
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, ননী ভৌমিক, বিমলচন্দ্র ঘোষ, মহাশ্বেতা দেবী, বিষ্ণু দে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বহু কবি ও লেখকের প্রাথমিক পরিচয় বামপন্থী কবি ও লেখক হিসেবে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো, যারা সাম্যবাদ বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী, তারা কিছু কবি ও লেখককে বামপন্থী বলে স্বীকৃতি দেয়। বহু ঘোষিত বামপন্থী কবি ও লেখক আছেন, যাঁরা স্বগর্বে নিজেদের বামপন্থী বলে পরিচয় দেন এবং যাঁরা সত্যি সত্যিই সমাজের অসাম্যকে নিজেদের লেখায় তুলে ধরেন। কিন্তু বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বীকৃতি পাওয়ার বাইরেও এক শ্রেণির কবি ও লেখক আছেন, যাঁরা অঘোষিত চরম বামপন্থী মানবতাবাদী। তাঁরা তাঁদের লেখার মাধ্যমে তাঁদের জাত-গোত্র চিনিয়ে দেন। তাঁরা রাজনৈতিক দলগুলোর স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী নন; তাঁদের লেখাই তাঁদের পরিচয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তেমনই একজন মানবতাবাদী বামপন্থী লেখক।
স্বভাবে ও চরিত্রে শরৎচন্দ্র ছিলেন এক বাউন্ডুলে, ভবঘুরে মানুষ। তাঁর এই যাত্রাপথ ছিল দিশাহীন, কণ্টকাকীর্ণ। এই যাত্রাপথে ফকির-দরবেশ, সর্বস্বান্ত কৃষক, দোর্দণ্ড প্রতাপ জমিদার থেকে আরম্ভ করে সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা অবহেলিত বারবনিতার জীবনও তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনচর্চা, তাঁদের জীবনের শোক-দুঃখ-কষ্ট, তাঁদের জীবনের অসহায়তা, মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা ও বিদ্বেষ তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন। আর সেই সব অনুভবই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা বোঝার জন্য তাঁকে নিজেকে বামপন্থী হিসেবে প্রচার করার প্রয়োজন হয়নি। নিপীড়িত মানুষের দুর্দশাই তাঁর লেখায় যেভাবে বাণীময় হয়ে উঠেছে, সেটাই তাঁর বামপন্থী পরিচয়।
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ভূমিকায় তিনি যখন লেখেন, “সংসারে যারা শুধু দিলে, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল উপেক্ষিত, মানুষ যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না, নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা ভেবেই পেল না সমস্ত থেকেও কেন তাদের কিছুতেই অধিকার নেই, এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে, এরাই পাঠালে আমাকে মানুষের কাছে মানুষের নামে নালিশ জানাতে। তাই আমার কারবার শুধু তাদের নিয়ে।” এই লেখার মধ্য দিয়ে তিনি সামগ্রিক মনুষ্যসমাজের স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে বঞ্চনা ও না-পাওয়ার যন্ত্রণা তুলে ধরতে চেয়েছেন, যা তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। অথচ কিছু বুদ্ধিজীবী, বিদগ্ধ পাঠক, লেখক ও সমালোচকের চোখে তিনি কেবলমাত্র নারীবাদী, নারীমুক্তি ও নারীস্বাধীনতার লেখক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকলেন। তিনি সমগ্র সমাজব্যবস্থার অসাম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে সারা জীবন যে লেখা চালিয়ে গেলেন, তার জন্য তথাকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কাছে কোনও দিনই স্বীকৃতি পাননি।
এই স্বীকৃতি না-পাওয়ার আর একটি কারণ হলো, শরৎচন্দ্র ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও সুভাষচন্দ্র বসুর অনুগামী। তাঁদের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের তিনি ছিলেন কট্টর সমর্থক। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ব্রিটিশবিরোধিতার চেয়ে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্রশক্তির পাশে থাকতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। সে জন্য একটা সময় তাঁরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য গান্ধীজি বা নেতাজির অহিংস কিংবা সহিংস কোনও আন্দোলনেই পাশে ছিলেন না। তাই শরৎচন্দ্রও তাঁর জীবৎকালে বামপন্থীদের সমর্থন বা আশীর্বাদধন্য ছিলেন না।
শরৎচন্দ্রের জীবনচর্চা ও জীবনদর্শনই ছিল কমিউনিস্টসুলভ। পথে-প্রান্তরে, সমাজের প্রতিটি কোণে পড়ে থাকা অনাচার, অসাম্য এবং বিচারের নামে অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন। সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে কলম ধরেছেন, তৎকালীন আমলে ভারতীয় সাহিত্যে একমাত্র মুন্সী প্রেমচাঁদ ছাড়া আর কারও লেখায় আমরা তা দেখতে পাই না।
তিনি যখন কলম ধরেছেন, তখন সবে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা গদ্যকে ঘষেমেজে রাজকীয় অলঙ্কারে ভূষিত করে বিদায় নিয়েছেন। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ তখন স্বমহিমায় বিরাজমান। তাঁর দীপ্তিতে চারদিক ভাস্বর। বঙ্কিমচন্দ্র যদি বাংলা ভাষাকে রাজভোগ হিসেবে উপস্থিত করে থাকেন, তবে রবীন্দ্রনাথ তাকে দেবভোগ হিসেবে পরিবেশন করলেন। আর শরৎচন্দ্র তাঁর লেখাকে আদিজ চণ্ডালের, পথের পাশে পড়ে থাকা মানুষের, লঙ্গরখানার ভোগ হিসেবে তুলে ধরলেন। অসহায় মানুষ, ক্ষুধার্ত মানুষ দুহাত ভরে সেই ভোগ পরমান্ন হিসেবে গ্রহণ করল।
তাই যখন ভারতবর্ষ রবির কিরণে আচ্ছন্ন, তখনও সারা ভারতবর্ষে সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত, সবচেয়ে বেশি পঠিত ও সবচেয়ে বেশি আলোচিত লেখক থেকে কথাশিল্পীতে উন্নীত মানুষটির নাম শরৎচন্দ্র।
কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, হো চি মিন কিংবা মাও জে দংরা কৃষক, ছোট কৃষক বা ক্ষেতমজুর থেকে সর্বহারা কারখানার শ্রমিকে বিবর্তনের যে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেই তত্ত্বই শরৎচন্দ্র সহজ-সরল ভাষায় এক ‘ইতর প্রাণী’ ‘মহেশ’ গল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। জমিদার, জোতদার অদ্ভুত ঋণজালে গ্রামীণ কৃষককে অজগর সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। সেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা থাকে না গরিব কৃষক, ক্ষেতমজুরের। নিজের রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করা ফসল, এমনকি খড়-বিচালিটুকুও জোতদারের ঘরে তুলে দিতে হয় সুদে-তস্য-সুদের ঋণজালে জড়িয়ে। এভাবেই জমিদারের আর্থিক ও ধর্মীয় অত্যাচারে সর্বস্বান্ত গফুর আল্লাহর কাছে বিচার চেয়ে, গভীর রাতে মেয়ে আমিনার হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে শহরে সুতাকলের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার যে ছবি এঁকেছেন, সেই ছবিতেই ধরা পড়েছে সমাজতন্ত্রের গূঢ় জটিল তত্ত্বকথা। এভাবেই যুগে যুগে কৃষক তার চাষের ক্ষেতটুকু হারিয়ে প্রথমে সর্বস্বান্ত ক্ষেতমজুর, তারপর জমি থেকে বিতাড়িত কলকারখানার শ্রমিক বা দিনমজুরে পরিণত হয়।
শরৎচন্দ্র যদি সারা জীবনে ‘মহেশ’ বা ‘অভাগীর স্বর্গ’-এর মতো দু-একটি লেখা লিখে কলম তুলে রাখতেন, তাহলেও তিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় চির-অমর হয়ে থাকতেন। অথচ আমাদের দেশের পণ্ডিত ব্যক্তিরা অনুবাদ থেকে তস্য-অনুবাদ হওয়া ম্যাক্সিম গোর্কি, জর্জ অরওয়েল, ব্রেখট, গ্যাব্রিয়েল মার্কোস, লু স্যুন বা নোয়াম চমস্কির মতো লেখকদের দু-চারটে বিদেশি বই পড়ে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে উদ্বাহু হয়ে ওঠেন। তাঁরা শরৎসাহিত্যকে মেয়েলি, নারীবাদী সাহিত্য বলে অচ্ছুত করে রাখেন। কিন্তু সেই সাহিত্যের ভিতরে খেটে-খাওয়া মেহনতি মানুষের যে ঘাম ও রক্তের সম্পর্ক আছে, আজ তা সর্বজনস্বীকৃত। তাই আজ শরৎচন্দ্রের জন্মের দেড়শো বছর পূর্তিতে এসে বাঙালি তাঁকে নতুনভাবে জানার ও বোঝার চেষ্টা করছে। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যেও বহু হিরে, মণি-মাণিক্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শরৎচন্দ্রের রচনায় আমরা সেরকমই বহু মণি-মাণিক্যের খোঁজ পাই, যে মণি-মাণিক্যের পিছনে অনেক মেহনতি মানুষের রক্ত ও ঘামের সম্পর্ক।
‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে তিনি যখন ইন্দ্রনাথের মুখ দিয়ে বলেন, “মড়ার আবার জাত থাকে নাকি”, তখন আমরা তাঁর মধ্যে এক আকাশ উদারতা প্রত্যক্ষ করি। যে উদারতা, যে সংস্কারমুক্ত চিন্তাভাবনা বহুক্ষেত্রে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা কৃষক-শ্রমিকের লড়াইয়ের কথা বলি, কথা বলি আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে। অথচ পৃথিবীর যে অর্ধেক আকাশ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পর্দার আড়ালে থেকে যায়, তাদের সম্বন্ধে কথা বললে তাকে নারীবাদী আখ্যা দিই। শরৎচন্দ্র সমাজের সেই উপেক্ষিত, বঞ্চিত, শোষিত নারীর স্বাধীনতা, নারী-মুক্তি ও নারীর অব্যক্ত প্রেমকে তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তৎকালীন সমাজে দাঁড়িয়ে কমললতার ভিন্নধর্মী যুবকের প্রতি নিরুক্ত ভালোবাসাকে প্রকাশ করার সাহস বলিষ্ঠ বামপন্থী চিন্তার ফসল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ভারতবর্ষের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার মানুষজন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার চেয়ে নাৎসি শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির পাশে দাঁড়ানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তখন শরৎচন্দ্র ভারতের মুক্তির চিন্তায় ‘পথের দাবী’ লিখছেন। যে বই ‘আনন্দমঠ’-এর পর বাংলার বিপ্লবীদের হাতে রেড বুক হয়ে উঠেছিল। ‘পথের দাবী’ও প্রকাশের শতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে। আজ সময়ের আহ্বানে সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে আমাদের এক-একজন সব্যসাচী হয়ে উঠতে হবে। নচেৎ, এই ধর্মান্ধ, ঘৃণা-ছড়ানো যে সংস্কৃতি আমাদের চারপাশে বেড়ে উঠছে, তা আমাদের ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যাবে।
আসলে শরৎচন্দ্র চিন্তায়-চেতনায় সম্পূর্ণ প্রগতিবাদী, মুক্তচিন্তার মানুষ হয়েও বাংলার বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কাছে কখনও নিজের লোক হতে পারেননি। তিনি যেমন সমাজের অন্ত্যজ লোকেদের নিয়ে লিখেছেন, নিজেও অন্ত্যজ হয়ে থেকেছেন। ঠিক যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভারতবর্ষের বামপন্থী মানুষদের কাছে কখনও বামপন্থী হতে পারেননি। তাঁরা চিলি কিংবা ভেনেজুয়েলা, কিউবা কিংবা রাশিয়ার কোনও লেখকের বই প্রচার ও প্রকাশে যত আগ্রহী, তত আগ্রহী কোনও কালেই ছিলেন না শরৎচন্দ্র কিংবা বিদ্যাসাগরের প্রচার ও প্রসারে। আস্তে আস্তে বামপন্থীদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসছে। তাঁরা বুঝতে পারছেন, ঘরের দেবতাকে বাইরে রেখে বিদেশি লেখক, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের সাধারণ মানুষ আর নিচ্ছেন না। সে জন্যই বামপন্থীদের ঘরের বামপন্থীদের দিকে দৃষ্টি পড়েছে। তাই অঘোষিত বামপন্থী শরৎচন্দ্র আজ লেখায় ও আলোচনায় উঠে আসছেন।