
লেখার শুরুতেই একটা স্বীকারোক্তি করে নেওয়া ভালো। আমি কবিতার নিয়মিত পাঠক নই এবং কবিতার সমঝদারও আমাকে বলা যায় না। তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য কত বড়ো মাপের কবি, সে বিচার করার সাধ্য আমার নেই। কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে কবিতার মাধ্যমেই আমার আবাল্য পরিচয় এবং যৌবনের বিদ্রোহের ভাষা তাঁর কবিতাতেই খুঁজে পেয়েছিলাম।
সুকান্তের কবি-জীবনের ব্যাপ্তি মাত্র সাত-আট বছরের। তাঁর কবিতার প্রথম প্রকাশ সম্ভবত ১৯৪০ সালের আশপাশে। আর ১৯৪৭-এ তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি। সুকান্তের জীবিতকালে তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সুকান্ত-কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ এবং সুকান্ত-কাব্যচর্চা, দুটোই ঘটেছে সুকান্ত-মরণোত্তর পর্বে। তাঁর জীবনপর্বের সময়টা ইতিহাসের এক সংঘাতময় কাল। দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্বে মানুষের সমাজজীবনে, চিন্তায়, মননে, সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে একটা টালমাটাল চলেছিল। ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রাম মহাত্মা গান্ধীর শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহের গণ্ডি অতিক্রম করে সশস্ত্র বিদ্রোহের বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। অন্যদিকে সোভিয়েত রাষ্ট্রের উত্থানে বলশেভিজমের ভয়ে ব্রিটিশ রাজ সদা ত্রস্ত। কানপুর ষড়যন্ত্র (১৯২৪), মীরাট ষড়যন্ত্র (১৯২৯) ইত্যাদি মামলায় সদ্যগঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দকে ব্রিটিশ সরকার আটক করলেও, জনসাধারণের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ রুদ্ধ করা যাচ্ছে না। জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি কলে-কারখানায় শুরু হয়েছে ধর্মঘট-আন্দোলন।
এদিকে আর্থিক মন্দায় মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। বেকারত্ব ও মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপে মধ্যবিত্তের জীবন ভারাক্রান্ত। দারিদ্র্য ও অস্বচ্ছলতা গ্রাস করছে প্রাত্যহিক জীবনের সকল সুষমা। মূল্যবোধের ক্রমাবনতিতে মধ্যবিত্ত সমাজ জীর্ণ। বিপরীতে উন্নত এক সমাজব্যবস্থা নূতন এক জীবনবোধের সন্ধান দিয়েছে। বাংলার ‘প্রগতি সাহিত্য’ তখন নূতন এই জীবনবোধের সঞ্চালনে প্লাবিত। সুকান্ত এই ‘প্রগতি সাহিত্য গোষ্ঠীর’ সম্ভবত কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন,
“কলেজের বন্ধু মনোজ একদিন জোর ক’রে আমার হাতে একটা কবিতার খাতা গছিয়ে দিল। প’ড়ে আমি বিশ্বাসই করতে পারি নি কবিতাগুলো সত্যিই তার চোদ্দ বছর বয়সের খুড়তুতো ভাইয়ের লেখা। শুধু আমি কেন, আমার অন্যান্য বন্ধুরা, এমন কি বুদ্ধদেব বসুও কবিতার সেই খাতা প’ড়ে অবাক না হয়ে পারেন নি… সে সব কবিতা পরে ‘পূর্বাভাস’-এ ছাপা হয়েছে। ” (সুকান্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত বিচিত্রা)।
সুকান্তের জেঠতুতো দাদা (কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সহপাঠী- লেখক) মনোজ ভট্টাচার্য লিখেছেন, “যখন তার কবিতা ‘একদিন আমার জীবনে বসন্ত এসেছিল’ ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো—সুকান্তর সে কি আনন্দ! কাব্য-জীবনের প্রথম স্বীকৃতি। ” সম্ভবত ‘ঘুম নেই’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘অবৈধ’ কবিতাটি উল্লেখ করা হয়েছে—
আজ মনে হয় বসন্ত আমার জীবনে এসেছিল
উত্তর মহাসাগরের কূলে
আমার স্বপ্নের ফুলে
তারা কথা কয়েছিল
অস্পষ্ট পুরনো ভাষায়।
২
কবি-বন্ধু অরুণাচল বসু তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “পৃথিবীর সকল প্রাণবান কবিদের মতেই সুকান্তরও ছিলো সুন্দরের প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্রকৃতি বা মানুষ, যেখানেই হোক, সুন্দরের দেখা পেলে সে অভিভূত, উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত। কিন্তু তার লেখায় সেদিকটা বড় না-হয়ে যেটা বড় করে ফুটেছে তা হলো অভাবী মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর তার মুক্তির জন্য সংগ্রামের কঠিন পণ। কারো কাছে প্রিয়, কারো কাছে অপ্রিয় তার সেইসব ক্ষুব্ধ পংক্তিই বেশি করে ছড়িয়েছে চারদিকে। …তাই এর আড়ালে বালুর তলায় স্রোতোধারার মতো প্রায় চাপা পড়ে থেকেছে তার সেই অপরূপ সৌন্দর্য-কোমল স্বপ্ন-মুগ্ধ মনটি।
তবু পৃথিবীর রূপ-রস-সৌরভে বিমোহিত তার ‘আশ্চর্য নতুন চোখে’র চাহনি একেবারে লুকিয়ে থাকার নয়। একটু কান পেতে, চোখ মেলে, ছুঁয়ে দেখলেই এই দিকটিও আমাদের আচমকা আনন্দের মধুর সৌরভে ভরিয়ে দেবে। ”(*আশ্চর্য নতুন এক চোখে, * অরুণাচল বসু, সুকান্ত বিচিত্রা)।
এই “সৌন্দর্য-কোমল স্বপ্ন-মুগ্ধ মন” সুকান্ত কিন্তু আজীবন বহন করে গেছেন। যৌবনে, সুকান্ত যখন লিখছেন, “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন”, তখনও তাঁর মন থেকে মুছে যায়নি নির্জনতার প্রতি আকুতি। সুহৃদ অরুণাচল বসুর মা’কে লেখা একটা চিঠিতে সুকান্ত লিখছেন, “বাস্তবিক, আমি কোথাও চলে যেতে চাই, নিরুদ্দেশ হয়ে মিলিয়ে যেতে চাই—কোনো গহন অরণ্যে কিংবা অন্য যে-কোনো নিভৃততম প্রদেশে; যেখানে কোনো মানুষ নেই, আছে কেবল সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট-মনা হিংস্র আর নিরীহ জীবেরা, আর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। ” (সুকান্ত সমগ্র, সারস্বত লাইব্রেরী)।
সুকান্ত চল্লিশের দশকের কবি। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গায় বিধ্বস্ত এক দশক। ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদের নৃশংস হনন-পর্ব এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে। সুকান্তের পারিবারিক জীবনেও সে এক রুক্ষ সময়। অভাব-অনটন তো ছিলই। তার ওপর সুকান্তর মা সুনীতি দেবীর অকালমৃত্যু সুকান্তর মানস জগতকে অনেকটা অস্থির করে তোলে। বহির্জগতের আঘাত-প্রতিঘাতে সুকান্তর কাব্যজগতও ‘কঠিন, কঠোর গদ্যে’র পথে অগ্রসর হয়। ‘পূর্বাভাস’-এর কবিতাগুলি তাঁর প্রাথমিক পর্বের কবিতা ধরে নিলে, সুকান্ত-র এই ক্রম-উত্তরণ স্পষ্টত ধরা দেয়। যে সুকান্ত লিখছেন, —
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়
তবুও পড়িবে মনে, চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে কভু হৃদয়ের আঙিনায়
রজনীগন্ধা বনে,
তবুও পড়িবে মনে।
…
বিরহিণী তারা আঁধারের বুকে সূর্যেরে কভু হায়
দেখেনিকো কোনো ক্ষণে।
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়
হয়তো পড়িবে মনে,
রজনীগন্ধা বনে।। (স্মারক, পূর্বাভাস)
সেই একই কাব্যগ্রন্থে, শেষের দিকে কবি লিখছেন—
জাগবার দিন আজ, দুর্দিন চুপি চুপি আসছে;
যাদের চোখেতে আজো স্বপ্নের ছায়া ছবি ভাসছে—
তাদেরই যে দুর্দিন পরিণামে আরও বেশী জানবে,
মৃত্যুর সঙ্গীন তাদেরই বুকেতে শেল হানবে।
আজকের দিন নয় কাব্যের—
আজকের সব কথা পরিণাম আর সম্ভাব্যের; (জাগবার দিন আজ)
অথবা, সেই বহুশ্রুত কবিতার লাইন—
বন্ধু, তোমার ছাড়ো উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত,
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। (উদ্যোগ)
৩
ইওরোপে ফ্যাসিবাদের আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। স্পেনের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রাঙ্কো-র অভিযানের বিরুদ্ধে রোমাঁ রোলাঁ বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানালেন। রোগশয্যা থেকে রবীন্দ্রনাথ সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে, সমগ্র ভারতবাসীকে স্পেনের জনগণের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানালেন। স্টেটসম্যান পত্রিকায় কবি আবেদন জানালেন—
“In Spain, the world Civilization is being menaced and trampled under foot. Against the democratic government of the Spanish people, Franco has raised the standard of revolt. International Fascism is pouring men and money in aid of the rebels….
The devastating tide of International Fascism must be checked. In Spain this inhuman recrudescence of obscurantism, of racial prejudice, of rapine and glorification of war, must be given the final rebuff. Civilization must be saved from its being swamped by barbarism.
At this hour of supreme trial and suffering of the Spanish people, * I appeal to the conscience of humanity. *
Help the people’s front in Spain, help the Government of the people, cry in million voices ‘Halt’ to reaction come in your millions to the aid of democracy, to the succor of civilization and culture. ” (The Statesman, 3 March 1937- Source- https: //www. vscw. ca/en/node/625)।
রোগশয্যা থেকে ফিরে কবি লিখলেন—
…রাষ্ট্রপতি যত আছে
প্রৌঢ় প্রতাপের, মন্ত্রসভাতলে আদেশ-নির্দেশ
রেখেছে নিষ্পিষ্ট করি রুদ্ধ ওষ্ঠ-অধরের চাপে
সংশয়ে সংকোচে। এ দিকে দানবপক্ষী ক্ষুব্ধ শূন্যে
উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈতরণীনদীপার হতে
যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসক্ষুধিত শকুনি,
আকাশেরে করিল অশুচি। মহাকালসিংহাসনে-
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী
কুৎসিত বীভৎসা-‘পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন
নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের
হৃৎস্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে
নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।
বাংলার সারস্বত সমাজ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সেদিন সামিল হতে দ্বিধা করেনি।
রবীন্দ্রনাথের জীবনদীপ নির্বাপিত হয় ১৯৪১ সালে। ইতিমধ্যে হিটলারের সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় দেশে দেশে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী মঞ্চ গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ঢাকায় ফ্যাসিবাদ-বিরোধী এক মিছিলে আর এক তরুণ প্রতিশ্রুতিবান সাহিত্যিক সোমেন চন্দ-কে হত্যার ঘটনায় বিচলিত বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে তোলে ‘ফ্যাসিস্ত বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। ১৯৪২-এর ৯ আগস্ট কংগ্রেস ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেয়। ঘোষণা মাত্রই ব্রিটিশ সরকার মহাত্মা গান্ধী সহ কংগ্রেসের তাবৎ নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে। বিদ্রোহী জনতা নিজেদের উদ্যোগে আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গান্ধী-নির্দেশিত অহিংস অসহযোগের পথে সীমাবদ্ধ না থেকে কিছুটা হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। বাংলায় এই আন্দোলন তীব্র গতি লাভ করে। সরকার কমিউনিস্ট পার্টির উপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে। সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন।
সুকান্ত-ভ্রাতা অশোক ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, “রাজনীতির কাজে সুকান্তর হাতেখড়ি হয়েছিল ১৯৪২-এর গোড়ার দিকে। ” কিন্তু সেই একই নিবন্ধে অশোক লিখছেন—
“স্কুলের ছাত্র হিসাবে প্রথমে তখনকার ছাত্র-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল সুকান্তকে। পর পর বিভিন্ন ছাত্রধর্মঘটে সংগঠকের ভূমিকা নেওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই দেশবন্ধু হাই স্কুলের কর্মকর্তাদের বিষনজরে পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
কিন্তু কাজ কেবলমাত্র ছাত্র-আন্দোলনের মধ্যেই সীমিত ছিল না। তখন বেলেঘাটায় কমিউনিস্ট কর্মীরা সংখ্যায় ছিলেন কয়েক জন, আর সে তুলনায় তাদের কাজ ছিল অনেক বেশি। তাই প্রত্যেক কর্মীকেই পরিশ্রম করতে হতো যথেষ্ট। সুকান্তও তার অপরিণত মনের আবেগে একাই একাধিক মানুষের কাজ করতেন দিনে রাতে। ”
কমিউনিস্ট কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত ‘কিশোর বাহিনী’তেও সুকান্ত অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টিতে আনুষ্ঠানিক যোগদানের আগেই সুকান্ত রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করতে শুরু করেছিলেন বলা যায়। যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ-দাঙ্গার পটভূমিতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রনায়ক-শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের লোভ আর লালসা সুকান্তের চেতনাকে খর করে। আর এই পরিবর্তনের মাঝে আমরা পেলাম ‘ছাড়পত্র’-র কবির সেই অমোঘ লাইন—
তারপর বহুযুগ পরে
ভবিষ্যতের কোনো যাদুঘরে
নৃতত্ত্ববিদ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার,
মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার।
তেরোশো সালের মধ্যবর্তী মালিক, মজুতদার
মানুষ ছিল কি? জবাব মেলে না তার। (বোধন)
৪
সুকান্ত ছিলেন কমিটেড কবি। ‘কমিটমেন্ট’ ও ‘কবিতা’, দুটোই তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল। কমিটমেন্টে ঘাটতি ছিল না বলেই, “কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেলাতে পেরেছিল। তার ব্যক্তিত্বে কোনো দ্বিধা ছিল না। ” মন্তব্যটা কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। কিন্তু এই মত সর্বসম্মত নয়। অগ্রজ সাহিত্যিকদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু ছিলেন সুকান্তের কবিতার তীক্ষ্ণ সমালোচক। “রাজনৈতিক পদ্য লিখে শক্তির অপচয় করছ তুমি; তোমার জন্য দুঃখ হয়” বলে তিনি একসময়ে সুকান্তকে তিরস্কার করেছিলেন। সুকান্তের কবিতা সম্বন্ধে তাঁর অভিমত ছিল, “তার কবিতা প’ড়ে মোটের উপর এ-কথাই মনে হয় যে তার কিশোর-হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে-পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে একটি কঠিন, সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ। কবিতাগুলি যেন সেই মতবাদের চিত্রণ মাত্র; জোর গলায় চেঁচিয়ে বলা, কবিতা না-হ’য়ে খবরকাগজের প্যারাগ্রাফ হ’লেই যেন মানাতো। ” ‘কবিতা’ পত্রিকার আষাঢ় ১৩৫৪ সংখ্যায় মূল রচনাটির ছত্রে ছত্রে সুকান্ত ভট্টাচার্যের আদর্শগত বিশ্বাসের প্রতি তাঁর তীব্র কটাক্ষে প্রতিভাত হয় যে, সুকান্তের কবিতার থেকে আদর্শগত বিশ্বাসে সুকান্তের সুদৃঢ় অবস্থান বুদ্ধদেব বসুর উষ্মার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। “যুদ্ধকালীন উদ্ভ্রান্তির সুযোগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক একটি ফ্রন্ট খুললেন, আর আমাদের নবীন লেখকেরা যৌবনের ত্যাগ-প্রবণতায় অধীর হ’য়ে উঠলেন নিজেদের বিকিয়ে দিতে। ‘পদাতিকে’ যা ছিলো মুগ্ধতার আবেগ, সুকান্তর ক্ষেত্রে তা হ’য়ে উঠেছিলো সুচিন্তিত দাসত্ব” কিংবা “বস্তুত, ধনিকের দ্বারা শ্রমিকের রক্তশোষণ সুকান্তর রীতিমতো একটা ম্যানিয়া হ’য়ে উঠেছিলো; সর্বত্রই সে যেন বিভীষিকা দেখছে, আর তা থেকে পালাতে গিয়ে বার-বার ডুব দিচ্ছে ভাবালুতায়। সূর্যকে সে বলছে—‘হে সূর্য, তুমি তো জানো আমাদের গরম কাপড়ের কতো অভাব। ‘ সে দেখছে, অসহায় সিঁড়িকে পা দিয়ে পিষে মারছে ‘গর্বোদ্ধত অত্যাচারী’, ‘মৌন-মুক শব্দহীন’ কলমকে দিয়ে কলঙ্কময় দাসত্ব করিয়ে নিচ্ছে হৃদয়হীন লেখক; সে উত্তেজিত করছে সিগারেটকে ‘হঠাৎ জ্ব’লে উঠে বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে’ মারতে, ‘যেমন ক’রে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছো এতোকাল’; সে কাঁদছে ডাকঘরের রানারের দুঃখে—‘পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া। (ছুঁতে পারলে কি ভালো হ’তো? )”—এই সব মন্তব্য যতটা না কবিতার সমালোচনা, তার থেকে অনেক বেশি সুকান্তের মতাদর্শের প্রতি কটাক্ষ। এমনকি প্রবন্ধটির শেষে “কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হ’লো” উক্তিটিও সুকান্তকে কবি হিসাবে সঠিক স্বীকৃতির ব্যঞ্জনা নয়। (সুকান্ত বিচিত্রা থেকে সংগৃহীত)।
সাহিত্য বিমূর্ত কোনো সৃষ্টি নয়, সমাজ-সংসার-পারিপার্শ্বিক নিরপেক্ষও নয়। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী”র মধ্যে সুকান্তর কবি জীবনের বিকাশ। “১৯৪৩-এর শবসমাকীর্ণ বাঙলার মহাশ্মশানে যুদ্ধ আর মন্বন্তরের বিভীষিকার মধ্যে তাঁর যাত্রা শুরু, আর ১৯৪৭ সালে বিদেশী শাসকদের কুটিল চক্রান্তে ভ্রাতৃঘাতী সংগ্রামের অহেতুক রক্তপাতের মধ্যেই আমরা দেখলাম সুকান্তের কবি জীবনের অকাল সমাপ্তি”—লিখেছেন ধনঞ্জয় দাশ, সুকান্ত স্মৃতি গ্রন্থে। এই সময়ের মানুষের জীবন-যন্ত্রণা, দারিদ্র্য, সংগ্রামকে উপেক্ষা করে সাহিত্য রচনা সমকালীন কোনো কবি-সাহিত্যিকেরই পক্ষে বোধহয় সম্ভব ছিল না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, প্রকাশিত হয়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসংগ্রহ ‘পদাতিক’, কবি দিনেশ দাস লিখছেন, “বেয়নেট হোক যত ধারালো—কাস্তেটা ধার দিয়ো, বন্ধু! ” এবং এমন আরো অনেকে।
দেশভাগ ছাড়া ইংরেজ শাসকদের যে অবদানগুলি বাংলাকে ছিন্নভিন্ন করেছিল, তা’ হচ্ছে দুটি মন্বন্তর। সুকান্ত তাঁর জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন পঞ্চাশের মন্বন্তর। ১৩৫১ বঙ্গাব্দে (ইং ১৯৪৪) ‘ফ্যাসিস্ট বিবোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’-র উদ্যোগে মন্বন্তর-কেন্দ্রিক একটি কবিতা সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বয়স কম হলেও সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যকে। আকাল সংকলনটির ‘কথা-মুখ’-এ সুকান্ত তাঁর নিজস্ব ভঙ্গীতে কবিতায় কলাকৈবল্যবাদের সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। সুকান্ত লিখেছিলেন—
“বাংলাদেশের আধুনিক কবিরা কি চিত্তে ও চিন্তায়, ধ্যানে ও জ্ঞানে, প্রকাশে ও প্রেরণায় জনসাধারণের অভাব-অনাহার পীড়া-পীড়ন আর মৃত্যু-মন্বন্তরকে প্রবলভাবে উপলব্ধি করেন? তাঁরা কি নিজেকে মনে করেন দুর্গত জনের মুখপাত্র? তাদের অনুক্ত ভাষাকে কি করেন নিজের ভাষায় ভাষান্তরিত? এককথায় তাঁরা কি জন-মনের কবি? এই জাতীয় প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে চেয়েছে এই সংকলন।
সাহিত্য যে সমাজেরই প্রতিচ্ছায়া, জীবনেরই প্রতিভূ-তেরোশো পঞ্চাশ সালে প্রগতিশীল লেখকরা অংশত এই কথাই প্রমাণ করেছেন তাঁদের গল্পে উপন্যাসে কবিতায়। … অবশ্য এমন কবিও আমাদের দেশে আছেন, যাঁরা কবিতাকে দুর্ভিক্ষের বর্ণনায় কণ্টকিত হাতে দেখলে শিউরে ওঠেন। তাঁরা নিজেদের না পারুন, কবিতাকে দুর্ভিক্ষের ছোঁয়াচ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ”
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও, সাহিত্যের রাজনৈতিক অসূর্যস্পর্শিতার বিরোধিতা করে লিখেছিলেন,
“আজ যাঁরা সুকান্তর কবি প্রতিভাকে এই ব’লে উড়িয়ে দিতে চান যে, সুকান্তর কবিতায় স্লোগান ছিল তাঁদের বলতে চাই, সুকান্তর কবিতায় স্লোগান নিশ্চয়ই ছিল। কবিতার জাত যাবার ভয়ে স্লোগানগুলোকে রেখে ঢেকেও সে ব্যবহার করে নি। হাজার হাজার কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত যে ভাষা হাজার হাজার মানুষের মনে আবেগের তরঙ্গ তুলেছে, তাকে কবিতায় সাদরে গ্রহণ করতে পেরেছিল বলেই সুকান্ত সার্থক কবি। ” (সারস্বত লাইব্রেরী প্রকাশিত সুকান্ত-সমগ্র-র ভূমিকা)
সুকান্তর জীবনাবসানের পর তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’ আট বছরে ছয়টি সংস্করণ নিঃশেষিত হওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছিল সাহিত্যের পণ্ডিতগণ তাঁকে কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিক না দিক, জনগণ তাঁদের কবিকে চিনে নিতে ভুল করেনি। ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থেরও অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক সংস্করণ প্রকাশ মানুষের হৃদয়ে সুকান্তের চিরস্থায়ী অবস্থান প্রমাণ করেছিল।
৫
সুকান্ত স্বপ্ন দেখত। ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে স্বপ্ন দেখত। সুকান্ত স্বপ্ন দেখত ‘রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে’ আনার। আকাশে বিচরণরত পরস্বাপহারী এক চিলের মৃত্যু সুকান্তকে ভাবতে উজ্জীবিত করেছিল শোষক-বিহীন এক পৃথিবীতে নির্ভয় মানুষের পদচারণ—
হাতে যাদের ছিল প্রাণধারণের খাদ্য
বুকের কাছে সযত্নে চেপে ধরা—
তারা আজ এগিয়ে গেল নির্ভয়ে;
নিষ্ঠুর বিদ্রূপের মতো পিছনে ফেলে
আকাশচ্যুত এক উদ্ধত চিলকে।। (চিল, ছাড়পত্র)
হ্যাঁ, এগুলো ছিল রাজনীতির কবিতা। এগুলো ছিল স্বপ্নেরও কবিতা। সুকান্তের অগাধ বিশ্বাস ছিল, সংগ্রামে বিজয়ী মানুষ একদিন সেই স্বপ্নের পৃথিবীর জন্ম দেবে। সেই বিশ্বাস থেকেই সুকান্ত লিখেছিলেন—
আমার হৃদযন্ত্রে ঘা লেগে বেজে উঠেছে কয়েকটি কথা—
পৃথিবী মুক্ত—জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী।
তোমাদের ঘরে আজো অন্ধকার, চোখে আজো স্বপ্ন।
কিন্তু জানি একদিন সে সকাল আসবেই
যেদিন এই খবর পাবে প্রত্যেকের চোখেমুখে
সকালের আলোয়, ঘাসে ঘাসে, পাতায় পাতায়। (খবর, ছাড়পত্র)
কমিউনিজমের বিজয়ের প্রতি সুকান্তর এতটাই আস্থা ছিল যে, তিনি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিকট এই আশা ব্যক্ত করেছিলেন যে, “এই দলবলই (অর্থাৎ পার্টি- লেখক) তো বাড়তে বাড়তে একদিন এ দেশের অধিকাংশ হবে। ”
সুকান্তর কোনো আশাই পূর্ণ হয়নি। শোষণ-মুক্ত সমাজ আজও অধরা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সুকান্তর ভাষায় ‘দলবল’) “এ দেশের অধিকাংশ” হওয়া দূরে থাকুক, এখন অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত। একটা সময়ে ভারতের বুকে “বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ” দেশের মানুষকে চমকিত করলেও রক্তস্নানে তার সমাপ্তি ঘটেছিল। সুকান্তর জন্মের শতবর্ষ পরেও বিশ্বের গরিব মানুষের বৃহত্তম সংখ্যার বাস ভারতে। আকাল এখন হয় না বটে, কিন্তু সরকারের ডোল না পেলে কয়েক কোটি পরিবারে হাঁড়ি চড়ত না। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোটে না। বিশ্বের ক্ষুধা সূচকে ১২৩টি দেশের মধ্যে ১০২ নম্বরে ভারতের স্থান। চুরাশি বছর আগে, রবীন্দ্র প্রয়াণের প্রথম বার্ষিকীতে, সুকান্ত লিখে গিয়েছিলেন,
এখন আতঙ্ক দেখি পৃথিবীর অস্থিতে মজ্জায়,
সভ্যতা কাঁপিছে লজ্জায়;
স্বার্থের প্রাচীরতলে মানুষের সমাধি রচনা,
অযথা বিভেদ দৃষ্টি, হীন প্ররোচনা
পরস্পর বিদ্বেষ সংঘাতে,
মিথ্যা ছলনাতে—
আজিকার মানুষের জয়;
আসন্ন জীবন মাঝে বিসর্পিল, বিভীষিকাময়।। (প্রথম বার্ষিকী, পূর্বাভাস)
পৃথিবীটা কি খুব বেশি বদলেছে?
------------------------------
সুকান্ত সমগ্র গ্রন্থটি ব্যতীত উল্লেখিত বাকি সব সূত্রই আন্তর্জাল মারফৎ প্রাপ্ত।