্রহণ করা একেবারে অসম্ভব নাও হতে পারে! যদি তা-ই হয়, তো শ্রীকান্ত কী করে ‘বাঙ্গালী’ না লিখে ‘হিন্দু’ লেখে বলুন?
আর এই কারণেই ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত সেন ও টমসনের করা ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের ইংরেজি অনুবাদে যে ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান’-কে ‘Hindu and Moslem’ করে দেওয়া হয়েছিল—অনুবাদকদ্বয়ের সেই খোদকারি কিছুতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
তখন শরৎচন্দ্র জীবিত ছিলেন। ভাগলপুরের context-এ ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান’ কথাটার স্থানিক তাৎপর্য যদি অনুবাদকদ্বয় না ধরতে পেরে থাকেন, তো শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে ব্যাপারটা বুঝে নেওয়াই কি তাঁদের কর্তব্য ছিল না?
অন্যদিকে, কেউ যদি উল্টোদিক থেকে মনে করেন যে, শরৎচন্দ্রের জীবদ্দশায় যখন এই অনুবাদ হয়েছে, তখন এই ‘Hindu and Moslem’ কেনই-বা শরৎচন্দ্রের অনুমোদিত অনুবাদ বলে ধরা যাবে না? আমার বক্তব্য হল, সেক্ষেত্রে ১৯২২-এর পরবর্তী ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের সংস্করণে শরৎচন্দ্র কি তাঁর অনুমোদিত ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে সংগতিবিধান করে মূল বাংলা পাঠও সংশোধন করতেন না?
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তিনি তা করেননি। বস্তুত, ১৩২২-এর মাঘ সংখ্যার ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় সূচিত ‘শ্রীকান্তর ভ্রমণ-কাহিনী’ থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্রের জীবদ্দশায় প্রকাশিত ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের সংস্করণগুলির সর্বত্র ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান’ পাঠই রয়েছে।”
তথ্যসূত্র হিসাবে তিনি উল্লেখ করেছেন—
১. সুরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়-প্রদত্ত তথ্য;
২. উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত ভাগলপুরের মুসলমানদের অবাঙালিত্ব সম্পর্কে একটি তথ্য;
৩. ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বের ইংরেজি অনুবাদ;
৪. ওই অনুবাদেরই একটি পৃষ্ঠা, যার শেষ অনুচ্ছেদের গোড়ায় রয়েছে ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান’-এর অনুবাদ ‘Hindu and Moslem’; এবং ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘শ্রীকান্তর ভ্রমণ-কাহিনী’-র একটি পৃষ্ঠা, যার দ্বিতীয় স্তম্ভের প্রথম অনুচ্ছেদে রয়েছে ‘বাঙ্গালী ও মুসলমান’ ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ্’।
তপোব্রত ঘোষ একজন তন্নিষ্ঠ গবেষক। তাঁকে কাবু করা কঠিন। কিন্তু দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধূমকর্দমে ভরে ওঠা বিষাক্ত আবহাওয়ায় হুজুকে ও গুজবে ভেসে চলা অর্ধমূর্খ বাঙালিকে এই বিতর্ক সহজেই টলিয়ে দিয়েছে।
সম্পূর্ণ রচনাবলি না পড়েই আমরা একটি-দুটি শব্দের [যবন] সাহায্যে আজ অনায়াসে বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সাহিত্যিককেও বানিয়ে ফেলছি সাম্প্রদায়িক। শরৎবাবু তো কোন ছাড়!
কথ্য ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলায়। বদলায় লেখার ভাষাও। এক সময় সাহিত্যে ‘মাগী’ শব্দটি কোনো গালাগালি না বুঝিয়েও, নিছক মহিলা বোঝাতে ব্যবহার করা হত। ‘বেশ্যা’ বা ‘বেবুশ্যে’, ‘ভাতার’ ইত্যাদি শব্দ আজ আর কেউ লিখবেন না হয়তো; বদলে লিখবেন ‘যৌনকর্মী’ বা ‘রক্ষিতা’। তাই বলে তখনকার সাহিত্যে তো ওই শব্দগুলো ওই সময়কালকেও বোঝাত। বোঝাত সে সময়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্কের নানাবিধ তাৎপর্যকেও।
সমাজ তো কোনোদিনই একরৈখিক নয়।
আমরা সাহিত্যের কাছে যাই কেবল নীতিমালা শেখার জন্য নয়, যাই সত্যের মুখোমুখি হতেও। যে মানুষ ‘বাঙালি’ ও ‘মুসলমান’ শব্দের ব্যবহার লিখছেন, তিনি কিন্তু সেই সময়ের সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত কথ্য ভাষার একটা দর্পণও আমাদের সামনে তুলে ধরছেন।
এটুকু যদি একজন পাঠক না বুঝতে চান, তাহলে বুঝে নিতে হবে তিনিও ওই ঘৃণার রাজনীতির আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছেন স্বেচ্ছায়। সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কাছে গুরুত্বহীন।