তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় কি পৃথিবী?

লিখেছেন:অরুণ কুমার চক্রবর্তী

প্রথম অধ্যায় 

 

একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমশ জটিল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বব্যবস্থা একটি স্বল্পকালীন একমেরু কাঠামোর দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।¹ কিন্তু গত দুই দশকে এই একমেরু কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় রূপ নিতে শুরু করেছে। চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতের মতো শক্তির উত্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যেই বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতাকে তীব্র করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দুই দেশের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং বিভিন্ন সময়ে সামরিক চাপ সৃষ্টি করেছে।²

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—পৃথিবী কি আবার একটি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে? ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়েছে যে আঞ্চলিক সংঘাত কখনও কখনও বড় আকার নিয়ে যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। যদিও আধুনিক বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি বড় শক্তিগুলিকে সরাসরি সংঘাত থেকে বিরত রাখে, তবুও প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাইবার সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে অস্থির করে তুলেছে।

আমাদের উদ্দেশ্য হল আমেরিকার বৈদেশিক নীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা, ইরান ও ভেনেজুয়েলার সংকটের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আলোচনা করা, এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে আমরা দেখবো কীভাবে ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

আমেরিকার বৈদেশিক নীতির ঐতিহাসিক পটভূমি:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বিকাশ উনবিংশ শতাব্দী থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার প্রথম দিকে আমেরিকা ইউরোপীয় শক্তির সংঘাত থেকে দূরে থাকার নীতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে।

মনরো নীতি - ১৮২৩ সালে ঘোষিত Monroe Doctrine মার্কিন বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই নীতির মূল বক্তব্য ছিল—ইউরোপীয় শক্তিগুলি পশ্চিম গোলার্ধের রাজনীতিতে নতুন করে উপনিবেশ স্থাপন বা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।³

যদিও এই নীতিকে প্রথমে লাতিন আমেরিকার স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির সুরক্ষার জন্য ঘোষিত হয়েছিল, পরে এটি মার্কিন প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। উদাহরণস্বরূপ—গুয়াতেমালা (১৯৫৪), চিলি (১৯৭৩), ও নিকারাগুয়া (১৯৮০-এর দশক) ।

এই ঘটনাগুলিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই সেই সব সরকারকে সমর্থন করেছে যারা তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করত।⁴

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূমিকা:

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তেল সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির আগ্রহ অত্যন্ত বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র , সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে এই ধরনের হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ধরনের নীতি কখনও কখনও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করেছে এবং নতুন সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।⁵

ইরান–আমেরিকা সংঘাতের পটভূমি:

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। এই সংঘাতের মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আদর্শগত পার্থক্য এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।

১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান- ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক দেশের তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন। এর ফলে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান তেল কোম্পানির স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর পর CIA এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6-এর সহায়তায় একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।⁶

এই ঘটনার ফলে ইরানের জনগণের মধ্যে পশ্চিমা শক্তির প্রতি গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

ইসলামিক বিপ্লব- ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং শাহের শাসনের অবসান ঘটে। নতুন সরকার আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিন্ন করে।

এই সময় তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিককে বন্দী করে ( প্রায় ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মচারীকে বন্দী করা হয় )। এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করে তোলে।⁷

পারমাণবিক সংকট- একবিংশ শতাব্দীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA) নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে সম্মত হয়।

কিন্তু পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে উত্তেজনা আবার বৃদ্ধি পায়।⁸

Footnotes:

  1. John Lewis Gaddis, The Cold War: A New History (New York: Penguin Press, 2005), 12.
  2. Graham Allison, Destined for War: Can America and China Escape Thucydides’s Trap? (Boston: Houghton Mifflin Harcourt, 2017), 43.
  3. Walter LaFeber, The American Age: United States Foreign Policy at Home and Abroad (New York: W.W. Norton, 1994), 89.
  4. Odd Arne Westad, The Global Cold War (Cambridge: Cambridge University Press, 2005), 145.
  5. Samuel P. Huntington, The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order (New York: Simon & Schuster, 1996), 211.
  6. Stephen Kinzer, All the Shah’s Men (New York: Wiley, 2003), 112.
  7. Mark J. Gasiorowski, “The 1953 Coup D’état in Iran,” International Journal of Middle East Studies 19, no. 3 (1987): 261.
  8. Kenneth N. Waltz, Theory of International Politics (Reading, MA: Addison-Wesley, 1979), 97.

Bibliography:

  1. Allison, Graham. Destined for War: Can America and China Escape Thucydides’s Trap? Boston: Houghton Mifflin Harcourt, 2017.
  2. Gaddis, John Lewis. The Cold War: A New History. New York: Penguin Press, 2005.
  3. Huntington, Samuel P. The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order. New York: Simon & Schuster, 1996.
  4. Kinzer, Stephen. All the Shah’s Men. New York: Wiley, 2003.
  5. LaFeber, Walter. The American Age. New York: W.W. Norton, 1994.
  6. Waltz, Kenneth N. Theory of International Politics. Reading, MA: Addison-Wesley, 1979.
  7. Westad, Odd Arne. The Global Cold War. Cambridge: Cambridge University Press, 2005.

 

 

দ্বিতীয় অধ্যায় 

 

ভেনেজুয়েলার তেল রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তির সংঘাত:

লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে মূলত তার বিপুল জ্বালানি সম্পদের কারণে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদের একটি বড় অংশ ভেনেজুয়েলায় অবস্থিত। এই সম্পদ একদিকে দেশটিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও রূপান্তরিত করেছে।¹

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল। কিন্তু তেলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ধীরে ধীরে দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে। এই পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসেন এবং “Bolivarian Revolution” নামে একটি নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি শুরু করেন।

চাভেজের নীতির মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ভূমিকা বৃদ্ধি করা, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং তেল সম্পদের উপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তেল শিল্পের উপর রাষ্ট্রায়ত্ত নিয়ন্ত্রণ বাড়ান এবং এই আয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু করেন।²

তবে এই নীতির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকায় তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছে। চাভেজের সমাজতান্ত্রিক নীতি এবং মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তোলে।

চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি আরও সংকটে পড়ে। তেলের আন্তর্জাতিক দাম পতন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি ছিল যে মাদুরো সরকারের অধীনে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।³

কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে। খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাপক অভিবাসন দেশটির সামাজিক পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

এই সংকট আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। রাশিয়া এবং চীন ভেনেজুয়েলার সরকারের প্রতি সমর্থন জানায় এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করে। ফলে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হয়।


রাশিয়া–চীন–আমেরিকা শক্তির ভারসাম্য:

আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমশ একটি বহুমেরু কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। শীতল যুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতি দুটি প্রধান শক্তির মধ্যে বিভক্ত ছিল—যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র কিছু সময়ের জন্য একমাত্র সুপারপাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

তবে একবিংশ শতাব্দীতে এই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে শুরু করে। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক পুনরুত্থান বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে।⁴

চীনের উত্থান- চীন গত চার দশকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে অর্থনৈতিক সংস্কারের পর দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।

বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র। চীনের Belt and Road Initiative (BRI) প্রকল্প এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ জুড়ে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে।⁵

এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন তার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যে এটি ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারে।

রাশিয়ার পুনরুত্থান- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া কিছু সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে ছিল। কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে দেশটি আবার একটি শক্তিশালী সামরিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রাশিয়া বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ তার ভূরাজনৈতিক (Geopolitical) শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।⁶

এছাড়া রাশিয়া ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ায় তার কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া- চীন ও রাশিয়ার উত্থানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈদেশিক নীতিতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে এবং বিভিন্ন কৌশলগত জোট গঠন করেছে।

উদাহরণস্বরূপ— QUAD (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া), NATO সম্প্রসারণ, ও  ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল।

এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার প্রভাব বজায় রাখতে চায়।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World) - অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে বর্তমান বিশ্ব একটি বহুমেরু কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় একাধিক শক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল শক্তির ভারসাম্য। যখন একাধিক শক্তি একে অপরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়, তখন সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা কখনও কখনও কমে যায়।⁷

তবে একই সঙ্গে শক্তির প্রতিযোগিতা নতুন সংঘাতের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কূটনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Footnotes:

  1. Daniel Yergin, The Prize: The Epic Quest for Oil, Money, and Power (New York: Simon & Schuster, 1991), 612.
  2. Steve Ellner, “Hugo Chávez’s First Decade in Office,” Latin American Perspectives 37, no. 1 (2010): 77.
  3. Javier Corrales and Michael Penfold, Dragon in the Tropics: Hugo Chávez and the Political Economy of Revolution in Venezuela (Washington, DC: Brookings Institution Press, 2011), 148.
  4. John J. Mearsheimer, The Tragedy of Great Power Politics (New York: W.W. Norton, 2001), 36.
  5. Nadège Rolland, China’s Eurasian Century? Political and Strategic Implications of the Belt and Road Initiative (Seattle: National Bureau of Asian Research, 2017), 54.
  6. Dmitri Trenin, Should We Fear Russia? (Cambridge: Polity Press, 2016), 92.
  7. Kenneth N. Waltz, Theory of International Politics (Reading, MA: Addison-Wesley, 1979), 118.


 

তৃতীয় অধ্যায় 

 

প্রক্সি যুদ্ধ: আধুনিক সংঘাতের নতুন রূপ

আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরাসরি বৃহৎ শক্তির যুদ্ধ ক্রমশ বিরল হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি। পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক শক্তি এতই বিপুল যে বড় শক্তিগুলি সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে সাধারণত অনিচ্ছুক।¹

এই বাস্তবতার ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন ধরণের সংঘাতের জন্ম হয়েছে, যাকে বলা হয় প্রক্সি যুদ্ধ (Proxy War)। প্রক্সি যুদ্ধ হল এমন এক ধরনের সংঘাত যেখানে বড় শক্তিগুলি সরাসরি যুদ্ধ না করে অন্য দেশ বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করে।

শীতল যুদ্ধের সময় প্রক্সি যুদ্ধ ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একে অপরের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল।

শীতল যুদ্ধের প্রক্সি যুদ্ধের উদাহরণ- শীতল যুদ্ধের সময় বেশ কয়েকটি সংঘাত প্রক্সি যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছিল। যেমন— কোরিয়া যুদ্ধ,ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বা আফগানিস্তান যুদ্ধ (১৯৭৯–১৯৮৯)। এই সংঘাতগুলিতে দুটি পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধ না করলেও তারা বিভিন্ন পক্ষকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছিল।²

আধুনিক যুগে প্রক্সি যুদ্ধ- একবিংশ শতাব্দীতেও প্রক্সি যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত এই প্রবণতার উদাহরণ।

যেমন - সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ।

সিরিয়ার সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করেছে। ফলে একটি আঞ্চলিক সংঘাত ধীরে ধীরে একটি জটিল আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।³

ইয়েমেনের সংঘাত- ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। সৌদি আরব ও তার মিত্ররা একদিকে, আর ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা অন্যদিকে সংঘর্ষে লিপ্ত।

এই ধরনের প্রক্সি যুদ্ধ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং কখনও কখনও বৃহত্তর সংঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

 

সাইবার যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধ:

আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ যুদ্ধের প্রকৃতিকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে। বর্তমান যুগে যুদ্ধ কেবলমাত্র সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

সাইবার যুদ্ধ- সাইবার যুদ্ধ বলতে বোঝায় ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উপর আক্রমণের মাধ্যমে শত্রুর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা। বর্তমান বিশ্বে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক নেটওয়ার্ক—সবই ডিজিটাল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। ফলে সাইবার আক্রমণ একটি দেশের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

যেমন - সালে আবিষ্কৃত Stuxnet নামক ম্যালওয়্যার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার উপর আক্রমণ চালায়। এটি আধুনিক সাইবার যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।⁴

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি তথ্যভাণ্ডারের উপর সাইবার আক্রমণের অভিযোগও উঠেছে।

অর্থনৈতিক যুদ্ধ- আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বড় শক্তিগুলি প্রায়ই সামরিক শক্তি ব্যবহার না করে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরান, রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলার উপর বিভিন্ন সময়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলির উদ্দেশ্য হল সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অর্থনীতিকে দুর্বল করা এবং তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা।

তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রায়ই সাধারণ জনগণের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে এই নীতির নৈতিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে।⁵

 

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা:

বাস্তববাদ- বাস্তববাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রভাবশালী তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত অরাজক (anarchic), অর্থাৎ এখানে কোনও সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নেই যা সব রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। ফলে শক্তির প্রতিযোগিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।⁶

বাস্তববাদী চিন্তাবিদদের মতে, যখন একটি নতুন শক্তি দ্রুত উত্থান ঘটায় এবং বিদ্যমান শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন সংঘাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতিকে কখনও কখনও “Thucydides Trap” বলা হয়।

উদারবাদ- উদারবাদী তত্ত্ব আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বের উপর জোর দেয়।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যুদ্ধের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব রাজনীতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংঘাত প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে।⁷

পারমাণবিক প্রতিরোধ তত্ত্ব- পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বড় শক্তিগুলিকে সরাসরি যুদ্ধ থেকে বিরত রাখে।

এই ধারণাকে বলা হয় Mutually Assured Destruction (MAD)।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী যদি দুটি পারমাণবিক শক্তি সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে উভয় পক্ষই সম্পূর্ণ ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। ফলে বড় শক্তিগুলি সাধারণত সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলে।⁸

তবে এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবসময় স্থিতিশীল নয়। ভুল হিসাব, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা রাজনৈতিক উত্তেজনা কখনও কখনও বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

Footnotes:

  1. Lawrence Freedman, The Evolution of Nuclear Strategy (New York: Palgrave Macmillan, 2003), 145.
  2. Odd Arne Westad, The Global Cold War (Cambridge: Cambridge University Press, 2005), 233.
  3. Charles R. Lister, The Syrian Jihad (Oxford: Oxford University Press, 2015), 118.
  4. Kim Zetter, Countdown to Zero Day: Stuxnet and the Launch of the World’s First Digital Weapon (New York: Crown Publishing, 2014), 62.
  5. Richard Nephew, The Art of Sanctions (New York: Columbia University Press, 2018), 94.
  6. John J. Mearsheimer, The Tragedy of Great Power Politics (New York: W.W. Norton, 2001), 29.
  7. Robert O. Keohane and Joseph S. Nye, Power and Interdependence (Boston: Little, Brown, 1977), 41.
  8. Thomas C. Schelling, Arms and Influence (New Haven: Yale University Press, 1966), 187.

 

চতুর্থ অধ্যায় 

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব:

একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে ভারত এখন আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।¹

ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ার ফলে ভারত এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। এই অবস্থান ভারতের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা রাজনীতিতে একটি বিশেষ ভূমিকা তৈরি করেছে।

ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। দ্রুত শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৃহৎ বাজার ভারতের অর্থনৈতিক শক্তিকে ক্রমশ বৃদ্ধি করছে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।²

এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকার গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

ভারতের কূটনৈতিক ঐতিহ্য: শান্তি ও সহাবস্থানের দর্শন

ভারতের আন্তর্জাতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল শান্তি, সহাবস্থান এবং সংলাপের উপর জোর দেওয়া। স্বাধীনতার পর ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছিল যা কোনও শক্তিশালী সামরিক জোটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না।

এই নীতিকে বলা হয় অ-জোট আন্দোলন (Non-Aligned Movement)। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলমান শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে স্বাধীন থাকা।³

অ-জোট আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে, যেখানে শান্তি, উপনিবেশবাদের বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ভারতের কূটনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনেরও প্রভাব রয়েছে। বৌদ্ধ এবং গান্ধীয় দর্শন শান্তি, অহিংসা এবং সহমর্মিতার উপর জোর দেয়। এই দর্শন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

 

আধুনিক আন্তর্জাতিক সংঘাতে ভারতের সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা:

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। এর কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে।

বহু শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক- ভারতের একটি বড় কূটনৈতিক শক্তি হল যে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, আবার একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বিদ্যমান।

এই ধরনের বহুমুখী সম্পর্ক ভারতের জন্য একটি বিশেষ কূটনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে দেশটি বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব- ভারত দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলির কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে আসছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ভারতের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকে।

এই কারণে ভারত আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা- ভারত জাতিসংঘ, G20 এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা অভিযানে ভারতের অবদান উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনা প্রদানকারী দেশ।⁴

এই অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে শক্তিশালী করেছে।

 

সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ:

যদি আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভারত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

কূটনৈতিক সংলাপের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা- ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলিকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বহুপাক্ষিক সহযোগিতা- আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানের জন্য বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে পারে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা- অনেক সময় অর্থনৈতিক সহযোগিতা রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে। বাণিজ্য এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই ধরনের আন্তঃনির্ভরতা সংঘাতের সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বর্তমান বিশ্ব একটি গভীর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার মতো শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো আঞ্চলিক সংকট এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে।

যদিও সরাসরি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত, তবুও প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাইবার সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে ক্রমাগত অস্থির করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

ভারত তার ঐতিহাসিক কূটনৈতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। শান্তি, সহাবস্থান এবং সহযোগিতার দর্শন যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান পায়, তাহলে বৈশ্বিক সংঘাতের সম্ভাবনা কমানো সম্ভব।

ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের ভূমিকা শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

Footnotes:

  1. Ashley J. Tellis, India’s Emerging Power (Washington, DC: Carnegie Endowment for International Peace, 2001), 76.
  2. Arvind Panagariya, India: The Emerging Giant (Oxford: Oxford University Press, 2008), 114.
  3. S. M. Burke and Salim Al-Din Quraishi, The British Raj in India (Karachi: Oxford University Press, 1995), 210.
  4. David M. Malone, Does the Elephant Dance? Contemporary Indian Foreign Policy (Oxford: Oxford University Press, 2011), 189.

0 Comments
Leave a reply