এই বছরটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সার্ধশতবর্ষ ও সেই সঙ্গে শরৎচন্দ্রের লেখা "পথের দাবী" উপন্যাসেরও শতবর্ষ। অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যেরও এবারে শতবর্ষ। পুরোগামী পত্রিকার এই বিশেষ সংখ্যাটি এইসব কিছুর স্মরণে পরিকল্পিত।
শরৎচন্দ্রকে পাঠক প্রধানত চিনেছে তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় পারিবারিক, সামাজিক উপন্যাসগুলির সূত্রে, যেগুলির মধ্যে প্রথমেই রয়েছে দেবদাস ( যা নিয়ে ৩টি প্রজন্মের অভিনেতাদের একাধিক ভাষায় সিনেমা হয়েছে), এছাড়াও চরিত্রহীন, রামের সুমতি, বিন্দুর ছেলে, পল্লীসমাজ, দত্তা, গৃহদাহ, বড়দিদি জনপ্রিয়তার নিরিখে কম যায়না। তবে তাঁর লেখা শ্রীকান্ত নামক ৪টি পর্বে বিধৃত খানিকটা আত্মজৈবনিক উপন্যাসের সিরিজটি সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল পাঠকের মনে। বলতে দ্বিধা নেই এখন যাকে TRP বলা হয়, অর্থাৎ জনপ্রিয়তার মাপকাঠি, তাতে তিনি তাঁর অগ্রজ রবি ঠাকুরের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন সাধারণ পাঠকদের দরবারে।
আসলে সাধারণ ঘরের চেনাজানা মানুষ, তাদের জীবনের সুখ দু:খ, সমাজের কুশ্রী দিক, নারীর অবমাননা ও আত্মসম্মানের জন্য লড়াই, পুরুষনারীর আন্তর্সম্পর্ক ও টানাপোড়েন,গভীর ট্র্যাজেডি---- অর্থাৎ যে যে বিষয়গুলি আমাদের পাঠকমনকে নাড়া দেয়, পাঠক যার সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন, সে সবই রয়েছে শরৎচন্দ্রের বিপুল সাহিত্য সম্ভারে।
তাঁর সৃষ্ট কিছু চরিত্র অমর হয়ে গেছে, যেমন অবশ্যই দেবদাস,যে আজো ব্যর্থ প্রেমের প্রতীক হিসেবে উল্লেখিত হয়, রয়েছে শ্রীকান্ত, যে অনেকটাই যেন স্বয়ং শরৎচন্দ্র, আছে ইন্দ্রনাথ, সুরেশ প্রমুখ।আর রয়েছে অসাধারণ কিছু নারীচরিত্র --- অন্নদা, রাজলক্ষ্মী, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, অচলা,অভয়া, কমললতা, সাবিত্রী। লক্ষণীয় যে শরৎসৃষ্ট বহু নারীচরিত্রই সামাজিক মানদন্ডের নিরিখে প্রশংসনীয় নয়। কিন্তু সেই আরোপিত নীতিবোধের বাইরে তাদের মানুষ হিসেবে যে বেদনার্ত জীবন, যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দেখিয়েছেন শরৎচন্দ্র, তা বাংলা উপন্যাসে নারীর উপস্থাপনাকে সমৃদ্ধ করেছে নি:সন্দেহে।
তবু তিনি যখন খ্যাতির শীর্ষে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লিখবেন রাজনৈতিক উপন্যাস পথের দাবী, সেটি খুব বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচীকে তিনি তৈরি করেছিলেন বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর আদলে এবং এটা সহজবোধ্য যে উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব। তাই এই বই লেখার জন্যে এত জনপ্রিয় লেখককেও রাষ্ট্রশক্তি রেহাই দেয়নি। বইটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ,সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করা বা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিন্তু শরৎচন্দ্র একটি শব্দও বদলাননি। বস্তুত শতবর্ষের আলোকে এই বইটির সূত্রেই পাঠক অন্য এক শরৎচন্দ্রকে নতুন করে চিনছে, যিনি শুধুই বেদনার কাহিনি লেখেননি। শরৎচন্দ্র সম্পর্কে আরেকটি কথাও প্রণিধানযোগ্য ----- যে নারীদের তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের অনেককেই যথা অর্থে empowered বলা যেতে পারে, কারণ শত দু:খ, বঞ্চনা, অবমাননা পেরিয়ে তাঁরা নিজেদের মাথা উঁচু করে লড়াই করেছেন। শরৎচন্দ্র তাই দেড়শো বছর পেরিয়েও আজো এত প্রাসঙ্গিক।
তাঁর অর্ধশতাব্দী অনুজ সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনকাল মাত্র ২১ বছরের। কিন্তু সেইটুকু সময়েই যা সৃষ্টি করে গেছেন, তাতে তাঁর সমকালে তো বটেই আজো আলোড়ন ওঠে পাঠকমনে। বামপন্থী এই তরুণ কবি লিখেছেন কালজয়ী কবিতা -- যেমন অবাক পৃথিবী, বিদ্রোহ, রানার, আঠারো বছর বয়স। প্রতিটি কবিতায় এসেছে অসহায়, নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের জীবনের কথা।অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের দাবী কবিতার ছত্রে ছত্রে ধ্বণিত হয়েছে।
তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় : শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণ(সমাজ ও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে অবস্থান), ক্ষুধা ও দারিদ্র্য(দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর ও নিম্নবিত্ত জীবনের হাহাকার),বিপ্লব ও প্রতিবাদ(পরাধীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ডাক),মানবিকতা (যুদ্ধবিরোধী চেতনা ও নতুন এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন)।
শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে ছিল তাঁর দৃঢ় অবস্থান, দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণি বৈষম্য, চেয়েছেন মানবতার জয়। অসুস্থতা,অর্থাভাব থাকলেও লেখায় তিনি সর্বদা লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তাই সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি।
সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। সুকান্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘের পক্ষে আকাল (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।
এভাবেই মাত্র ২১ বছরের ছোট্ট জীবনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা কবিতার এক অনন্য শিল্পী। তাই তাঁর লেখা পঙক্তি যেমন - "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি", "এত বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ, দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ", "রানার রানার ভোর তো হয়েছে আকাশ হয়েছে লাল, আলোর স্পর্শে কেটে যাবে কবে এই দু:খের কাল"---- হয়ে উঠেছে সর্বকালের সর্বহারা মানুষদের যন্ত্রণার কথা,আর সেই দু:খ পেরিয়ে যাবার আশার বাণী।
বাংলা সাহিত্যের এই দুই অসামান্য শিল্পীকে পুরোগামী প্রণতি জানায়।।
সম্পাদক
পুরোগামী পত্রিকা
২০২৬